নদী ভাঙার পর কুলসুমার পা পড়ল চট্টগ্রামের ধুলোমাখা রাস্তায়। ধুলোর লাল মাটি যেন তার জীবনের ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলোকে কুঁড়িয়ে নিয়ে আসছে,অতীতের স্বপ্ন, বর্তমানে নিরাশা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। ঘরে পাঁচ সন্তান- দুই ছেলে, তিন মেয়ে। জীবন এক অন্ধকার সাগর, যেখানে আলো খুব কম। স্বামী মফিজ মিয়া রিক্সার প্যাডেল টেনে জীবন চালিয়ে নেয় কিন্তু প্রতিটি ঘূর্ণন যেন তার স্বপ্নকে আরও দূরে ঠেলে দেয়। অভাব, ক্লান্তি, ঝগড়া- সবই তাদের নিত্যসঙ্গী।
প্রতিদিন ক্লান্তির সঙ্গে ঘরে ফিরে মফিজ ফিসফিস করে বলে,

“রোজগার কম, পোলা-মাইয়াগো কি খাওয়ামো?”
কুলসুমার চোখে একধরনের স্তব্ধতা। সে জানে- নিয়তি তাদের দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে রেখেছে। ঘরের অদৃশ্য সীমানা: দারিদ্র্য, লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতা, স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব সব মিলেমিশে জীবনকে সীমাবদ্ধ করে।
একদিন কুলসুমার ঘরে প্রবেশ করল রত্না বালা দাশ, সরকারি পরিবার পরিকল্পনা সহকারী। তার কণ্ঠে উষ্ণতা আর সরকারি প্রণোদনা মিলেমিশে বলল,“লাইগেশান করাও। সরকার দিবে টাকা, আমি শাড়ীও দেব। ভয় নেই, সাহস করো।”
কুলসুমার মনে ভেসে আসে দ্বিধা ও ভয়। অভাবের তাড়নাই তাকে ঠেলে দেয়। সে সাহস করে স্বামীকে বলে, “মফিজ, আমি কি লাইগেশান করাইতে পারি? সরকার কিছু টাকা দিবো, আর আমারে একখান শাড়ীও দিবো।”
মফিজ গম্ভীর হয়ে বলল,“আর একবার যদি কওস ত তোরে আমি তালাক দিমো।” তার কণ্ঠে শ্লেষ ও আতঙ্ক, দারিদ্র্য আর সামাজিক বাধার শেকল যেন তাকে ঘিরে ধরেছে।
প্রতিদিন রিক্সা চালিয়ে ঘরে ফেরার পথে মফিজের মনে উঠে আসে স্বপ্নের অমূর্ত ছবি! একটি সমৃদ্ধ সংসার, যেখানে সন্তানরা হাসবে মুক্তভাবে। কিন্তু বাস্তবতার ধুলো সব স্বপ্নকে চূর্ণ করে দিয়েছে।
একদিন গোলপাহাড় মোড় এলাকায় দেখা হয় দালাল সেলিমের সঙ্গে। সে তীক্ষ্ণ হাসি দিয়ে বলে,
“হুনো মিয়া, একখান ইঞ্জেকশন ( ভ্যাসেকটমি- দালালের ভাষায় ইঞ্জেকশন) দাও। ব্যথা পাইব না, মাত্র ৫ মিনিটেই কাজ শেষ। নতুন করে বাচ্ছা হবেনা। নিরাপদে জীবন কাটাইবা, পাওয়ারও ঠিক থাকবো, টেকাও দিবো, আর একখান লুঙ্গিও পাবা!”
মফিজের মনে ভেসে ওঠে অদৃশ্য কল্পনার ঝড়। আশা আর হতাশা এক বিন্যাসে নৃত্য করছে। কুলসুমা কি জানবে? জানলে রাজি হবেনা। আর কি করার ছিল তার কাছে? সন্তান, সংসার, সবকিছু ঝুঁকির মধ্যে।
ইঞ্জেকশনের পর মফিজ গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে দেখা মেলে দ্বিধা, দারিদ্র্য, স্বপ্নহীনতা ও সামাজিক শোষণের মিশ্রণে তৈরি এক দোলার। নদীর ঢেউ, ধূলোর কণিকা, রিক্সার চাকা, সবই যেন তার জীবনের প্রতীক। প্রতিটি ঘূর্ণন, প্রতিটি কণিকা যেন সীমাবদ্ধতার মধ্যেই স্বপ্নের আলো খুঁজে বেড়ায়।
কুলসুমা ঝগড়া আর ধৈর্যের মধ্যে জীবন টেনে চলে। এক রাতে লক্ষ্য করে মফিজ কাঁদছে। বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে,
“কী হইছে?”
মফিজ ফিসফিস করে বলে,
“আমাগো জীবন কি ফাঁদ ছাড়া আর কিছু? সংসার, সন্তান, কাম, সবকিছু কি শুধু দুঃখ আর শূন্যতা?”
কুলসুমা স্তব্ধ। বুঝতে পারে, মফিজ ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে; নদীর ধারে ধুলোতে মিশে গেছে তার সব স্বপ্ন।
পরদিন বিকালে নদীর তীরের ধূলোর ঢেউ দেখে কুলসুমা। মফিজ পাশে আসে, কণ্ঠে হতাশা আর হতভম্ব ভাব, বলে,“কুলসুমা, আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? আমাদের জীবন কি আমরা গড়বো, নাকি দারিদ্র্যের দালাল সেলিম আর সরকারের নীতি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবে?”
কুলসুমা ধীর কণ্ঠে বলল,“স্বাধীনতা শুধু বাইরে নয়, ভেতরেও। আমরা যতটা পারি, নিজের জন্য, সন্তানদের জন্য লড়ব। হয়তো সবকিছু হারিয়েছি, কিন্তু লড়াইটা থামাইতে পারব না।”
মফিজ ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। অদৃশ্য ঝড়, ছেলেমেয়ে, সংসার, ব্যক্তিগত স্বপ্ন, সব মিলিয়ে এক শেকলে বন্দি, তবু কুলসুমার কথা তার মধ্যে কিছুটা আলো জাগায়। জীবন, দারিদ্র্য, শোষণ এবং স্বপ্নের সংঘর্ষ এই ফাঁদে প্রতিদিন নতুন রূপ নেয়। প্রতিটি ধুলো, নদীর ঢেউ, রিক্সার চাকা, সবই তার জীবনের প্রতীক, শিকল ও আশা, ভয় ও সাহসের এক অস্পষ্ট মিলনে।
লেখকঃ গল্পকার ও ইপসা’র প্রকল্প কর্মকর্তা


