বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬

অধরা চাঁদ

সাদিয়া তাজিন

দেখতে দেখতে ব্লাডমুন ধীরে ধীরে পৃথিবীর ছায়া থেকে বেরিয়ে এলো, তার পরিচিত উজ্জ্বল আলো আবার রাতের আকাশে ছড়িয়ে দিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে, বাতাসে হালকা ঠান্ডা ছোঁয়া এলো। হঠাৎ আকাশের কোণে কালো মেঘ জমে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে হালকা বৃষ্টি শুরু হলো। কেউ হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ছোঁয়, কেউবা চাঁদ দেখতে দেখতে ছাদ থেকে নেমে এলো। মুন বৃষ্টির ফোঁটা হাতে নিয়ে মায়ানকে বলে, দেখ বাবা ফোঁটাগুলো যেন ছোট চাঁদ। চাঁদ, বৃষ্টি আর সকলের ছোট ছোট উচ্ছ্বাসগুলো মিলেমিশে মায়ান ও প্রিয়ার কাছে রাতটা অন্যন্য হয়ে রইলো।

- Advertisement -

তিন বছরের মুন ইতিমধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে। পিউ আর মায়ানও ধীরে ধীরে রাতের খাবার সেরে ঘুমানোর প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। দুজনের মনে তখনও টকটকে লাল আলোয় আলোকিত ব্লাড মুন’র দৃশ্য আর মুনের শিশুতোষ খেলাধুলোর পুলকিত সময়গুলোর রেশ এখনো কাটেনি। ছোট্ট মুনের ঠোঁটের কোণে তখনো যেন নিষ্পাপ মিষ্টি হাসি। পিউ, মায়ান তাকিয়ে থাকে সেই মুখ পানে, চুপচাপ মুন’র মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তাদের চোখে ভাসে মুন’র ছোট্ট ছোট্ট পায়ে ছাদে দৌড়াদৌড়ি, কখনো রক্তিম চাঁদ দেখা বা ছাদবাগানের ফুল গোনা, কখনো বা মায়ান,পিউ’র হাত ধরে খেলা করার চপলতা। এমনকি মুন’র হাসিখুশি, চঞ্চলতার দ্যুতি দেখে প্রতিবেশি এক দাদুর আদর করে বলা, দেখো! আকাশ জুড়ে লাল আলো/মুনের হাসি দিচ্ছে ভালো/ চাঁদের সাথে খেলা হোক/ তারার সাথে গল্প হোক।

- Advertisement -shukee

প্রতিদিনের মতো সেদিনও রাতে মুন’র খাবার পর্ব শুরু হবে। পিউ বারান্দায় চাঁদ দেখিয়ে, গান গেয়ে কখনোবা ছড়া কেটে মুনকে ভাত খাওয়ালে সে খুব আনন্দের সাথে খায়। আজও সেই নিয়মেই খাবে- মুন দৌড়ে বারান্দায় এলো, পিউর হাত ধরে।

মুন: মা, আকাশে লাল চাঁদ!

পিউ: হ্যাঁ, আকাশে মুন হাসে, মুনটা সত্যিই অদ্ভুত সুন্দর!

মুন আনন্দে লাফিয়ে হাত উঁচু করে চাঁদ ছুঁতে চাইল।

পিউ হেসে তাকায়,যেন শশী প্রভা আর মুন’র আনন্দ একাকার হয়ে যেন রাতের আকাশকে আরো অপূর্ব বর্ণিল করে তুলছে।

পিউ জানত, আজ রাতে ব্লাড মুন দেখা দেবে আর পূর্ণচন্দ্রগ্রহণের বিরল মুহূর্তটি ঘটবে। ততক্ষণে মায়ান তার বাইরে থাকা কাজ শেষ করে ফিরে এসেছে। মুখে উচ্ছ্বাস আর চোখে অপেক্ষার ঝিলিক নিয়ে বলল, চলো, ব্লাড মুন অবলোকন করতে ছাদে চলি।

মায়ান এক মুহূর্তের জন্য দেরী না করে পিউ ও মুনকে সাথে নিয়ে ছাদে উঠে। ততক্ষণে ফ্ল্যাটের সব পরিবারও ছাদে এসেছে। কেউ মোবাইলে ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও রেকর্ড করছে, কেউ বা চুপচাপ টেলিস্কোপ, বাইনুকোলার কিংবা বিশেষ চশমা দিয়ে চাঁদ দেখছে।

মুন: অনেকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে ডাকে বাবা! বাবা! সবাই চাঁদ দেখছে!

মায়ান: হ্যাঁ মা, তুমিও দেখ ঔ লাল চাঁদটা। তখন পুরো আকাশে এক রহস্যময় লাল রঙ ছড়িয়ে পড়েছে।

পিউ মোবাইলে ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে দেখছে,সবাই ব্লাড মুনের রাতের ছবি, ভিডিও আর পোস্ট শেয়ার করেছে। দেখতে দেখতে বলে,আসলে এই লাল চাঁদনী রাত সবাই বেশ উপভোগ করেছে। সবাইকে আনন্দ দিয়েছে।

কথা বলতে বলতে মায়ান তার মোবাইলে ভিডিও ও ছবি দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট শেয়ার করে বলে দ্যাখ পিউ, আমাদের ছবিগুলো। কি সুন্দর রাত! অসাধারণ রক্তরাঙা চাঁদ! অধরা রক্তিম চন্দ্র! আর ছোট্ট মুন’র হাসিটা! সত্যিই যেন একটা আকাশে ভেসে থাকা মুন। মনে হচ্ছে সেও ঔ চাঁদটার মত হাসি দিয়ে সকলের দিকে তাকিয়ে আছে।

মায়ান বলে, দেখ পিউ, এই আংশিক ঢাকা শোনিত চাঁদটা! ঠিক যেন মানুষের ভালোবাসার মত।

পিউ ভাবে, আসলেই ভালোবাসা মাঝে মাঝে অধরা হয়। যেমন আংশিক ঢাকা চাঁদ পুরোপুরি দেখা যায় না, তেমনি ভালোবাসাও কখনো সরাসরি বা প্রকাশ্যে সবসময় দেখা না বা অনুভূত হয় না। ছায়া, আলো বা ছোট ছোট সংকেত দিয়ে তা বোঝা যায়। এই ব্লাড মুনের রাত, আংশিক আলো এবং ছাদের নীরবতা সেই অধরা ভালোবাসাকে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

রাত গভীর হলে বৃষ্টি থামে,জানালা দিয়ে দেখা যায়, আকাশে ছন্নছাড়া মেঘেদের ভেসে বেড়ানো। চন্দ্রগ্রহনের অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্যপট নিয়ে নির্জন রাতে একটি গল্প লিখার আগ্রহে কর্পূরের মত পিউ’র রাতের ঘুম উবে গেল। হঠাৎ-ই একটি চড়ুই পাখির চিকিরমিচির শব্দে পিউ চমকে উঠে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে লাইট দেয়, বৃষ্টির ঝাপটায় পানি এসেছে বারান্দায়ময়। ব্যালকনির ভেন্টিলেটরে খড়, শুকনো ঘাষ, কাঠি,পালক দিয়ে চড়ুই পাখি বাসা তৈরি করেছে কেউ খেয়াল করেনি।

সহসা লাইটটা নিভে যায়, একরাশ নীরবতা! ছায়ার ভিতরেও হাতের আঙুলের ভাজে মায়ানের উষ্ণতা! নিবিড় সান্নিধ্যে পিউ ধীরে ধীরে মায়ানের নি:শ্বাসের ছোঁয়ায় জড়িয়ে যায়, হারিয়ে যায় মায়ানের ভালোবাসার মানচিত্রে।

রাতটা মায়ান ও প্রিয়ার একান্ত স্মৃতির ভাঁজে-এক টুকরো অধরা চাঁদ,এক মুঠো ভালোবাসার রঙ,মুনের অমলিন হাসি, সবটাই মনের আকাশ জুড়ে ভেসে রইল।

লেখিকা:  সাহিত্যিক ও উন্নয়ন সংগঠক

ই-মেইল: sadia72_@yahoo.com

 

 

 

 

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও