চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নিয়মিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি, এইচপিভি টিকাদান এবং ডিজিটাল টিকাদান তথ্য অনুসরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে নগরীর শিশু, কিশোরী ও নারীদের শতভাগ টিকাদানের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেছেন, টিকাদান কার্যক্রমকে শুধু লক্ষ্যমাত্রা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; প্রতিটি যোগ্য শিশু ও নারীর কাছে টিকা পৌঁছে দিতে হবে। কোনো শিশু যেন টিকাপ্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত না হয়, সে লক্ষ্যেই টিকাদান কার্যক্রমকে শতভাগ সফল করতে হবে।
বুধবার ( ৩০ সেপ্টেম্বর ) নগরীর পেনিনসুলা হোটেলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের টিকাদান কার্যক্রম জোরদারে টিকা ও টিকাদান সামগ্রী পরিবহনের জন্য একটি যানবাহন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র এসব কথা বলেন। ইউনিসেফের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে গাড়িটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কাছে হস্তান্তর করেন।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, টিকাদান একটি শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার অন্যতম কার্যকর জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। চট্টগ্রাম নগরীতে বিপুলসংখ্যক শিশু ও নারী টিকাদানের আওতায় রয়েছে। তবে এখনও যেসব শিশু ও নারী পূর্ণাঙ্গ টিকাদানের বাইরে রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে টিকাদানের আওতায় আনতে হবে। এ জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে যেখানে টিকাদানের আওতা কম, সেখানে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি কিশোরীদের জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধী এইচপিভি টিকাদান এবং নারীদের ধনুষ্টংকার-ডিপথেরিয়া প্রতিরোধী টিকাদান কার্যক্রমও সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা করতে হবে। বিশেষ করে এইচপিভি টিকাদানের ক্ষেত্রে বর্তমান অগ্রগতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে চলতি বছরের মধ্যে শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মেয়র আরও বলেন, শুধু টিকাদানের ব্যবস্থা করলেই হবে না, সঠিক সময়ে সঠিক শিশুকে সঠিক মাত্রার টিকা নিশ্চিত করতে হবে। টিকাদান কার্যক্রমে কোনো ধরনের ভুল বা অকার্যকর মাত্রার সুযোগ রাখা যাবে না। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি শিশুর টিকাদানের তথ্য সংরক্ষণ ও অনুসরণ করতে হবে। ডিজিটাল টিকাদান নিবন্ধন ও তথ্য অনুসরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে টিকাদানের তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে টিকাদান ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা আসবে।
তিনি বলেন, জন্মনিবন্ধন নম্বর যাচাইয়ের মাধ্যমে শিশুদের নিবন্ধন ও টিকাদান তথ্য অনুসরণ নিশ্চিত করে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড তৈরির উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নগরীর শিশু, কিশোরী ও নারীদের শতভাগ ডিজিটাল টিকাদান তথ্য অনুসরণ ও নিবন্ধনের আওতায় আনার জন্য চসিক প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
মেয়র বলেন, টিকাদান কর্মসূচির সফলতার জন্য পর্যাপ্ত জনবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় টিকাদান কর্মীর সংখ্যা অনেক কম। ফলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক টিকাদান কর্মী ও তদারককারী নিয়োগের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ৪১টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে টিকাদান কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকির জন্য পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, কর্মজীবী অভিভাবকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সন্ধ্যা ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অতিরিক্ত টিকাদান অধিবেশনের আয়োজন করতে হবে। একই সঙ্গে বস্তি, পাহাড়ি এলাকা, সমুদ্রতীরবর্তী এলাকা এবং অন্যান্য কম-সুবিধাপ্রাপ্ত ও কম-টিকাদান আওতাভুক্ত এলাকায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। স্থানীয় বাস্তবতা ও তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ করলে টিকাদানের আওতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
মেয়র চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের টিকাদান কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্য ইউনিসেফসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, টিকাদান কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি, ইউনিসেফ এবং অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে প্রমাণভিত্তিক পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নের মাধ্যমে টিকাদান কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করা হবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি প্রতিবছর প্রায় এক লাখ শিশুর জীবন রক্ষা করছে এবং প্রায় ৫০ লাখ শিশুকে টিকাপ্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বর্তমানে প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার শিশু টিকাদানের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ থেকে সুরক্ষা পাচ্ছে। নগরীতে এইচপিভি টিকাদানের বর্তমান আওতা প্রায় ৭৩ শতাংশ। জাতীয়ভাবে অক্টোবরের মধ্যে ৮০ শতাংশ টিকাদানের আওতায় আনার লক্ষ্যের কাছাকাছি রয়েছে এ অগ্রগতি।
আলোচনায় আরও জানানো হয়, সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে প্রায় ৮৮ শতাংশ শিশুর ডিজিটাল টিকাদান তথ্য অনুসরণ ব্যবস্থায় নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। জন্মনিবন্ধন নম্বর যাচাইয়ের মাধ্যমে টিকাদান তথ্য অনুসরণ ও নিবন্ধন সম্পন্ন হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড তৈরি হয়। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে প্রায় এক কোটি ৮১ লাখ ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় এক কোটি ৫৪ লাখ টিকাদান নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।
সেমিনারে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১২ মাসের কম বয়সী শিশুদের পূর্ণ টিকাদানের আওতা, এইচপিভি টিকাদান এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ধনুষ্টংকার-ডিপথেরিয়া প্রতিরোধী টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও আলোচনা হয়। জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অন্তত ৯৫ শতাংশ কার্যকর টিকাদান আওতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে ২০২৩ সালের জরিপের তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে চিহ্নিত অকার্যকর বা ভুল টিকাদানের মাত্রা কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিবন্ধন ও তথ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে ভুল বা অকার্যকর টিকাদানের ঘটনা কমানো এবং টিকাদানের তথ্যের মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে ২০২২ সাল থেকে বাস্তবায়িত জেলা পর্যায়ে প্রমাণভিত্তিক পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। নগরীর কম-টিকাদান আওতাভুক্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে অতিরিক্ত টিকাদান অধিবেশনের আয়োজন, কর্মজীবী অভিভাবকদের সুবিধার্থে সময়সূচি পুনর্বিন্যাস এবং স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে টিকাদান পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়ে মতামত দেওয়া হয়।
আলোচনায় জানানো হয়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ৪৪০ জন টিকাদান কর্মীর বিপরীতে বর্তমানে ১২৫ জন কর্মরত রয়েছেন। ফলে আরও ৩১৫ জন টিকাদান কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া ৪১টি ওয়ার্ডের জন্য প্রতি ওয়ার্ডে দুজন করে মোট ৮২ জন তদারককারী প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় জনবল দ্রুত নিয়োগ করা গেলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে টিকাদানের আওতা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে বলে সভায় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ইনচার্জ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, চট্টগ্রাম বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বী, চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইমাম হোসেন (রানা), চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান এবং চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল।
অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. মালালাই আহমদজাই। এছাড়া ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক ডা. রিয়াদ মাহমুদ, চট্টগ্রাম বিভাগের মাঠ কার্যালয়ের প্রধান মাধুরী ব্যানার্জী, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফারহানা রহমান ও ডা. দেলোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তারা বলেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালীকরণ, ডিজিটাল নিবন্ধন ও টিকাদান তথ্য অনুসরণ সম্প্রসারণ, পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রমাণভিত্তিক পরিকল্পনা ও বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে টিকাদানের কাঙ্ক্ষিত আওতা অর্জন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি, ইউনিসেফ ও অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

