ডেঙ্গু রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আক্রান্ত রোগী কোন এলাকা থেকে সংক্রমিত হয়েছেন, তা সঠিকভাবে শনাক্ত করে ওই এলাকায় মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

তিনি বলেছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ, চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
আমাদের মূল লক্ষ্য ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা। ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গুতে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসেই সিটি করপোরেশন এলাকায় মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ৪ হাজার ৩৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
ডেঙ্গুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২২ সালে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগী ছিল ৫ হাজার ৪৪৫ জন। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৮৭ জনে। ২০২৪ সালে রোগীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ হাজার ৮৬৪ জন। মৃত্যুর সংখ্যা ২০২২ সালে ৪১, ২০২৩ সালে ১০৭, ২০২৪ সালে ৪৫ এবং ২০২৫ সালে ২৭ জন।
তিনি বলেন, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনা ছিল খুবই কম। তবে সেপ্টেম্বর মাসে রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর হার বেড়েছে। অক্টোবরেও থেমে থেমে বৃষ্টি হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখন থেকেই সবাইকে সতর্ক হতে হবে।
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগী কোথায় সংক্রমিত হয়েছেন, তা শনাক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে মেয়র বলেন, কোনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শুধু তার বর্তমান ঠিকানা নিলেই হবে না; তিনি কোথায় ছিলেন, কোন এলাকায় যাতায়াত করেছেন এবং সম্ভাব্য কোন স্থান থেকে আক্রান্ত হয়েছেন—সেসব তথ্যও চিকিৎসকদের সংগ্রহ করতে হবে।
মেয়র বলেন, রোগীর সংক্রমণের স্থান সঠিকভাবে শনাক্ত করা গেলে ওই এলাকায় মশক নিধন, লার্ভিসাইড প্রয়োগ ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দ্রুত নেয়া সম্ভব হবে।
ডেঙ্গুর সঙ্গে চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাস, জাপানিজ এনসেফালাইটিসসহ অন্যান্য ভাইরাসজনিত রোগের বিষয়েও চিকিৎসকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, ডিফারেনশিয়াল ডায়াগনোসিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সব জ্বরকে ডেঙ্গু ধরে নেয়া যাবে না। রোগীর সঠিক ইতিহাস প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করতে হবে।
হালিশহর, কোতোয়ালী, পাহাড়তলী, বন্দর, আকবর শাহ, ফিরোজশাহ, অক্সিজেন ও বাকলিয়া এলাকায় তুলনামূলকভাবে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে উল্লেখ করে মেয়র বলেন, এসব এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
এ ছাড়া জেলার উপজেলাগুলোর মধ্যেও কিছু এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মেয়র বলেন, আমরা পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কাজ করতে চাই। ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোথায় রোগী বাড়ছে, কোথায় কমছে—তা চিহ্নিত করতে হবে। আবেগ বা গুজবের ভিত্তিতে নয়, তথ্যের ভিত্তিতেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময় পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত সময়ের হিসাবের পাশাপাশি পরিবর্তিত আবহাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান।
এ সময় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা, চিকিৎসক, নার্স, বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। কর্মশালায় ডেঙ্গু রোগীর দ্রুত শনাক্তকরণ, সঠিক চিকিৎসা, রোগীর ব্যবস্থাপনা, জটিলতা প্রতিরোধ এবং রোগীর সংক্রমণের উৎস চিহ্নিত করার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

