Sunday, 27 September 2026

[the_ad id='15178']

মুজিব লোকান্তরে, মুজিব বাংলার ঘরে ঘরে

মোহাম্মদ ইউসুফ

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সাল। বাঙালি জাতির অভিভাবক হারানোর দিন। কেঁদেছিল এদিন আকাশ, ফুপিয়ে বাতাস। প্রবল কোনো বৃষ্টি নয়,নয় কোনো ঝড়ে। প্রকৃতি কেঁদেছিল কিন্তু মানুষ কাঁদতে পারেনি। ঘাতকদের উদ্ধত সঙ্গীন কাঁদতে দেয়নি কাউকে,গড়ে ওঠতে দেয়নি কোনো প্রতিবাদ, দ্রোহ। ভয়ার্ত বাংলার প্রতিটি বাড়ি থেকে ভেসে এসেছিল চাপা দীর্ঘশ্বাস। কী নিষ্ঠুর,ভয়ঙ্কর ও ভয়াল সেই কালোরাত। বাঙালির সেই তীর্থস্থান ৩২ নম্বর বাড়ি কামান-গোলার আঘাতে কেঁপে ওঠেছিল। পাকিস্তানীরা যাকে খুন করতে সাহস করেনি,অথচ তারই হাতেগড়া সেনাবাহিনীর গুলিতে নির্মমভাবে খুন হলেন বঙ্গবন্ধু মুজিব। রক্তে রঞ্জিত হলো ধানমণ্ডির সেই ঐতিহাসিক বাড়ি।থেমে গেল সব কোলাহল,মিছিল প্রতিবাদ। ঝাঁঝরা হয়ে গেল স্বাধীন বাংলার বুক।বাংলার আকাশে নেমে আসে কালো মেঘ। ওলোটাদিকে ঘোরা শুরু হয় ইতিহাস ও প্রগতির চাকা।

- Advertisement -

শত বছর আগে গর্বিত মা-বাবার কোল আলোকিত করে জন্মেছিল সেই খোকা। বাবা শেখ লুৎফর রহমান,মা সায়রা খাতুন। কে জানতো টুঙ্গিপাড়ার সেই ডানপিঠে দুষ্ট ছেলেটি বাঙালি জাতিকে উপহার দেবে একটি স্বাধীন মাতৃভূমি,একটি লালসবুজের পতাকা। কে জানতো সেদিন মধুমতির তীরের সেই স্বাধীনচেতা যুবকটি এভাবে একটি ভূখণ্ডের চেহারা আমূল পাল্টে দেবে!এই খোকা-ই হবে বাঙালি জাতির ভাগ্যনির্ধারক, রাষ্ট্রনায়ক ও জাতির পিতা।খোকার জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়া হবে বাংলার অধিকারহারা মানুষের রাজনীতির তীর্থস্থান!

- Advertisement -shukee

বঙ্গবন্ধু ৫৪বছরের জীবনে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে প্রায় ১৪বছর (৪হাজার ৬৮২দিন) ১৮ বার কারাভোগ করেছেন।বাংলার মানুষের অধিকার ও জনস্বার্থের কথা বলতে গিয়ে মুজিব জেল খেটেছেন বারবার। জীবনের সব আরাম-আয়েস,সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রাম করেছেন অবিরাম। শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে সব অন্যায় অবিচারের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে,বাংলার মানুষের ন্যায্য কথা উচ্চারণ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন অনেকবার।গরিবের খাদ্যের জন্যে ভুখামিছিল করতে গিয়েও দুবছর পাঁচমাস ভোগ করেছেন কারাবাস।মুজিবের এ অপরিসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফসল আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। হাজার বছর ধরে অবহেলিত এ জনপদের অনাহারক্লিষ্ট হতভাগ্য মানুষ অপেক্ষার প্রহর গুণছিল তাদের মুক্তির গানের আশায়।অসাধারণ সেই সুরের নেশায় বাংলার মুক্তিকামী মানুষ জড়ো হয়েছিল রেসকোর্স মাঠে। সেই এক চরম উত্তেজনা,ছিল উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। অবশেষে এলেন মহাকবি,শোনালেন তাঁর মহান কবিতাখানি। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”মহাকবির এ কবিতার মন্ত্রে উজ্জীবিত বাঙালি জাতি একসাগর রক্ত আর দুলাখ ঊনসত্তর  হাজার মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এ জনপদের জাগ্রত জনতা পেয়েছে সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

বঙ্গবন্ধু মুজিব বাংলার মুকিটহীন সম্রাট,মহান এক জননেতা। নেতৃত্বের গুণাবলীতে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়, দেশপ্রেমে ছিলেন পরীক্ষিত; লক্ষ্য অর্জনে ছিলেন অবিচল।চালচলন আচার আচরণ, সাংগঠনিক দক্ষতা, সন্মোহনী বাগ্মিতা,মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা,স্বাধীনচেতা, আত্মসম্মানবোধ, উদ্যোগ গ্রহণের সক্ষমতা,সাহস ও আত্মপ্রত্যয় সবগুণেই ছিলেন গুণান্বিত।দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। অদম্য সাহসিকতায় করেছেন লড়াই অবিসংবাদিত এ নেতা; জনস্বার্থে জীবন করেছেন উৎসর্গ। দমাতে পারেনি তাঁকে কোনো বাধা। শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু তুচ্ছ করে তিনি করেছেন আন্দোলন-মুক্তিসংগ্রাম।

মুজিব শুধু একটি নাম নয়, সমাজবদলের মহান প্রতিকৃতি, স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস।রাজনীতির পালাবদলের কারিগর।মুজিব ছিলেন আন্দোলনের দাবানল,পথহারা মানুষের দিশারী। মুজিবের সুকোমল হৃদয় বিশাল আকাশের মতো উদার। আপাদমস্তক তিনি ছিলেন বাঙালি, শোষণহীন সমাজের স্বপ্নচারি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নেমে আসা বৃষ্টিধারা,ঘনকুয়াশা ঢাকা আকাশে সেই কাঙ্ক্ষিত সূর্যের হাসি। সবধরনের বৈষম্যের বিপরীতে ছিল তাঁর অনড় অবস্থান।মুজিব ছিলেন মহাপ্রাণ, অমাবশ্যার আকাশে পূর্ণিমার ঝলমলে চাঁদ।মুজিব বাংলা ও বাঙালির গর্ব ,অনুসঙ্গ। তিনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন; মরেও তিনি অমর।বিশ্ববুকে ঘাতকেরা তাঁকে খতম করে ভীষণ ভুল করেছিল।মুজিব বিশ্ববাগানের সেরা ফুল,বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য,গৌরব আর অহঙ্কার।তাঁর মাধ্যমে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আজন্ম সাধনার ধন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ মুজিব পরাধীন বাঙালিকে স্বাধীন করে বিশ্বমানচিত্রে দিয়েছেন স্থান। ন্যায়নীতির পূজারি,সত্যের সাধক, প্রগতির ধারক দেশপ্রেমিক নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু মুজিব।

মুজিব বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের এক মহানায়ক,স্বাধীন-বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। জীবনের চেয়ে বাংলার মানুষকে বেশি ভালোবাসতেন বলেই উৎসর্গ করেছিলেন জীবন-যৌবন গণমানুষের কল্যাণে।ধরণীর বুকে চিরঞ্জীব মুজিব বীর-বাঙালির অহঙ্কার, আত্মপরিচয়, একটি পতাকা,একটি মানচিত্র,স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ ও অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার প্রেরণা।মুজিব মানে ভালোবাসা,অন্ধকারে প্রজ্জ্বলিত আলোকশিখা,দুর্দিনের বিশ্বস্ত কাণ্ডারি,বাংলার নিপীড়িত মানুষের আশা-ভরসার স্থলভিত্তি। মুজিব মানে মুক্তি।বঙ্গবন্ধু মুজিব নেতৃত্ব ও অনুপ্রেরণায় পথ দেখিয়েছিল দিশাহারা জাতিকে,সাহস জুগিয়েছে জনমনে। হাজার বছরের পরাধীন দারিদ্র্য-শিক্ষাবঞ্চিত বাঙালি তাঁর ঐন্দ্রজালিক নেতৃত্বে হয়েছে ঐক্যবদ্ধ। অশ্রু আর রক্তের সাগর সাঁতরে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে তিনি দিয়েছিলেন নজিরবিহীন নেতৃত্ব। তাই তো আমরা বলি,বাংলাদেশ-বঙ্গবন্ধু-স্বাধীনতা সবই একসূত্রে গাঁথা। মুজিব ছিলেন বাঙালি জাতির কল্পনাকারী ও স্বাধীনতার রূপকার।

শৈশবে মুক্তিযোদ্ধা-বাবার মুখে,গর্ভধারিনী মায়ের গল্পকলায়,অগ্রজ ছাত্রনেতাদের কণ্ঠেশোনা একটি কালজয়ী নাম,চেতনার অগ্নিমশাল, অনুভূতিতে অনুরণন তোলা এক বিশাল হিমালয়-যার যাদুস্পর্শে বাঙালি পেয়েছে স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।বাঙালির পরম আরাধ্য মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধু মুজিব।তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষণ,ভাবনায় সক্রিয় ছিল স্বদেশমুক্তির তাড়না- যা জাতিকে দিয়েছে আসল ঠিকানা।যার কণ্ঠস্বর শোনে শিহরিত হয় মানুষ,হয় আবেগে আপ্লুত,জাগরিত হয় শোষণের বিরুদ্ধে ,ঐক্যবদ্ধ হয় স্বাধীনতার মন্ত্রে। যার ডাকে বাঙালি জাতি ঘুরে দাঁড়ায়,হিসাব-নিকাশ বোঝে নিতে শেখে, রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার লালসূর্য। যার অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সাহসী নেতৃত্বের ক্যারিসমায় আমরা পেয়েছি স্বাধীন-সার্বভৌমস্ব দেশ,বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বর মানে একটি ইতিহাস,সৃষ্টির প্রসববেদনা। তাঁর আগুনঝরানো জ্বালাময়ী আবেগময় বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে ভেসে আসে হাজারবছরের দুঃশাসনের অন্ধকার বিভীষিকাময় ইতিহাস, অধিকারহারা মানুষের বোবাকান্না আর যাপিত দিনের কথা। যে বজ্রকণ্ঠের অপার মহিমায়, ঐতিহাসিক উদাত্ত আহবানে অধিকার ও স্বাধীনতাবঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের মনে জেগে ওঠে সাহসের সুপ্তকণিকা,ধারণ করে দিকনির্দেশনা। যে বজ্রকণ্ঠে তৈরি হয় ঐতিহাসিক অমর কবিতা, খুঁজে পায় মানুষ তাতে জীবনের আসল বারতা। দীর্ঘদিন প্রতীক্ষা শেষে বাঙালি ফিরে পায় স্বপ্নের স্বাধীনতা।

জাতির পিতা মুজিব স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে দায়িত্ব নিলেন প্রধানমন্ত্রীর।যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করলেন মনেপ্রাণে। প্রশাসনিকব্যবস্থার পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণ,পরিত্যক্ত ব্যাংক-বীমাশিল্পের জাতীয়করণসহ আরও নানান পদক্ষেপ। দুর্নীতিবিরোধী শক্ত অবস্থানসহ নিলেন বিভিন্ন উদ্যোগ। ক্ষেপে গেল স্বাধীনতাবিরোধী সুবিধাবাদীচক্র। কলঙ্কিত হলো মধ্যরাত ১৫ আগস্ট। চিরতরে হারিয়ে গেলেন মুজিব সপরিবারে।

এক মুজিব লোকান্তরে,কোটি মুজিব বাংলার ঘরে ঘরে।স্বাধীন-বাংলাদেশের অস্তিত্বে মুজিব নামটি মিশে আছে।সাগরের ঢেউ,নদীর জোয়ারভাটা,কোকিলের গান আর বাঁশির সুরে শোনা যায় শেখ মুজিবের রব। একুশের বইমেলায়,ডিসেম্বরের বিজয়মেলায়,সোহরাওয়ার্দী উদ্যান,লালদিঘির জনসভায় সবার মুখে একটি নাম- শেখ মুজিবুর রহমান। মুজিব মরেও অমর,অক্ষয়, অবিনশ্বর।মৃত্যুকে জয় করে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-কর্ণফুলির ঢেউয়ে ভেসে বেড়ায় একটি আওয়াজ, একটি জয়ধ্বনি,সাহসের প্রতিধ্বনি-প্রতিবাদ, হিমালয়ের মূর্তপ্রতিক-সেই মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব।

পরিশেষে বলতে চাই, বঙ্গবন্ধু মুজিব বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছেন।বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ,বাংলাদেশ মানে বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু কোনো দলের নন, তিনি জাতির পিতা। জাতির পিতাকে নিয়ে কটূক্তি,অশালীন ও অসম্মানজনক মন্তব্য করা সভ্যতা ও ভব্যতার পর্যায়ে পড়ে না। রাজনৈতিক নীতি-আদর্শ ভিন্ন হলেও জাতির পিতাকে নিয়ে কারো কোনো বিরূপ মন্তব্য করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।দেশপ্রেমিক কোনো সচেতন সুনাগরিক কখনো জাতির পিতাকে অশ্রদ্ধা ও অসম্মান করতে পারে না।ন্যূনতম জাতীয়তা ও দেশাত্মবোধ থাকলে জাতির পিতাকে নিয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়,৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর স্বাধীন-বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ধ্বংসের যে অভাবনীয়, অপ্রত্যাশিত ও ন্যাক্কারজনক তাণ্ডবলীলা চলছে- তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একটি সভ্য দেশে এটি কল্পনাও করা যায় না। বাবার অপরাধের জন্যে পুত্র-কন্যাকে, পুত্র-কন্যার অপরাধের জন্যে বাবাকে দায়ী করা কোনো আইনে নেই।সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্যায় করলে তার জন্যে তো তার বাবা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে দায়ী করা যায় না।

আমি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট কালোরাতে বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ যারা শাহাদতবরণ করেন তাঁদের পরমাত্মার প্রশান্তি কামনা করছি।

লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

 

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও