Monday, 17 August 2026

[the_ad id='15178']

পাবলিক পরীক্ষায় এফ গ্রেড  বা ফেল প্রথা বাতিল করে ই গ্রেড চালু করা হোক

মোহাম্মদ ইউসুফ

পাবলিক পরীক্ষায় মূল্যায়নে গ্রেডিং সিস্টেম চালু হলেও এফ গ্রেড (ফেল) প্রথা বিদ্যমান থাকায় প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবনে নেমে আসে অমানিশার ঘোর অন্ধকার। ১০বছর লেখাপড়াশেষে শিক্ষাজীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থীকে যখন ফেল বা অকৃতকার্য ঘোষণা করা হয়, তখন তা একজন শিক্ষার্থীর মানসিক,পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নেমে আসে মহাবিপর্যয়। পরীক্ষায় পাস-ফেল এর এই ফলাফল ঘোষণা আর কতদিন চলবে?  আমাদের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায়, পাবলিক পরীক্ষায় মূল্যায়নে প্রচলিত এফ গ্রেড বা ফেল প্রথা বাতিল করে ই গ্রেড চালু করা হোক।

- Advertisement -

বর্তমানে এসএসসিতে গ্রেডিং সিস্টেমে ৮০-১০০ নম্বর পেলে এ+,গ্রেড পয়েন্ট ৫, ৭০-৭৯ নম্বর পেলে এ, গ্রেড পয়েন্ট ৪, ৬০-৬৯ নম্বর হলে এ-, গ্রেড পয়েন্ট ৩-৫০, ৫০-৫৯ নম্বর হলে বি, গ্রেড পয়েন্ট ৩, ৪০- ৪৯ নম্বর হলে সি, গ্রেড পয়েন্ট ২, ৩৩-৩৯ নম্বর হলে ডি, গ্রেড পয়েন্ট ১ এবং ০-৩২ নম্বর পেলে, এফ, গ্রেড পয়েন্ট ০। ৩২ বা এর কম নম্বর পেলে পরীক্ষার্থীকে ফেল ধরা হয়। ফেল ধরার এ প্রচলিত নিয়মটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

- Advertisement -shukee

উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই পাবলিক পরীক্ষায় ‘ফেল’ শব্দটির ব্যবহার নিরুসাহিত করা হয়। গ্রেড বা লেভেলভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে সবার উত্তীর্ণ হওয়া নিশ্চিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নম্বরের পরিবর্তে এ,বি,সি,বা স্কেলভিত্তিক গ্রেড (যেমন জিপিএ বা জিসিএসই গ্রেড) দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থী ন্যূনতম গ্রেড (ডি) না পেলেও তাকে সরাসরি ‘ফেল’ হিসেবে না দেখিয়ে মানোন্নয়নের সুযোগ দেয়া হয়। তাই পাবলিক পরীক্ষায় ফেল প্রথা বাদ দিয়ে শুধু গ্রেড পয়েন্ট বা ইতিবাচক মূল্যায়নের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করতে হবে। একথায় মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও সহজ ও মানবিক হতে হবে।

৩২ বা তার কম নম্বর পেলে ওই শিক্ষার্থীকে ফেল বা অকৃতকার্য ঘোষণা না করে তাকে ই গ্রেডে পাস ঘোষণা করতে সমস্যা কোথায়। এফ গ্রেডের (ফেল) পরিবর্তে  ই গ্রেড-এ রেজাল্ট দেয়া হলে তো আর অসুবিধা থাকে না। গতানুগতিক নিয়মে যুগের পর যুগ পাস-ফেল পদ্ধতি চলছে, যা সমাজজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলে, তাতে সংস্কার আনা এখন সময়ের দাবী। যেকোনো পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফল নয়, শুধু ফল ঘোষণা করতে হবে। পাবলিক পরীক্ষায় হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে ফেল ঘোষণার কারণে পরীক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের মানসিক ও সামাজিক জীবনে কী অশান্তি নেমে আসে, আমাদের শিক্ষামন্ত্রক তা অনুভব করতে পারে বলে মনে হয় না। সময়ের তাগিদে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংস্কার ও পরিবর্তর আনা প্রয়োজন। ঠিক তেমনি, পাবলিক পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও সংস্কার করতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থীকে কেন সারা জীবন ফেলের কলংকের বোঝা আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হবে। কোনো বিষয়ে ৩৩ ফেলে পাস আর ১নম্বর কম পেলে সে ফেল-এটি কোনো সুবিচার হতে পারে না। গ্রেডিং সিস্টেমে পাস-ফেল থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এফ গ্রেড না বলে পরীক্ষার্থী ই গ্রেডে পাস করেছে বললে- কী এমন অসুবিধা। ই-গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে মানোন্নয়ন পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ট  করার সুযোগ পাবে।

পাবলিক পরীক্ষায় ফেল বা অকৃতকার্য পদ্ধতির কারণে নানা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনে। পরীক্ষায় ফেল বা ব্যর্থতার কারণে শিক্ষার্থীর মধ্যে তীব্র হতাশা,দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ তৈরি হয়। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তীব্র অপমানে পরীক্ষার্থীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। পাবলিক পরীক্ষায় ফেল বা অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত জীবন, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে তীব্র মানসিক অবসাদ, আত্মবিশ্বাসের পতন, সামাজিক লজ্জা বা হীনম্মন্যতা এবং শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে পরীক্ষার্থী নিজের মেধা নিয়ে তীব্র সংশয় ও হীনম্মন্যতায় ভোগে। এছাড়া পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের কড়া কথা এবং অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ সহ্য করতে হয় শিক্ষার্থীকে। বন্ধুমহল ও সমাজে মুখ দেখাতে না পারার ভয় কাজ করে। লজ্জা ও অপমানে শিক্ষার্থী সমাজ ও বন্ধু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ফেলকরা নারী-পরীক্ষার্থীদের বিয়েশাদীর ক্ষেত্রে অনেকসময় বাধা তৈরি হয়। এছাড়া আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশির নেতিবাচক মন্তব্যে শিক্ষার্থীকে মানসিক ও শারীরিকভাবে দুর্বল করে তোলে। অন্যদিকে মা-বাবার অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও বকাঝকা শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙ্গে দেয়। শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় দীর্ঘ গ্যাপ তৈরি হয়ে শিক্ষাজীবন থমকে যায়। এ পর্যন্ত কী পরিমাণ পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় ফেল করে আত্মহত্যা করেছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ছয়দিনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে দশজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু ও আত্মহত্যার খবর গণমাধ্যমে ওঠে এসেছে। এর মধ্যে সাতজন মেয়ে ও তিনজন ছেলে। এ বিষয়টি কী আমাদের শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের একটুও ভাবায় না?

পরীক্ষায় ফেল করা কোনো শিক্ষার্থীর জীবনে শেষ বা চূড়ান্ত কোনো পরাজয় নয়, বরং এটি নিজের ভুলগুলো সংশোধন করে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। দুভার্গবশত, আমাদের সমাজ ও পরিবার অনেক সময় পরীক্ষার ফলাফলকে জীবনের একমাত্র মাফকাঠি বানিয়ে ফেলে, যা একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বড়ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। এই বিপর্যয়গুলো বুঝতে পারলে এবং তা কাটিয়ে ওঠার সঠিক উপায়গুলো জানলে যেকোনো শিক্ষার্থী আবার সফলতার চূড়ায় পৌঁছাতে পারে।

পরিশেষে বলতে চাই, পাবলিক পরীক্ষায় আর পাস-ফেল নয়, গ্রেড অনুয়ায়ী ফল ঘোষণা করার বিধান চালু করতে হবে। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ফেল বলতে কিছু নেই। এ+, এ-, বি, সি, ডি ই গ্রেড পয়েন্ট-এ ফল প্রকাশ করা হবে। এফ গ্রেড কিংবা ফেল (FAIL) বলে কিছু থাকবে না। এফ গ্রেডের বদলে হবে ই গ্রেড। এ পদ্ধতি চালু হলে পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ঘরে ঘরে  আর কান্নার আহাজারি প্রতিধ্বনিত হবে না, শোনা যাবে না ফেলকরা পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার দুঃসংবাদ। পরীক্ষা চলাকালীন স্নায়ুচাপমুক্ত থাকবে পরীক্ষার্থীরা। পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনের সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হবে। আমাদের শিক্ষামন্ত্রক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় নেবে-সেই প্রত্যাশা করছি।

লেখক- প্রধানসম্পাদক. সাপ্তাহিক চাটগাঁরবাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

 

 

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও