চট্টগ্রাম মহানগরীর ব্যস্ত নগরজীবনের আড়ালে পানি সংকটের সঙ্গে লড়ছেন নিম্নআয়ের মানুষ। বিশেষ করে নারীদের জীবনে এর প্রভাব আরও গভীর। পানি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, রান্না, সন্তান লালন-পালন ও কর্মজীবনের চাপের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও মাসিককালীন পরিচ্ছন্নতার নানা সংকট।
চট্টগ্রাম নগরীতে পানির অপ্রতুলতা বা তীব্র সংকট সত্যিই লাখ লাখ মানুষের জন্য এক নিত্যদিনের চরম ভোগান্তি এবং বাড়তি মানসিক ও অর্থনৈতিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এবং নগরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে।

নগরীর চারপাশে এখন সুউচ্চ ভবন, আধুনিক আবাসিক এলাকা, শপিংমল আর ব্যস্ত সড়ক। শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছে মানুষ। কোথাও পানির সরবরাহ নিয়ে বড় কোনো চিন্তা নেই, আবার সেই একই নগরের কোনো কোনো ঘনবসতিপূর্ণ নিম্নআয়ের আবাসিক এলাকায় একটি বালতি পানি যেন দিনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
চট্টগ্রামের আকবরশাহ এলাকার এক কলোনীর সরু পথের পাশে দেখা যায় সারি সারি বড় ড্রাম, বালতি ও বিভিন্ন পাত্র। কোথাও রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য, কোথাও গোসল কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনের জন্য পানি জমিয়ে রাখা হয়েছে। পানি কখন আসবে, কতক্ষণ থাকবে এই অনিশ্চয়তায় আগেভাগেই পানি ধরে রাখতে হয় বাসিন্দাদের।
এমন ভুক্তভোগি সোহানা আক্তার (ছদ্ম নাম) নামে এক নারী বলেন, “আমগো টাকা কম, পানিও কম। তবে দুঃখ বেশি।”
একটি বাক্যেই যেন উঠে আসে নগর জীবনের আরেকটি বাস্তবতা, একই শহরে বসবাস করলেও পানির সুযোগ সবার জন্য সমান নয়।
পানি আছে, কিন্তু সবার জন্য সমান নয়।
নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর অভিযোগ, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাদের আয়ের বড় একটি অংশ চলে যায়।মালিক পক্ষ বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের উদ্যোগে গভীর নলকূপ বা পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সেখানেও শেষ হচ্ছে না ভোগান্তি। কখনো পানির চাপ কম, কখনো পানি থাকে না। আবার মোটর নষ্ট হলে পুরো ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়ে। অথচ পানি ও অন্যান্য সেবার বিল দিতে হয় নিয়মিত।
বাসিন্দাদের ভাষ্য, আবাসিক এলাকার বিভিন্ন খরচের পাশাপাশি পানির বিল, গ্যাস বিল, নিরাপত্তার জন্য দারোয়ানের বেতন কিংবা বিভিন্ন ধরনের মাসিক চাঁদা সব মিলিয়ে মাস শেষে খরচের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা নারীর কাঁধে
পানির সংকটের প্রভাব পরিবারের সবার ওপর পড়লেও এর সবচেয়ে বড় অংশ বহন করতে হয় নারীদের।একই বাড়ির দুই-তিনটি কক্ষের জন্য একটি সাধারণ বাথরুম ও গোসলখানা ব্যবহার করতে হলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নারীদের জন্য বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর।মাসিকের সময় পর্যাপ্ত পানি, পরিষ্কার ও ব্যক্তিগত জায়গার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সংকীর্ণ বাসস্থান এবং কমন বাথরুমের কারণে অনেক নারীকে প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি ব্যবহার করতে হয় কিংবা সময় ও সুযোগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘ সময় কাজ করা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, শরীরচর্চার সুযোগ না থাকা এবং সারাদিনের শারীরিক পরিশ্রম।
এগুলো শুধু জীবনযাত্রার অসুবিধা নয়; দীর্ঘমেয়াদে নারীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ভোরে পানি, দিনে কারখানা, রাতে সংসার
গার্মেন্টসে কর্মরত অনেক নারীকে দিনের কাজ শুরু করার আগেই পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে রাখতে হয়। ভোরে ঘুম থেকে উঠে পানি ভর্তি করা, শিশুদের জন্য খাবার প্রস্তুত করা, ঘরের কাজ শেষ করে কর্মস্থলে ছুটে যাওয়া ।দিন শুরু হয় এভাবেই। এরপর দীর্ঘ কর্মঘণ্টা শেষে নগরের যানজট পেরিয়ে রাতে বাসায় ফিরতে হয়।
ফিরে অপেক্ষা করে আরেক দফা দায়িত্ব- রান্না, সন্তানদের দেখাশোনা, ঘরের কাজ। দিনের শেষে যখন বিশ্রামের সময়, তখনও কখনো বিদ্যুৎ থাকে না। গরম ও অস্বস্তির মধ্যে ঘুমাতে হয়। পরদিন আবার একই রুটিন।
এই ধারাবাহিক চাপ একজন নারীর মানসিক স্বস্তি, ঘুম এবং সামগ্রিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
শহর যত বড় হচ্ছে, অদৃশ্য হচ্ছে কিছু গল্প
চট্টগ্রাম শুধু বড় বড় ভবন আর ব্যস্ত সড়কের শহর নয়। এসব স্থাপনার আড়ালেই রয়েছে এমন অনেক পরিবার, যারা শহরের অর্থনীতিতে শ্রম দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়ে।
তাদের সন্তানদের অনেকেই স্কুলে যায়। তারা শহরেরই মানুষ, শহরের অর্থনীতির অংশ। কিন্তু বসবাসের জায়গায় পর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তা এখনও তাদের জীবনের বড় প্রশ্ন।
পানির পাত্রগুলো তাই শুধু পানি ধরে রাখার পাত্র নয়। এগুলো একটি পরিবারের প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা ধরে রাখে।
একটি ড্রাম ভর্তি পানি মানে হয়তো পরদিন সকালে রান্না হবে। একটি বালতি পানি মানে গোসলের সুযোগ। আর কয়েকটি ছোট পাত্রে জমিয়ে রাখা পানি হয়তো একটি পরিবারের পুরো দিনের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা।
উন্নয়নের হিসাবের বাইরে থাকছে কারা?
চট্টগ্রাম মহানগরীর নগর উন্নয়ন নিয়ে যখন অবকাঠামো, সড়ক, ভবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আলোচনা হয়, তখন এসব নিম্নআয়ের আবাসিক এলাকার জীবনযাত্রার মানও সেই আলোচনার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
কারণ নিরাপদ পানি শুধু একটি পরিষেবা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নারীর মর্যাদা, শিশুদের সুস্থতা এবং একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
একজন মানুষের আয় কম হলে তার পানির প্রয়োজন কমে যায় না। বরং কম আয়ের পরিবারে পানি সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার বাড়তি দায়িত্বটি অনেক সময় নারীর ওপরই বেশি বর্তায়। তাই প্রশ্ন শুধু চট্টগ্রামে পানি আছে কি? না হয়ে
প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘কার ঘরে কতটা পানি পৌঁছাচ্ছে, কী দামে পৌঁছাচ্ছে এবং সেই পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে কাদের কতটা সময়, শ্রম ও স্বাস্থ্য খরচ হচ্ছে?’
সুউচ্চ ভবনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এসব ঘর হয়তো শহরের মানচিত্রে খুব ছোট। কিন্তু এখানকার মানুষের জীবনও এই নগরেরই অংশ।
আর সেই জীবনের গল্পটি হয়তো ওই নারীর কথাতেই সবচেয়ে সংক্ষেপে ধরা পড়ে-
“আমগো টাকা কম, পানিও কম। তবে দুঃখ বেশি।”

