বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬

[the_ad id='15178']

চট্টগ্রাম মহানগরীর খসড়া মহাপরিকল্পনা বিষয়ে জনমত ও সুপারিশ

আতাউল হাকিম আরিফ

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) কর্তৃক প্রকাশিত চট্টগ্রাম মহানগরীর খসড়া মহাপরিকল্পনা বিষয়ে জনমত আহ্বানের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। একটি নগরীর ভবিষ্যৎ কেবল স্থপতি, প্রকৌশলী কিংবা পরিকল্পনাবিদদের হাতে নির্ধারিত হয় না; বরং নাগরিক সমাজ, গবেষক, পরিবেশবিদ, শিক্ষাবিদ, উন্নয়নকর্মী এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণেই একটি টেকসই ও বাস্তবভিত্তিক মহাপরিকল্পনা গড়ে ওঠে। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কিছু ভাবনা ও সুপারিশ উপস্থাপন করছি।

- Advertisement -

চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী নয়; এটি দেশের অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন, প্রধান সমুদ্রবন্দর, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই নগরী একদিকে পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও জীববৈচিত্র্যের অপূর্ব সমন্বয়, অন্যদিকে দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ এবং অবকাঠামোগত চাপের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

- Advertisement -shukee

বিশ্বব্যাপী নগর উন্নয়নের ধারণা এখন আর শুধু সড়ক, ভবন কিংবা ফ্লাইওভার নির্মাণে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক নগর পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানবিক নগর গড়ে তোলা। সেই বিবেচনায় চট্টগ্রাম মহানগরীর মহাপরিকল্পনাকে শুধু উন্নয়ন নকশা নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহনশীল নগর

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ নগরী। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, বন্যা, পাহাড়ধস এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকি ভবিষ্যতে নগরজীবনকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই মহাপরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে একটি শক্তিশালী জলবায়ু সহনশীলতা কাঠামো (Climate Resilience Framework)।

নগরীর ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো নির্মাণ, আবাসন পরিকল্পনা এবং জনসেবাকে জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় পুনর্গঠন করতে হবে। পাশাপাশি আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা করিডোর এবং ঝুঁকিভিত্তিক নগর পরিকল্পনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

জলাবদ্ধতা নয়, জল-স্মার্ট চট্টগ্রাম

প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের অন্যতম বড় নগর সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়। অথচ এই নগরীর ঐতিহ্যবাহী খাল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ একসময় বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের কার্যকর মাধ্যম ছিল।

খাল পুনরুদ্ধার, জলাভূমি সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, আধুনিক স্টর্মওয়াটার ম্যানেজমেন্ট, জলধারণ ও সংরক্ষণ জলাধার (Retention Pond) এবং বন্যা প্রশমন বাফার অঞ্চল (Flood Buffer Zone) গড়ে তোলার মাধ্যমে সমন্বিত নগর জলব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

জলকে সমস্যা নয়, বরং ভবিষ্যৎ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

পাহাড়, বন ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা

চট্টগ্রামের পাহাড় ও বনাঞ্চল এই নগরীর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বলয়। অবৈধ পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপন বন্ধ করে পাহাড়ি অঞ্চলকে সংরক্ষিত পরিবেশ এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

নগর বনায়ন, সবুজ করিডোর (Green Corridor), সবুজ বেষ্টনী (Green Belt), নগর উদ্যান এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।

পরিকল্পিত জোনিং ও সুষম নগরায়ণ

ভবিষ্যৎ চট্টগ্রামকে পরিকল্পিত জোনিংয়ের আওতায় আনতে হবে। প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, আবাসিক, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন, কৃষি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য পৃথক জোন নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বিশেষভাবে একটি আইটি পার্ক, ইনোভেশন হাব, গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক নগর অঞ্চল (Knowledge District) এবং কৃষি সংরক্ষণ অঞ্চল (Agricultural Protection Zone) গড়ে তোলা গেলে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।

আধুনিক ও সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা

যানজটমুক্ত ও টেকসই নগর গঠনে গণপরিবহনকেন্দ্রিক পরিকল্পনা অপরিহার্য। বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (BRT), সম্ভাব্য মেট্রোরেল, সাইকেল লেন, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো এবং স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক জলপথ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

একইসঙ্গে বন্দর, বিমানবন্দর, বে-টার্মিনাল, কর্ণফুলী টানেল এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহকে একটি সমন্বিত যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে।

আধুনিক স্যুয়ারেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

একটি আন্তর্জাতিক মানের নগরীর জন্য আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা অপরিহার্য। চট্টগ্রামে পূর্ণাঙ্গ স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক, বর্জ্য শোধনাগার, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং আধুনিক কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

একইসঙ্গে পুনর্ব্যবহারযোগ্য অর্থনীতি (Circular Economy) ধারণা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

শিশু, নারী ও প্রবীণবান্ধব নগর

একটি নগর কতটা উন্নত, তা নির্ভর করে সেখানে শিশু, নারী, প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী কতটা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারছে তার ওপর।

প্রতিটি ওয়ার্ডে শিশু পার্ক, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত সবুজ স্থান, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং নিরাপদ গণপরিসর নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে নারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণকে পরিকল্পনার বাধ্যতামূলক অংশ করতে হবে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষানিরাপত্তা

ভবিষ্যৎ চট্টগ্রামকে হতে হবে একটি স্বাস্থ্যনিরাপদ ও জ্ঞাননির্ভর নগরী। পরিকল্পিত স্বাস্থ্যসেবা জোন, বিশেষায়িত হাসপাতাল, ট্রমা সেন্টার, জরুরি চিকিৎসা করিডোর এবং দুর্যোগ-সহনশীল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন।

একইসঙ্গে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।

কর্ণফুলীকে কেন্দ্র করে নতুন নগর দর্শন

কর্ণফুলী শুধু একটি নদী নয়; এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির প্রাণরেখা। তাই নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ, তীর সংরক্ষণ, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, ওয়াটারফ্রন্ট উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব জলপথ যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বয়ে কর্ণফুলীকে ঘিরে নতুন নগর দর্শন গড়ে তোলা প্রয়োজন।

স্মার্ট সিটি থেকে মানবিক নগর

ডিজিটাল প্রযুক্তি, জিআইএসভিত্তিক পরিকল্পনা, স্মার্ট ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, রিয়েল-টাইম জলাবদ্ধতা পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল ভূমি তথ্যব্যবস্থা এবং নাগরিক সেবার একীভূত প্ল্যাটফর্ম একটি আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য অংশ।

তবে প্রযুক্তি কখনোই উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; মানুষের জীবনমান উন্নয়নই হবে সকল পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য।

পরিশেষে আমরা নিশ্চিত হতে  চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ কেবল ইট-পাথরের অবকাঠামো নির্মাণে নয়; বরং একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দুর্যোগ-সহনশীল নগর গঠনের মধ্যেই নিহিত।

আজ যে মহাপরিকল্পনা প্রণীত হবে, সেটিই আগামী কয়েক প্রজন্মের চট্টগ্রামের রূপরেখা নির্ধারণ করবে। তাই এ পরিকল্পনা হতে হবে দূরদর্শী, বিজ্ঞানভিত্তিক, পরিবেশ-সংবেদনশীল এবং অংশগ্রহণমূলক।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত-

“চট্টগ্রাম ২০৫০: একটি জলবায়ু সহনশীল, দুর্যোগ-নিরাপদ, সবুজ, স্মার্ট, জ্ঞানভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিশ্ব প্রতিযোগিতায় সক্ষম বন্দরনগরী।”

এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রাজধানী হিসেবেই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক, টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানের বন্দরনগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক পরিচিতি: প্রকল্প কর্মকর্তা , ইপসা।

সর্বশেষ

‘কাজল চোখের মেয়ে’

এই বিভাগের আরও