মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রমোট করা নিঃসন্দেহে গভীরভাবে দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক।যে আদর্শের বিনিময়ে এই দেশ জন্ম নিয়েছিল,সেই আদর্শের বিরুদ্ধেই যখন রাষ্ট্রীয় নীতি ও আচরণ দাঁড়িয়ে যায়,তখন তা জাতির ইতিহাসে এক ভয়াবহ বৈপরীত্য সৃষ্টি করে।
একাত্তরের চেতনার বিরোধীরা প্রকাশ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করছে, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের হুমকি দিচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দৃষ্টতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার গভীর সংকটের প্রতিফলন।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো,এই অপশক্তির দৌরাত্ম্য যেন ক্রমেই সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এতে শুধু মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগই অবমূল্যায়িত হচ্ছে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও ইতিহাস বিকৃত হয়ে উপস্থাপিত হচ্ছে।
যেখানে সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক হওয়ার কথা, সেখানে সরকারই যখন রাজাকারদের উত্তরাধিকারীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করে, তখন তা শুধু রাজনৈতিক ভুল নয়,এটি ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
একটি সরকার যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জায়গা থেকে সরে গিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রশ্রয় দেয়, তবে সেটি সাময়িক রাজনৈতিক লাভ এনে দিলেও ইতিহাসে তা কখনো ক্ষমার যোগ্য হয় না। এই ধরনের কর্মকাণ্ড জাতির স্মৃতিতে একটি কালো অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে,যেখানে শহীদের রক্তের দায় অস্বীকার করা হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে প্রান্তিক করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলীয় সম্পদ নয়,এটি জাতির অস্তিত্বের ভিত্তি। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে রাষ্ট্র, সমাজ ও ভবিষ্যৎ,সবই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই সময় এসেছে ইতিহাসের সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার এবং স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়ার।কারণ ইতিহাস নীরব থাকে না,সে সময় হলে হিসাব নিতেই জানে।
একটি রাষ্ট্র যদি নিজের জন্মের ইতিহাস ও চেতনার সঙ্গে আপস করে, তবে সেই রাষ্ট্র নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। স্বাধীনতা-বিরোধীদের প্রশ্রয় দেয়া, তাদের পুনর্বাসন বা প্রচ্ছন্ন সমর্থন,সবই ইতিহাসে নেতিবাচক হিসেবেই মূল্যায়িত হবে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে- যা জাতিকে দীর্ঘদিন বহন করতে হবে।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, কীভাবে একজন স্বাধীনতাবিরোধী প্রজন্মের শিবিরকর্মী, আনিস আলমগীরের মতো একজন সিনিয়র, বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভীক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মারধরের আষ্ফালন দেখাতে পারে? একটি গণতান্ত্রিক সমাজে প্রশ্ন তোলার অধিকার সবার আছে, কিন্তু সেই অধিকার কখনোই সহিংসতা, হুমকি বা দম্ভের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে না। এই দুঃসাহস ব্যক্তিগত শক্তি থেকে আসে না; আসে রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়, বিচারহীনতা এবং ভুল রাজনীতির ছায়া থেকে।
আনিস আলমগীর কোনো ব্যক্তি নন,তিনি একটি আদর্শের প্রতীক। তিনি সেই সাংবাদিকতার প্রতিনিধিত্ব করেন, যে সাংবাদিকতা ভয় পায় না, মাথা নত করে না, এবং সত্য বলার দায় থেকে সরে আসে না। এমন একজন সাংবাদিককে হুমকি দেয়া মানে কেবল একজন মানুষকে ভয় দেখানো নয়,এটি মুক্তচিন্তা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত।
সাংবাদিকতা কোনো দলের শাখা সংগঠন নয়; এটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একজন সিনিয়র সাংবাদিকের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা মানেই কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, মুক্তচিন্তা, সত্য উচ্চারণ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আঘাত করা। যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রশ্নকে ভয় পায় এবং কলমের জবাব দিতে চায় হাতুড়ি দিয়ে,সেই সংস্কৃতি আসলে নিজের আদর্শগত দুর্বলতাই প্রকাশ করে।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত একটি স্বাধীন দেশে স্বাধীনতাবিরোধী চিন্তার উত্তরাধিকার নিয়ে কেউ যদি আজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কণ্ঠ, বিশেষ করে দায়িত্বশীল সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর সাহস পায়,তাহলে সেটি রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যবোধ রক্ষায় বড় ধরনের ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সত্যকে চেপে রাখা যায় না। একজন আনিস আলমগীরকে ভয় দেখালে নীরবতা আসবে না,বরং আরও অনেক সত্যনিষ্ঠ কণ্ঠ জেগে উঠবে। কারণ শক্তি আসে অস্ত্র বা হুমকি থেকে নয়, আসে নৈতিক অবস্থান ও সত্যের পক্ষে দৃঢ়তা থেকে। আর সাংবাদিকতার ইতিহাসে,সত্য বলার অপরাধে যারা আক্রমণ করেছে, তারা হারিয়ে গেছে; কিন্তু সত্য উচ্চারণকারীরাই ইতিহাসে টিকে আছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো,এই ধরনের আচরণ প্রমাণ করে, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি আজ নিজেদের এতটাই নিরাপদ মনে করছে যে তারা প্রকাশ্যে সাংবাদিককে হুমকি দিতে পারছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন রাষ্ট্র সত্যের কণ্ঠকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়।
কিন্তু এটাও সত্য,সাংবাদিকের কণ্ঠ দমন করা যায় না।
একজন আনিস আলমগীরকে ভয় দেখালে, থামানো যাবে না,বরং হাজার আনিস আলমগীর আরও দৃঢ় কণ্ঠে সত্য বলার সাহস পাবে।
কারণ সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষ কখনো একা থাকে না,তারা ইতিহাসের সঙ্গে থাকে।
লেখকঃ কথাসাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক


