তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যদিও সরকার এবং নাগরিক সমাজ তামাক নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে, তথাপি তামাক কোম্পানিগুলো নানা কৌশলে তাদের পণ্যকে প্রচার ও বাজারজাত করে চলেছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রতিবছর ৩১ মে “বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস” পালন করে, যার মাধ্যমে বৈশ্বিকভাবে তামাকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হয়।
২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য “তামাক কোম্পানির কুটকৌশল উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি” এই দিবসের গুরুত্বকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে। এটি আমাদের আহ্বান জানায় তামাক ব্যবসার আড়ালে যে ক্ষতি ও কৌশল রয়েছে তা জনসম্মুখে উন্মোচন করে একটি সুস্থ, পরিচ্ছন্ন ও ধূমপানমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য।

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পার করা বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশের অভিযাত্রায়। কিন্তু এই যাত্রাপথে এক ভয়াবহ নিঃশব্দ শত্রু আমাদের সমাজকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে তা হলো তামাক ও নিকোটিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার মানুষ তামাকজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করে। এর অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু।
তামাকের এই ভয়াবহ প্রভাব সত্ত্বেও কেন আমাদের সমাজ এখনও এর বিরুদ্ধে যথাযথ অবস্থান নিতে পারছে না। এর পেছনে রয়েছে তামাক কোম্পানির সুপরিকল্পিত ও লুকায়িত কৌশল যেখানে তারা বিজ্ঞাপনের গোপন চাতুর্য, সামাজিক দাতব্যতার মুখোশ, তরুণদের টার্গেট করে বিপণন এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে দীর্ঘমেয়াদি লাভের নীতি গ্রহণ করছে।
বিজ্ঞাপন বন্ধের আইনের মধ্যেও আমরা দেখি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইফস্টাইল প্রমোশন, ফেসবুক লাইভে স্পন্সরশিপ কিংবা জনপ্রিয় ইউটিউবারদের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে নিকোটিনযুক্ত পণ্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ যেন এক আত্মবিপণনের যুগে নেশাকে সাজিয়ে তুলে ধরার আয়োজন। তামাক কোম্পানিগুলো আজকাল স্মোক-ফ্রি পণ্য, ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টের মাধ্যমে ভিন্নধর্মী ও কম ক্ষতিকর প্রোডাক্টের ধারণা দিচ্ছে যা সম্পূর্ণরূপে বিভ্রান্তিকর।
এছাড়া CSR বা কর্পোরেট সামাজিক দায়িত্বের নামে শিক্ষা, ক্রীড়া ও নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদির আড়ালে তামাক কোম্পানিগুলো তাদের অবস্থান শক্ত করে নিচ্ছে। এইসব প্রোগ্রামে সরকারের কিছু সংস্থা ও কর্মকর্তাদেরও যুক্ত করা হচ্ছে-যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।
যেসব রোগ ছোঁয়াচে না যেমন: ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক ইতাদি রোগে মৃত্যুবরণ করা মানুষের মধ্যে প্রতি ৩ জনে ২ জনই তামাকের কারণে মারা যান। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো এসব রোগে আক্রান্ত হন মূলত কর্মক্ষম মানুষেরা যারা পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। এতে দেশের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তামাক থেকে সরকার যে পরিমাণ ট্যাক্স পায়, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ হয় তামাকজনিত রোগের চিকিৎসায়। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি। সরকার অনেক সময় তামাক কোম্পানিগুলোকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয় যেমন: কর ছাড়, সহজ ব্যবসা অনুমোদন। এসব সুযোগ সুবিধা পেলেও শুল্ক বা কর বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না। অথচ শুল্ক বাড়ালে তামাকের দাম বাড়বে আর দাম বাড়লে অনেকেরই এই ভয়ংকর অভ্যাস দূর হবে।
তামাক নিয়ন্ত্রণে প্রস্তাবিত দাবি ও কার্যক্রমঃ
১. দাম বাড়িয়ে নিরুৎসাহিত করা: তামাকের দাম বাড়ানো হলে মানুষ বিশেষ করে তরুণ ও গরিব শ্রেণির মানুষ কম তামাক কিনবে। এটা তামাকের ব্যবহার কমানোর কার্যকর উপায়।
২. সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক (Specific Supplementary Duty):বর্তমানে তামাকের ওপর কর ব্যবস্থা কিছুটা জটিল এবং ফাঁক-ফোকর রয়েছে।তাই সুনির্দিষ্ট হারে শুল্ক ধার্য করা গেলে তামাক কোম্পানিগুলো সহজে কর ফাঁকি দিতে পারবে না।
৩. ধোঁয়াবিহীন তামাকে ব্যান্ডরোল ও ডিজিটাল ট্যাক্স সিস্টেম: জর্দা, গুল ইত্যাদি ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্যে সরকারের কর আদায় নিশ্চিত করতে বিশেষ সিল বা চিহ্ন (ব্যান্ডরোল) বসানো ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে কর আদায়ের ব্যবস্থা করা উচিত।
৪. তামাক ব্যবসায় লাইসেন্স চালু করা:তামাক উৎপাদন ও বিক্রেতাদের লাইসেন্সের আওতায় আনলে তাদের নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।এতে অবৈধ বিক্রি ও শিশুদের কাছে তামাক বিক্রি রোধ করা যাবে।
৫. সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বাস্তবায়ন: অনেক সময় দোকানে তামাকজাত দ্রব্য সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কমে বা বেশি দামে বিক্রি হয়। নির্ধারিত খুচরা মূল্য সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে এর অপব্যবহার বন্ধ হবে।
৬. মূল্য কারসাজি রোধে বাজার তদারকি: কিছু কোম্পানি কৃত্রিমভাবে দাম কমিয়ে মানুষের মাঝে তামাকের চাহিদা বাড়ায়। নিয়মিত বাজার তদারকি হলে এই কারসাজি বন্ধ করা সম্ভব।
৭. তামাক চাষ নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন:তামাক চাষে জমি ও কৃষকদের ব্যবহার অনেক সময় স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হয়।এজন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন যাতে তামাক চাষ সীমিত হয় এবং কৃষক অন্য ফসল চাষে উৎসাহ পায়।
তামাকমুক্ত বাংলাদেশ শুধু স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনের স্বপ্ন নয়, এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্য সরকার গ্রহণ করেছে, তা কেবলমাত্র সচেতনতা নয় বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত দৃঢ়তা ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়।
তাই আজকের দাবি“তামাক কোম্পানির কুটকৌশল উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি।” এই স্লোগান যেন শুধু একটি ক্যাম্পেইনের শ্লোগান না হয়, এটি হোক এক সম্মিলিত প্রতিজ্ঞা।

