আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়; এটি নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বৈশ্বিক অঙ্গীকারের প্রতীক। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই দিবসটি নতুন তাৎপর্য বহন করছে। একদিকে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর অগ্রগতি, অন্যদিকে ঘরে-বাইরে বাড়তে থাকা সহিংসতা এই বৈপরীত্যের মধ্যেই আমরা এবারের নারী দিবস পালন করছি। এ বছরের প্রতিপাদ্য “আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার” বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি একটি জরুরি সামাজিক ও নৈতিক আহ্বান।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশে অন্তত ৩২ জন নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯ জন কন্যাশিশুর বয়স ১৮ বছরের নিচে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৮৩ জন নারী ও কন্যা।

অন্যদিকে মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি মনিটরিং’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ৬ জন ছিলেন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী। একই মাসে ৮ কিশোরী ও ২৭ নারী আত্মহত্যা করেছেন, আর ৬৫ জন নারী ও শিশু অস্বাভাবিক মৃত্যু বা হত্যার শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৬ জন শিশু-কিশোরী।
বাস্তবতা হলো, এই পরিসংখ্যানগুলো প্রকৃত ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র নয়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনার বাইরেও অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনা লোকলজ্জা, সামাজিক ভয় কিংবা প্রভাবশালীদের চাপে চাপা পড়ে যায়। ফলে বহু অপরাধ কখনো আইনের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি
নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যখন অপরাধীরা দেখে অপরাধ করেও সহজে পার পাওয়া যায়, তখন তাদের অপরাধ করার সাহস আরও বাড়ে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেনে গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু কিংবা নরসিংদীর মাধবদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় এক কিশোরীকে অপহরণ করে হত্যার ঘটনা আমাদের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার নির্মম উদাহরণ। এই ধরনের ঘটনা সমাজে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করে।
নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা
আজ অনেক নারীই নিজেকে নিরাপদ মনে করেন না। শিক্ষাঙ্গন, কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন এমনকি নিজের ঘরেও নারীরা নানা ধরনের সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকেন। অপরাধের শিকার হওয়ার পর যদি বিচার দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, তবে তা অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই বাস্তবতায় নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর সামাজিক উদ্যোগ।
এখনই প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করা। যেহেতু এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্যের প্রথম অংশ “আজকের পদক্ষেপ” বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি জরুরি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, বিচারিক সংস্কার।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং তার দৃশ্যমান বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। একই সঙ্গে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে যেন কোনো অপরাধী পার পেয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি
গণপরিবহনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নারীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌন হয়রানিমুক্ত রাখতে কার্যকর অভিযোগ সেল চালু রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাইবার বুলিং প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষায়িত ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তৃতীয়ত, তৃণমূল পর্যায়ে সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা
উপজেলা পর্যায়ে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে এবং সেগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারী ও শিশুদের জন্য পৃথক আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি।
কেবল আইন প্রয়োগ করেই সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তন। পরিবার থেকেই ছেলে শিশুদের জেন্ডার সংবেদনশীলতা শেখাতে হবে। নারীকে ‘ভোগ্যপণ্য’ নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে সম্মান করার শিক্ষা দিতে হবে।
ইউনিয়ন পর্যায়ে ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতা সভা আয়োজন করা যেতে পারে। অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের মেয়েদের আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং জরুরি হেল্পলাইন ১০৯, ১০৯৮ ও ৯৯৯ ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ব্যাধি। তাই নারী দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত:
প্রথমত:সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা
দ্বিতীয়ত:ন্যায়ের পক্ষে অবিচল অবস্থান
সর্বশেষে একটি মানবিক, নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় লালন ও বাস্তবায়িত করা
“আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার” এই প্রতিপাদ্য যেন কেবল পোস্টার বা ব্যানারের স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থেকে যেন বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়। কারণ আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, তাই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের নিরাপত্তা ও মর্যাদার ভবিষ্যৎ।
লেখিকা: উন্নয়ন সংগঠক

