আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে আইন কী বলে? গণতন্ত্রের চর্চায় পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি কী? নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলটির ভবিষ্যতই বা কী? আইন বিশেষজ্ঞ, ইতিহাসবিদ এবং রাজনীতির বিশ্লেষকরা কী বলছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজব আজকের এক্সপ্লেইনারে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রেখেই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইন (সংশোধিত) ২০২৬। এর মাধ্যমে যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটলো। কোনো দেশের স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী বা এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধের এটা দ্বিতীয় ঘটনা, যা ঘটলো প্রায় ৬ দশক বছর পর।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘জাতীয়তবাদী দল-বিএনপি’ বলেছিল, নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয় তারা। এটি বিচারিক বিষয় বলে মন্তব্য ছিল তাদের। কিন্তু সরকার গঠনের পর তা আইনে পরিণত করলো বিএনপি।
অন্তর্বতী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের পর নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করেছিল। ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে হওয়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারেনি। যদিও সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক রাজনীতির সুযোগ পেতে পারে-দলটির অনেকেই এমন আশা করছিলেন। এমনকি গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা বিভিন্ন জায়গায় বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছেন-এমন জোর প্রচারও আছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
স্বভাবত: আওয়ামী লীগের মাঠের নেতা-কর্মী ছাড়াও সাধারণ সমর্থক গোষ্ঠী হতাশ ও বিপন্ন। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন হচ্ছে: আইনের দৃষ্টিতে বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
এ প্রসঙ্গে আমি কথা বলেছি সিনিয়র আইনজীবী শাহ্দীন মালিকের সাথে। তিনি আমাকে প্রথমেই বলেছেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য্য হলো: পার্লামেন্টে ডিবেট করা। যে কোনো ইস্যুতে দীর্ঘ একই সাথে পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। চলতি সংসদে অন্তবর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশগুলোর সবইগুলোই যৌক্তিক কি না সেই আলোচনাটা র্পালামেন্টে হবে সেটাই ছিল প্রত্যাশিত। তা না হলে নতুন নির্বাচিত সাংসদদের পার্লামেন্টে কাজ কী? একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার মত এত বড় সিদ্ধান্ত সম্বলিত একটি ‘অধ্যাদেশ নিয়ে কোনো আলোচনাই তো হতে দেখলাম না। শুধুমাত্র কণ্ঠভোটে পাস হয়ে গেল একটি দলকে নিষিদ্ধ করার আইন। কিন্তু জনগণের মত কী, সত্যি জনগণ দলটিকে চায় নাকি চায় না-সেই নাগরিক মতামত তো জানা গেল না।
প্রবীণ লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদের সাথেও কথা বলেছি। তিনি আমাকে বলছেন, ‘আওয়ামী লীগের’ রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল ড.ইউনুস। সেই কাজটিকেই আরো একধাপ এগিয়ে নিয়েছে বিএনপি। এক্ষেত্রে একটি নৈতিকতার প্রশ্ন থেকেই যায়, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা-‘জনগনের হাতে? নাকি আদালতের হাতে? নাকি সরকারের হাতে?
মহিউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, জনগণ ভোট দিয়ে দল আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখান করে অস্তাচলে পাঠাতে পারতো। আদালতও অভিযুক্ত করে দলটিকে নিষিদ্ধ করতে পারতো। ইতোমধ্যে দলটির কার্যক্রম তো বিচার কাজ শেষ না হওয়া অবধি নিষিদ্ধই ছিল বলে জানি।
রাজনৈতিক দলগুলোর নানান চড়ায় উৎরাই দেখা ও পর্যবেক্ষণকারী এই গবেষক-লেখক বলছেন, ভোটের মাধ্যমে জনগণ আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করবে সেই সুযোগ না দিয়েই সরকার তার নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করলো।
সিনিয়র আইনজীবী শাহ্দীন মালিক আরেক প্রসঙ্গে বলেছেন, মানুষ হিসেবে যে কেউ ভুল করতে পারে। মানুষ অপরাধ করলে তার বিচার হবে, সেটাই যৌক্তিক। সেদিক থেকে তো বলা যায়, ২০২৪-এ জুলাই অভ্যূত্থান ঘিরে সহিসংতার ঘটনায় বহুপাক্ষিক ব্যক্তি-গোষ্ঠির দায় ও সংশ্লিষ্টতা আছে। তারপরও ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী বিচারের আওতায় এসেছে। অনেক সিনিয়র মন্ত্রী, বহু রাজনৈতিক নেতা-সমর্থক কারাগারে।
শাহ্দীন মালিক মনে করেন, অপরাধ করলে মানুষের বিচার হবে, তবে কোনো রাজনৈতিক দল তো অপরাধী হতে পারে না। মানেটা হলো ব্যক্তির একক অপরাধের দায় কোনো প্রতিষ্ঠানের হতে পারে না। তবে কোনো দলের জন্মই যদি হয় সহিংসতা ও সন্ত্রাসের উদ্দেশ্যে, কিংবা দলটির নীতি-কাঠামোতেই থাকে টেররিজম, তাহলে ভিন্ন বিষয়। এখানে বিষয়টি তো সেটা নয়।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার প্রভাব কী হতে পারে সেই প্রসঙ্গে শাহ্দীন মালিক অবশ্য বলছেন ‘বিএনপির এমন পদক্ষেপ ভবিষ্যতে একই কায়দায় দল বা দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের ক্ষেত্রই প্রস্তুত করল’।
লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ অবশ্য বলেছেন, ১৯৭১ পূর্ববর্তী এবং বর্তমান পরিস্থিতি এক না। কেননা ১৯৭১ এ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব জোরালো ছিল। একাত্তরের সেই সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব লুকিয়ে-পালিয়ে থেকেও স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের গঠনে দেশের বাইরে সরকার গঠন ও জনমত তৈরীসহ নানানভাবে সক্রিয় থেকেছে। আর বর্তমানের আওয়ামী লীগের একাবারে নেতৃত্বশূন্য। বরং লুকিয়ে পালিয়ে আছে। আওয়ামী লীগের কোনো নেতৃত্বের উপস্থিতি দৃম্যশান না।
ইতিহাসের পানে তাকালে দেখা যায়, সেই ষাটের দশকে বৃটিশ উপনিবেশ থেকে ১৯৫৭ সালে আফ্রিকার দেশ ‘ঘানা’ স্বাধীনতা পেয়েছিল। উপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে স্বাধীন হতে আফ্রিকার জাতীয়তাবাদী নেতা ডক্টর কাওয়াম নকরোমো গঠন করেছিলেন ‘কনভেনশন পিপলস পার্টি’ নামের একটি রাজনৈতিক দল। সেই দলটি ‘ঘানার’ স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা রাখায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তবে দেশটির স্বাধীনতায় ভুমিকা রাখা এই ‘কনভেনশন পিপলস পাটি’কে কয়েক বছর পরেই নিষিদ্ধ করা হয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে জন্মের সাথে জড়িত কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার প্রায় ৬ দশক পর ৮ এপ্রিল ২০২৬- আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত দেখলো বিশ্ববাসী।

