সম্প্রতি একটি রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা নাকি ৪০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। সেটা হোক বা না হোক, দেশ যে জনসংখ্যার ভারে নুয়ে পড়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পৃথিবীর উন্নত দেশের মানুষরা যখন বিজ্ঞানের অগ্রগতির পতাকা নিয়ে বিজয়বার্তা ঘোষণার জন্য মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার ভাবনায় মগ্ন, তখন বাংলাদেশের হাজারো শিশু ছিন্ন কাপড়ের ঝুপড়িতে অবস্থান করে আর্তচিৎকার করছে আহারের জন্য। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, নিম্ন মাথাপিছু আয়, খাদ্যঘাটতি, বেকার সমস্যা আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। আর এর মূলে রয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি। এ সমস্যা দূরীকরণে পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্ব অত্যধিক।
এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৬৫৩ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি। ১৮৬০ সালে ২ কোটিতে বৃদ্ধি পায়। ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে যে সংখ্যায় দাঁড়িয়েছে, তা আমরা সবাই অবগত আছি। এ বর্ধিত লোকসংখ্যা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং যাতায়াতের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে অবিরত। কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবারের লোকসংখ্যা নিয়ন্ত্রিত করে জনকল্যাণ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রগতিই পরিবার-পরিকল্পনার আসল লক্ষ্য। আর্থিক আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে যদি পরিবারের আয়তন নির্ধারণ করা যায়, তাহলে প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা তেমন কষ্টকর কিছু নয়।

সুন্দর ভবিষ্যৎ সকলের কাম্য। কিন্তু আমরা কয়জনেই-বা এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারছি। যারা এ কর্তব্য মেনে চলছেন, তাদের বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে তেমন বেগ পেতে হচ্ছে না। বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ এ ব্যাপারে বেশ সক্রিয়। বিশেষ করে, মাঠকর্মীরা নানাভাবে ঝুঁকিতে রয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অশিক্ষিত ও পল্লী অঞ্চলে যারা কাজ করছেন, তারা কিন্তু সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ শ্রমের সুফল পেতে হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে তৎপর হতে হবে। তা না হলে এ বিভাগের সুফল পেতে আমরা আরো পিছিয়ে পড়ব বলে সচেতনরা মতামত ব্যক্ত করেছেন। এ কথা যেমন অমূলক নয়, তেমনি আসুন আমরা সবাই সার্বিক সহযোগিতা করি।
অপ্রিয় সত্যি কথা হলো-জন্মনিয়ন্ত্রণ গ্রহণে এখনো অনেকে ধর্মবিরোধী পাপ কাজ বলে মনে করে। তবে নারী (মাঠ) কর্মীরা নাছোড়বান্দা। তারা ভোর-টু-ডোর যাচ্ছেন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করার সুযোগ-সুবিধা বোঝানোর জন্যে। মাঠকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী-এমনও নারী আছেন, তাদের বাড়ির সামনে পর্যন্ত যেতে পারি না আমরা। আবার বিপরীতধর্মী কিছু পুরুষও আছেন, তাদের পত্নীরা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে আগ্রহী হলে তাদের স্বামীরা বাধা দেন। এ অবস্থ্য পল্লী অঞ্চলে বেশি।
আশার কথা হলো, নারী কর্মীরা এত কিছুর পরও থেমে থাকছেন না। পুরুষদের অনেকের মানসিকতাকে তারা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিচ্ছেন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা অবিশ্বাস্য সাফল্যও পাচ্ছেন। পল্লী অঞ্চলের অধিকাংশ নারী পর্দানশীন। পরিবার পরিকল্পনা সহকারীর সঙ্গে তারা পরামর্শ করতে লজ্জাবোধ করেন। এমনও অনেক নারী আছেন, যারা এসব কাজে নিয়োজিত নারীকে দেখামাত্র ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে অন্যত্র সরে পড়েন। তবে সুখের বিষয় হলো, এ কুসংস্কার এখন অনেকটা হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশের শহর কি গ্রামাঞ্চলের এমন কতকগুলো লোক আছেন, যারা এখনো অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছেন। তারা মনে করছেন, সন্তান যখন জন্ম হয়, সঙ্গে সঙ্গে তার আহারও সৃষ্টিকর্তা নির্দিষ্ট করে দেন। এতে কোনো অসুবিধা হবে না। এ ধরনের মনোভাবের কারণে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ দেশের নারীদের মধ্যে অনেকে সন্তানধারণকেই জীবনের একমাত্র কাজ বলে মনে করেন। অনেক সময় ইচ্ছার বিরুদ্ধে অশিক্ষিত পরাশ্রয়ী মেয়েরা সন্তান ধারণ করতে বাধ্য হন। এক্ষেত্রেও সুখবর হলো, আগের মনমানসিকতার আশানুরূপ পরিবর্তন হয়েছে। বেশির ভাগ নারী এক বা দুইয়ের অধিক সন্তান নিতে চাইছেন না, নিজের সুখের কথা ভেবে। তারা চান, যোগ্যতা অনুসারে চাকরি। আসলে কথা ঠিক, স্বামী-স্ত্রী চাকরি করলে সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা আসে। পরিকল্পনা মোতাবেক সংসারকে অবাধে এগিয়ে নিতে পারেন। একজন অসহায় অশিক্ষিত দরিদ্র মেয়ের প্রতি আমাদের সবার উচিত সহানুভূতিশীল হওয়া। এর জন্য চাই সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রয়াস। আমাদের দেশের অনেকে মনে করেন, গর্ভনিরোধ দ্রব্যাদির ব্যাপক প্রসারে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ শিথিল হয়ে পড়েছে। এতে করে সমাজে দেখা দিচ্ছে নানা অনাচার, বেড়ে যাচ্ছে আত্মগ্লানি, সমাজ হয়ে পড়ছে পঙ্গু। আবার এমন কিছু লোক আছেন, যারা জন্মনিরোধ ব্যবস্থাকে মনে করেন, যৌন প্রয়োজন মেটানোর আসল হাতিয়ার। এই অমূলক ধারণার কারণে সেসব লোক পরিবার পরিকল্পনাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন না।
বাংলাদেশ সরকার পরিবার কল্যাণ সহকারী ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীকে একীভূত করে যৌথভাবে জনসংখ্যা রোধকল্পে কার্যক্রম শুরু করেছে। এতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, জনসংখ্যারোধ কার্যক্রম দ্রুত সাফল্যের মুখ দেখবে। সাধারণ জনগণ বিশেষ করে কুলবধুরা আর পর্দার আড়ালে না থেকে যদি এ কাজে নিয়োজিত নারীদের পরামর্শ গ্রহণ করেন, তাহলে পরোক্ষভাবে তারাই হবেন আদর্শ গৃহিণী।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রোধ করতে হলে পুরোনো যত কুসংস্কার আছে, সেগুলোকে পরিশোধন করে সমাজব্যবস্থায় এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে কুচক্রীমহল বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম সফল বাস্তবায়নের দিকে অন্তরায় হয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক

