Sunday, 27 September 2026

[the_ad id='15178']

চট্টগ্রাম পরিকল্পিত উন্নয়নে নগর সরকার প্রয়োজন —চসিক মেয়র

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামকে একটি নান্দনিক, পরিচ্ছন্ন, সবুজ, স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও স্মার্ট নগর হিসেবে গড়ে তুলতে নগর সরকারের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

- Advertisement -

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ নগরের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় এনে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একটি পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য নগর সরকার প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।

- Advertisement -shukee

রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাস্টার প্ল্যান বিষয়ক সমন্বয় সভায় উপস্থাপিত ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান ২০২৫-২০৫০’ বিষয়ে আয়োজিত সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামকে নান্দনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি ‘গ্রিন, হেলদি, সেফ অ্যান্ড স্মার্ট সিটি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে মাস্টার প্ল্যানকে আরও সমৃদ্ধ, বাস্তবসম্মত ও জনসম্পৃক্ত করতে হবে। নগরের মানুষের প্রত্যাশা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন খালের উন্নয়ন ও সংস্কারের কাজ চলছে। এর পাশাপাশি আরও খালকে পরিকল্পনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নগরের জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসনে খাল, নালা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

মেয়র বলেন, নগরের পরিবেশ ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে ভবন নির্মাণের সময় নির্ধারিত খোলা জায়গা রাখার বিষয়টি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। ভবনের চারপাশের খোলা জায়গা যেন সম্পূর্ণভাবে সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে ফেলা না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। বর্ষার পানি মাটির নিচে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে খোলা জায়গায় গাছপালা ও ঘাস লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এতে নগরের সবুজায়ন যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি বৃষ্টির পানি দ্রুত মাটির নিচে প্রবেশের সুযোগ পাবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে।

তিনি আরও বলেন, নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে মাস্টার প্ল্যানে কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। সড়কের পাশে স্থাপিত ডাস্টবিনগুলো পরিবেশবান্ধব ও টেকসইভাবে নির্মাণ করা গেলে একদিকে যেমন ডাস্টবিন চুরি হওয়ার আশঙ্কা কমবে, অন্যদিকে বর্জ্য সংগ্রহের কাজও সহজ হবে। এমনভাবে ডাস্টবিনের নকশা করতে হবে যাতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সহজেই সেখান থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে পরিবহন করতে পারেন।

মেয়র বলেন, চট্টগ্রাম নগরের প্রশাসনিক সীমানা ও সেবার পরিধির মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। নগরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় যেমন সীতাকুণ্ডে বিভিন্ন রোগ ও জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিলেও সিটি কর্পোরেশনের সীমানাগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সেখানে সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। ফলে নগরবাসীর সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সিটি কর্পোরেশনের সেবার পরিধি ও প্রশাসনিক কাঠামোকে বাস্তবতার আলোকে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, নগরের যানজট, ফুটপাত দখল, অবৈধ স্থাপনা ও সড়ক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো একক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। সিটি কর্পোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হলেও পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার। তাই এসব কার্যক্রমে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নগর সরকারের ধারণা বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার সমন্বয় আরও কার্যকর হবে।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, আমরা এমন একটি নগর ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে যেতে চাই যেখানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অধীনে কাজ করবে। পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে হলে এই সমন্বিত ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে আরও নান্দনিক ও নাগরিকবান্ধব করতে সাইকেল ট্র্যাক, ওয়াকওয়ে, উন্মুক্ত স্থান, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সুযোগসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। নগরে এমন কিছু আধুনিক নাগরিক সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে যেখানে মানুষ হাঁটতে পারবে, বসতে পারবে, বই পড়তে পারবে এবং অবসর সময় কাটাতে পারবে। নগরের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নকেও এসব পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

মেয়র আরও বলেন, চট্টগ্রামের উন্নয়নে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে কোনো বিভাজন নেই। দুই প্রতিষ্ঠানকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। নগরের উন্নয়ন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি সম্মিলিত দায়িত্ব। জনগণের কাছে আমরা দায়বদ্ধ এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, মাস্টার প্ল্যান শুধু একটি নথি হিসেবে থাকলে হবে না; এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে চট্টগ্রামকে একটি নান্দনিক ও আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সভায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়নে সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাস্টার প্ল্যান বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়েছে এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও মতামত দেওয়া হয়েছে। এসব মতামত ও পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় নিয়ে আগামী দিনের চট্টগ্রামের জন্য একটি কার্যকর মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে যানজটমুক্ত, সবুজ ও নান্দনিক নগর হিসেবে গড়ে তুলতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে হবে। চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কর্ণফুলী গ্যাস, চট্টগ্রাম বন্দর, পুলিশ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনসহ সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হবে।

সভায় তিনি নাগরিকদের আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পরিকল্পিত নগর গড়তে হলে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। খাল, ড্রেন ও সড়কের জায়গা দখল করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ বা নগরের সৌন্দর্য নষ্ট করা যাবে না। অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্ট সংস্থার অভিযান অব্যাহত থাকবে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আরও বলেন, নগরের হাসপাতাল, শপিংমল, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পার্কিং ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়েও সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে চট্টগ্রামকে একটি পরিকল্পিত নগরে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

সভায় চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমানসহ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের মতামত প্রদান করেন৷

ক্যাপশন- ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান ২০২৫-২০৫০’ বিষয়ে আয়োজিত সভায় বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন৷

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও