বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি লাভ করেছে। তবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথ পরিক্রমা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিশীলতা আনয়নে দেশে কৃষিজ পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই বিবেচনায় দেশে আম রপ্তানি হতে পারে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। কারণ, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ বিবেচনায় ও অন্যতম জনপ্রিয় ফল হিসেবে আমের বাজার বিশ্বব্যাপী অনেক বেশি বিস্তৃত।
আম রপ্তানির এই সম্ভাবনাময় অগ্রযাত্রায় বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা নিয়ে কাজ করলে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশী আমের অবস্থান আরো উন্নত করা সম্ভব। এগুলি হলো: কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিশ্ব বাজার প্রবেশের অন্যতম বিষয় গ্লোবাল গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস বা গ্লোবাল গ্যাপ সার্টিফিকেশন না থাকা, আমের গুণগত মান বজায় ও প্রক্রিয়াজাতকরণে হট ওয়াটার ট্রিটমেন্টের মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকা, আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী যথাযথ ব্র্যান্ডিং না করা, সরকারি-বেসরকারি যথাযথ উদ্যোগের ঘাটতি, কৃষিজ পণ্য হিসেবে বৈচিত্র্যকরণকে বিশেষভাবে গুরুত্ব না দেওয়া ইত্যাদি।

বুধবার রাতে (১০ই ডিসেম্বর ) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘বাংলাদেশে আমের উৎপাদন, অগ্রগতি ও বিপণন: স্থানীয় বাগান থেকে বিশ্ব বাজার’ শীর্ষক প্রতিবেদনটির ফলাফল তুলে ধরতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এইচএসবিসি ব্যাংক এর ফিলানথ্রপিক সহযোগিতায় কৃষির টেকসই উন্নয়নভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (এসএএফ বাংলাদেশ) ও আন্তর্জাতিক বিজনেস কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসেল পার্টনার্স যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের আতওতাধীন কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) নাসির-উদ্-দৌলা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন এসএএফ বাংলাদেশ- এর নির্বাহী পরিচালক মো. ফরহাদ জামিল, এইচএসবিসি ব্যাংকের হেড অব সাসটেনিবিলিটি সৈয়দা আফজালুন্নসা ও এইচএসবিসি ব্যাংকের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) দেবেশ ডায়াল মাথুর। সমাপনী বক্তব্য রাখেন লাইটক্যাসেল পার্টনার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল আমিন।
এসএএফ বাংলাদেশ এর প্রোগ্রাম ডেভলপমেন্ট বিভাগের পরিচালক আব্দুর রউফ এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের প্যানেল-ভিত্তিক আলোচনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন এ আর মালিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউস সোপান মালিক, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান
কামাল, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক এম এ রহিম এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) নাসির-উদ্-দৌলা বলেন, “সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আমের রপ্তানি বাড়ানো আমাদের দায়িত্বের একটি অংশ। তাই আমরা উন্নত জাতের আম উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। এইক্ষেত্রে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
তিনি আরও বলেন, “এককভাবে কোনো সংস্থা একা সব কিছু করতে পারে না। এজন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও সামগ্রিক প্রচেষ্টা। মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, এয়ারলাইন, শিপিং লাইন এবং বেসরকারি খাতের সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে এটা করতে হবে। এতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে রপ্তানি পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।”
এইচএসবিসি ব্যাংকের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) দেবেশ ডায়াল মাথুর বলেন, “মাঠ পরিদর্শনের সময় আমি দেখেছি, কৃষকেরা এখন উদ্যোক্তায় রূপান্তরিত হচ্ছেন। এটা আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে।”
প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বে বার্ষিক প্রায় ২.৪ মিলিয়ন টন আমের চাহিদা রয়েছে। বিশ্বব্যাপী এই চাহিদার বিপরীতে বেশিরভাগই মেক্সিকো, থাইল্যান্ড ও ব্রাজিল যোগান দিয়ে থাকে। বিশ্ব বাজারে এই দেশগুলি নেতৃত্ব দিলেও বাংলাদেশে এই সম্ভাবনা যথেষ্ট। বাংলাদেশ বার্ষিক গড়ে ২০ লাখ টনেরও বেশি আম উৎপাদন করে। শুধু ২০২২ সালেই বাংলাদেশ ১.৫ মিলিয়ন টন আম উৎপাদন করেছে। উৎপাদন বিবেচনায় এটি বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম আম উৎপাদনকারী দেশ।
তবে গবেষণা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফলনের ব্যাপক সম্ভাবনা সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রকৃত উৎপাদনের ০.০৫ শতাংশেরও কম রপ্তানি করে। যা বাস্তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে না লাগানোর ইঙ্গিত বহন করে। উল্লিখিত এই চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবেলা করলে বাংলাদেশ আম রপ্তানিতে অল্প সময়ের মধ্যে শীর্ষে উঠে আসতে পারে। পোশাক শিল্পের পাশাপাশি এটি হতে পারে বাণিজ্যের প্রসার ও রফতানি আয় বাড়ানোর বিশেষ পণ্য। যা ২০২৬ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথ পরিক্রমাকে আরও সুগম করবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াল্ড পপুলেশন রিভিউ (World Population Review) প্রকাশিত ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারত এককভাবে ২৬.৩ মিলিয়ন টন আম উৎপাদন করে। এরপরই দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ইন্দোনেশিয়া (৪.১ মিলিযন টন) ও চীন (৩.৮ মিলিয়ন টন)।
২০২৫ অর্থবছরে মে মাসের মধ্যে বাংলাদেশের আম রপ্তানি ২৮৪,১৩৫ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী বছরগুলিকে ছাড়িয়ে গেছে। ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যর বাইরে বাংলাদেশের আম চীন সহ আর কিছু দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে উদীয়মান সম্ভাবনা রাখে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আমের বিভিন্ন জাত বা ভ্যারাইটির মধ্যে রয়েছে আলফানসো, কেইসার, নাম ডাক মাই, কেট, কেন্ট, পালমার, টমি আটকিনস। বিশ্বে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা এই দুটি হচ্ছে আমের মূল রপ্তানি বাজার। আমের বিভিন্ন জাত বা ভ্যারাইটিকে গুরুত্ব দিয়ে উৎপাদন বাড়ালে বাংলাদেশ আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে শীঘ্রই আমের বাজার সম্প্রসারণ করতে পারবে।

