বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উদ্যাপনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ হয়ে এলেও এখনও অনেক মন্দির ও পূজামণ্ডপে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা জোরদার হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে—তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, সিসিটিভি ক্যামেরা ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা এখনও শুরু না হওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি জোরদার করা হয়নি। পূজা শুরু হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে শঙ্কা কেটে যাবে।
মহালয়ার মাধ্যমে রবিবার থেকে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠী তিথিতে মূল পূজা শুরু হয়ে ২ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে শেষ হবে। এ বছর সারা দেশে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে রয়েছে ২৫৮টি পূজামণ্ডপ।

এবারের দুর্গাপূজা ঘিরে বড় ধরনের কোনও আশঙ্কা না থাকলেও কিছু কিছু জায়গায় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে পূজা উদ্যাপন কমিটির।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি শ্রী বাসুদেব ধর বলেন, ‘এখনও পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়নি। এখন অনেক মন্দিরে প্রতিমা গড়ার কাজ চলছে। ফলে এখনও পরিপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদ্যাপনের জন্য সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে। যদিও এর মধ্যে কিছু কিছু জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে আমরা কিছুটা শঙ্কিত।’ তবে এবারের দুর্গাপূজাকে ঘিরে বড় ধরনের কোনও আশঙ্কা নেই বলেও জানান তিনি।
বাসুদেব ধর আরও বলেন, ‘আমরা প্রতিটা পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। পাশাপাশি পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরাও সার্বিক নিরাপত্তা দিচ্ছেন। আশা করি এভাবের পূজা শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে।’
রাজধানীর রমনা কালী মন্দির ও ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ঘিরে দেখা গেছে, এখনও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়নি। নেই পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রবেশপথে আর্চওয়ে গেট মেটাল ডিটেকটর থাকলেও সেটি অকার্যকর। অন্যদিকে, প্রবেশ গেটে নেই কোনও চেকপোস্ট বা হ্যান্ডহোল্ড মেটাল ডিটেকটরের ব্যবস্থা।
গতকাল বিকালে রমনা কালী মন্দিরে গেটের বাইরে কিছু পুলিশ দেখা গেলেও সন্ধ্যায় তারা ফিরে যান। মন্দিরের প্রবেশ পথে দুটি আর্চওয়ে গেট মেটাল ডিটেকটর থাকলেও সেটি বন্ধ দেখা গেছে। দেখা মেলেনি কোনও নিরাপত্তারক্ষীর। এ মন্দিরে আসা সনাতন ধর্মাবলম্বী ও সাধারণ দর্শনার্থীরাও নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
জানতে চাইলে রোববার সন্ধ্যায় রমনা কালী মন্দির পূজা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক মিন্টু বসু বলেন, ‘আমাদের এখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মীও রয়েছে। সকাল থেকে পুলিশ সদস্যরা ছিলেন। হয়তো এখন কোনও কাজে তারা চলে গেছেন। নিরাপত্তা নিয়ে আমরা কোনও শঙ্কা দেখছি না।’
তবে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রথম গেটের ভেতরে পুলিশ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে পুলিশ সদস্যরাও রয়েছেন। এছাড়াও র্যাব-১০ ব্যাটালিয়নের একটি গাড়িরও দেখা মিলেছে। তবে মূল পূজামণ্ডপে প্রবেশ গেটে একটি আর্চওয়ে মেটাল ডিটেকটর থাকলেও চেকিং ছাড়াই দর্শনার্থীদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা গেছে।
এ বিষয়ে অজিত দাস নামে এক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ‘এখনও পূজার মূল কার্যক্রম শুরু হয়নি। তাই এখন কাউকে চেক করা হচ্ছে না।’
ঢাকা মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি শ্রী জয়ন্ত কুমার দেব বলেন, ‘এখনও পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়নি। তবে ঢাকেশ্বরীসহ ঢাকার সব মন্দিরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে আমাদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক ও নিরাপত্তাকর্মী রয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ, র্যাব, আনসার ও সেনাবাহিনীর সদস্যরাও আমাদের নিরাপত্তা দিচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ঢাকায় একটি মন্দির ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছেন। সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। আশা করি শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদ্যাপন করা যাবে।’
এদিকে প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ সার্বক্ষণিক আনসার ও পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তা দিচ্ছেন জানিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, ‘ঢাকা মহানগর এলাকায় প্রত্যেকটি মন্দির সিসিটিভি ক্যামেরায় আওতায় আনা হয়েছে। মন্দিরগুলোতে আনসার ও পুলিশের সদস্যদের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। যেকোনও ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ পুলিশ সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছেন।’
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের বক্তব্য জানতে এআইজি (মিডিয়া ও পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
এদিকে এবারের দুর্গাপূজায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক থাকবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
গতকাল রবিবার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বৈঠক শেষে তিনি বলেছেন, ‘নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের অধীনে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে পূজায় ৮০ হাজার ভলানটিয়ার থাকবে। পাশাপাশি র্যাব, পুলিশ, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সঙ্গে জড়িত যারা আছেন, তারা মাঠে থাকবেন।”
দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হচ্ছে না, তা বলব না; তবে আমরা সতর্ক আছি এবং হামলাকারীরা ধরাও পড়ছে।’

