ফ্রান্সের জ্য ফন্টেইন থেকে শুরু, এরপর জার্মান গোলমেশিন গার্ড মুলার, ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও হয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসন দখল করেন জার্মান তারকা মিরোস্লাভ ক্লোসা। সেই দীর্ঘ যাত্রাপথে এবার নতুন অধ্যায় যোগ করলেন লিওনেল মেসি।
২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক করে ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তবে বিশ্বকাপে ১৪ গোলের মালিক কিলিয়ান এমবাপ্পেও খুব বেশি দূরে নেই। ফলে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট ঘিরে জমে উঠেছে নতুন লড়াই।

১৯৫৮ বিশ্বকাপের কথা উঠলেই প্রথমে আসে জ্য ফন্টেইনের নাম। সুইডেনে অনুষ্ঠিত সেই আসরে ফরাসি ফরোয়ার্ড একাই করেছিলেন ১৩ গোল—যা আজও একক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড হিসেবে অটুট রয়েছে।
অবাক করার বিষয় হলো, সেটিই ছিল ফন্টেইনের প্রথম ও শেষ বিশ্বকাপ। ফলে বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা আর বাড়েনি। তবুও ৬৮ বছর পরও এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি তার দখলেই রয়েছে। তবে বিশ্বকাপে সর্বমোট গোলের রেকর্ড তার কাছে ছিল মাত্র ১৬ বছর।
ফন্টেইনের সেই বিশ্বকাপেই বিশ্ব ফুটবল দেখেছিল ১৭ বছর বয়সী এক বিস্ময় বালকের উত্থান। সাম্বা ফুটবলের সৌন্দর্য আর অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে ব্রাজিলের জার্সিতে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন পেলে।
১৯৫৮, ১৯৬২ এবং ১৯৭০—এই তিন বিশ্বকাপে খেলে পেলে করেছেন ১২ গোল। তিনটি বিশ্বকাপ জয় করলেও বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটি নিজের করে নিতে পারেননি ফুটবলের এই মহাতারকা।
ফন্টেইনের রেকর্ড ভাঙেন জার্মানির গার্ড মুলার। ১৯৭০ বিশ্বকাপে ১০ গোল এবং ১৯৭৪ বিশ্বকাপে ৪ গোল করে মোট ১৪ গোলের মালিক হন তিনি।
দুই বিশ্বকাপে ১৪ গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেন মুলার। তার এই রেকর্ড টিকে ছিল দীর্ঘ ৩২ বছর।
২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে পঞ্চম শিরোপা জেতানোর অন্যতম নায়ক ছিলেন রোনালদো নাজারিও। এরপর ২০০৬ বিশ্বকাপে এসে তিনি গার্ড মুলারের রেকর্ড ভেঙে দেন।
তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে মোট ১৫ গোল করেন ‘ও ফেনোমেনো’ খ্যাত এই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসন তখন তার দখলে।
রোনালদোর রেকর্ড ভাঙতে বেশি সময় নেননি মিরোস্লাভ ক্লোসা। ২০০২ থেকে ২০১৪—চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি করেন ১৬ গোল।
বিশেষ করে ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির চতুর্থ শিরোপা জয়ের পথে ক্লোসা নিজের ১৬তম গোলটি করে রোনালদোর ১৫ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে যান। সেই থেকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে শীর্ষে রয়েছেন তিনি।
ক্লোসার সেই রেকর্ড এক যুগ ধরে অক্ষুণ্ন ছিল। অবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করে ১৬ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন লিওনেল মেসি।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই এই কীর্তি গড়ে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপকে স্মরণীয় করে তুলেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
২০০৬ সালের ১৬ জুন সার্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপে প্রথম গোল করেছিলেন মেসি। ঠিক ২০ বছর পর, নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপের ২৭তম ম্যাচে এসে করলেন ১৬তম গোল। একই সঙ্গে এটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে তার ২০০তম ম্যাচ এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১২০তম গোল।
মেসি চলতি আসরেই ক্লোসাকে ছাড়িয়ে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে তার সামনে রয়েছে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ—কিলিয়ান এমবাপ্পে।
মাত্র কয়েকটি বিশ্বকাপ খেলেই ১৪ গোল করে ফেলেছেন ফরাসি সুপারস্টার। বয়স, গতি এবং ধারাবাহিকতা বিবেচনায় ভবিষ্যতে রেকর্ডটি নিজের করে নেওয়ার অন্যতম দাবিদার তিনি।
তাই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে এখন নতুন উত্তেজনা। ক্লোসার পাশে উঠে এসেছেন মেসি, আর দূরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন এমবাপ্পে। শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের শীর্ষস্থান কার দখলে থাকবে, সেটিই এখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্নগুলোর একটি।

