ইপসা-ইয়ুথ শেয়ার নেট (Youth Share Net) প্রকল্পের আওতায় Youth Voice for Change-এর আয়োজনে, ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল এ্যাকশন (ইপসা)-এর বাস্তবায়নে, RedOrange-এর হোস্টিংয়ে এবং Amplify Change-এর সহায়তায় সোমবার (১৫ জুন ) চট্টগ্রামের বাকলিয়া কল্পলোক আবাসিক এলাকায় চট্টগ্রাম মেধা বিকাশ স্কুল বাকলিয়া চট্টগ্রামে “Building Period-Friendly Schools for Health and Empowered Adolescents” শীর্ষক একটি সচেতনতামূলক কর্মসূচি সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাসিক ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান বৃদ্ধি করা, প্রচলিত ভুল ধারণা ও কুসংস্কার দূর করা এবং একটি পিরিয়ড-ফ্রেন্ডলি বিদ্যালয় পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলী ফারুকী, সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহান, অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ এবং বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত এবং জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে। এরপর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলী ফারুকী তাঁর বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের সচেতনতমূলক কর্মসূচি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই উপকারী। তিনি উল্লেখ করেন যে, অতীতে তিনি নিজেও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাই এ ধরনের উদ্যোগের গুরুত্ব তিনি ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন। তাঁর মতে, মাসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সঠিক জ্ঞান শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তুলবে এবং তাদের সুস্থ ও নিরাপদ জীবনযাপনে সহায়তা করবে। তিনি শিক্ষার্থীদের পুরো সেশন মনোযোগ সহকারে অনুসরণ করার আহ্বান জানান, যাতে তারা বিষয়টি সম্পর্কে যথাযথ ধারণা অর্জন করতে পারে এবং নিজেদের জীবনে তা প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়।
পরবর্তীতে সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহান তাঁর বক্তব্যে বলেন যে, মাসিক একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া এবং এটি কোনোভাবেই লজ্জার বিষয় নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মাসিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন, কারণ নীরবতা ও সংকোচ অনেক সময় ভুল ধারণা ও কুসংস্কারকে টিকিয়ে রাখে। তিনি শিক্ষার্থীদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে অনুষ্ঠানের মূল সেশন শুরু হয়। YPSA-এর প্রতিনিধি সুহী ইসলাম “Menstrual Hygiene Education” বিষয়ক একটি উপস্থাপনা প্রদান করেন। উপস্থাপনাটির মূল প্রতিপাদ্য ছিল— “শিক্ষিত হই, ক্ষমতায়িত হই, এগিয়ে যাই—মর্যাদাপূর্ণ মাসিক পরিচর্যা নিশ্চিত করি।” উপস্থাপনায় মাসিক কী, কেন হয় এবং এটি নারীর জীবনে কেন একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া, তা সহজ ও বোধগম্য ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়। একই সঙ্গে সমাজে মাসিককে ঘিরে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণা, কুসংস্কার এবং বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সেশনে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের গুরুত্ব, সঠিকভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার ও পরিবর্তনের নিয়ম, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার উপায় এবং মাসিক চলাকালীন শরীরের যত্ন নেয়ার বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। শিক্ষার্থীদের জানানো হয় যে, মাসিকের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখলে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এছাড়াও মাসিক চলাকালীন পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের গুরুত্ব, পর্যাপ্ত পানি পান, বিশ্রাম এবং শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার বিষয়েও আলোচনা করা হয়। কোনো কোনো পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন এবং কীভাবে মাসিককে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে একটি ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়েও শিক্ষার্থীদের সচেতন করা হয়।
উপস্থাপনা শেষে একটি উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বের আয়োজন করা হয়। শিক্ষার্থীদের অনেকেই সরাসরি প্রশ্ন করতে সংকোচবোধ করতে পারে বিবেচনায় তাদেরকে বিশেষ কার্ডে নিজেদের প্রশ্ন লিখে জমা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। শিক্ষার্থীরা মাসিক সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন, উদ্বেগ এবং অভিজ্ঞতা কার্ডে লিখে জমা দেয়। পরবর্তীতে উপস্থাপক সেসব প্রশ্নের উত্তর বিস্তারিতভাবে প্রদান করেন। এই পর্বটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান বিভ্রান্তি দূর করতে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রশ্নোত্তর পর্বের পর একটি আর্ট প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। শিক্ষার্থীদের বলা হয়, তারা তাদের বিদ্যালয়ের বর্তমান ওয়াশরুম সুবিধা সম্পর্কে কী ভাবছে এবং ভবিষ্যতে তারা কেমন ওয়াশরুম সুবিধা প্রত্যাশা করে, তা ছবি ও লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করতে। শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে এই কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে এবং তাদের বিভিন্ন চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা সৃজনশীলভাবে উপস্থাপন করে। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের স্যানিটেশন ও ওয়াশরুম ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। বিচারকদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে দশম শ্রেণির সানজিদা আরিফ আলফি প্রথম স্থান, অষ্টম শ্রেণির সাদিয়া খাতুন দ্বিতীয় স্থান এবং অষ্টম শ্রেণির সাদিয়া সুলতানা তৃতীয় স্থান অর্জন করে। তাদের সৃজনশীল উপস্থাপনা বিদ্যালয়ের ওয়াশরুম সুবিধা উন্নয়ন ও শিক্ষার্থী-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
এরপর উপস্থাপনার বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে একটি কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। কুইজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সেশনে শেখা বিষয়গুলো পুনরায় স্মরণ ও মূল্যায়নের সুযোগ পায়। তারা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে এবং অর্জিত জ্ঞান প্রদর্শন করে।
পরবর্তীতে আর্ট প্রতিযোগিতা এবং কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সকল শিক্ষার্থীর মধ্যে অংশগ্রহণ সনদপত্র প্রদান করা হয়। এই স্বীকৃতি শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রমে আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে অনুপ্রাণিত করে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে একটি স্যানিটারি ন্যাপকিন বক্স হস্তান্তর করা। এই বক্সটি বিদ্যালয়ে স্থাপন করা হবে, যাতে প্রয়োজনে শিক্ষার্থীরা সহজেই স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে পারে। এর মাধ্যমে বিদ্যালয়কে আরও পিরিয়ড-ফ্রেন্ডলি এবং শিক্ষার্থী-বান্ধব করে তোলার একটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে আর্ট প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন মতামত ও সুপারিশ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে তুলে ধরা হয়, যাতে ভবিষ্যতে বিদ্যালয়ের ওয়াশরুম সুবিধা আরও উন্নত এবং শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী গড়ে তোলা যায়।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে প্রধান শিক্ষক মো. আলী ফারুকী পুনরায় বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি এ ধরনের সচেতনতামূলক উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন যে, ভবিষ্যতেও এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে এবং তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা আরও বৃদ্ধি পাবে। তিনি Youth Voice for Change এবং YPSA-কে এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আজকের সেশনে যে বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়েছে সেগুলো যেন তারা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করে এবং কোনো সমস্যা বা প্রয়োজন দেখা দিলে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করে।
সামগ্রিকভাবে, “Building Period-Friendly Schools for Health and Empowered Adolescents” কর্মসূচিটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, ভুল ধারণা দূরীকরণ এবং একটি নিরাপদ, সম্মানজনক ও পিরিয়ড-ফ্রেন্ডলি বিদ্যালয় পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সচেতনতামূলক আলোচনা, প্রশ্নোত্তর পর্ব, সৃজনশীল প্রতিযোগিতা, কুইজ এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন বক্স স্থাপনের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু জ্ঞান অর্জনই করেনি, বরং নিজেদের মতামত প্রকাশ এবং একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশ হওয়ার সুযোগও পেয়েছে। এই কর্মসূচি ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস ও ক্ষমতায়নের পথে একটি কার্যকর অবদান রাখবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।

