সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

[the_ad id='15178']

আমীন আল রশীদ

ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার মতো নিয়ম আরও বেশি আতঙ্ক তৈরি করবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্যাংকে ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গত ১১ জুন তিনি জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে বাজেট পেশ করেন, সেখানে এই প্রস্তাব দিয়েছেন।

- Advertisement -

এতদিন জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি দিয়ে ব্যাংকে ব্যক্তি হিসাব এবং ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে ব্যবসায়িক হিসাব খোলা যেত। কিন্তু এখন দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সব ধরনের ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন দেয়া বাধ্যতামূলক করার মানে হলো, এটি ব্যাংকিং খাতে নাগরিকদের হয়রানি করার আরেকটি দরজা খুলে দেবে।

- Advertisement -shukee

নানা ঘটনায় ব্যাংকের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে মানুষের হাতে টাকা রাখার প্রবণতা বেড়েছে। তার ওপর সাধারণ ব্যাংক হিসাব খুলতেও টিআইএন বাধ্যতামূলক করার অর্থ হলো, মানুষ আরও বেশি ব্যাংকবিমুখ হবে। তাতে ব্যাংকেরই আমানত কমবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী প্রস্তাব করেন, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ছাড়া এখন থেকে যে কারও অ্যাকাউন্ট খোলার সময় টিআইএন সনদ দাখিল করতে হবে। স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট ও নো-ফ্রিলস তথা কম টাকায় খোলা কৃষক, মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতাভোগী এবং পর্ষদের অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তিরা ছাড়া অন্যদের জন্য তিনি টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করেন। সেই সঙ্গে তিনি ব্যবসায়িক হিসাব খুলতে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) থাকাও বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করেন।

রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে সব পর্যায়ের ব্যাংক লেনদেন নজরদারির আওতায় আনা জরুরি—এটা যেমন ঠিক, তেমনি সাধারণ ব্যাংক হিসাব খুলতেও টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে প্রথমত ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ কমবে, অন্যদিকে জনমনে করভীতি আরও বাড়বে। কেননা টিআইএন থাকলে তাকে প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয়। তাতে তার করযোগ্য আয় থাকুক বা না থাকুক।

বাস্তবতা হলো, শুধু ব্যবসায়ী কিংবা বড় অঙ্কের আমানতকারীরাই ব্যাংকে হিসাব খোলেন না; বরং স্বল্প আয়ের মানুষকেও ক্ষুদ্র সঞ্চয় বা বিনিয়োগের জন্য, যেমন মাসে পাঁচশ বা এক হাজার টাকা জমা রাখার উদ্দেশ্যেও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। এসব ক্ষেত্রেও টিআইএন বাধ্যতামূলক করার অর্থই হলো, সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে।

এমনিতেই বাংলাদেশের জটিল, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং গণবিরোধী করব্যবস্থার কারণে মানুষ কর দিতে উৎসাহ বোধ করে না। বৈধ উপায়ে উপার্জনকারী মধ্যবিত্তরাও করব্যবস্থার জটিলতার কারণে বার্ষিক আয়কর রিটার্ন জমা দিতে নিরুৎসাহিত বোধ করে। অথচ এই মানুষেরাই সরকারি-বেসরকারি নানা সেবা পেতে গিয়ে নানারকম ফি কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই পরিশোধ করে। অনলাইনে জমা দেয়। সুতরাং করমুক্ত আয়ের সীমা অতিক্রম করলে স্বল্প বা মধ্যম আয়ের লোকেরা যাতে বিদ্যুৎ বিল দেয়ার মতো ঘরে বসেই অনলাইনে নিজের বার্ষিক আয়কর দিতে পারে, আইনজীবীর কাছে যেতে না হয়—এখনো সেই ব্যবস্থাই পুরোপুরি চালু করা যায়নি।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকের জীবন সহজ করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিটি সেবা সে যাতে কোনো ধরনের হয়রানি, ঘুস ও সময়ক্ষেপণ ছাড়া পেতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা। কিন্তু তার বিপরীতে গিয়ে যদি সাধারণ নাগরিক সেবা পেতেও করের জটিল জালে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য বোঝা তৈরি করবে।

সরকার বলছে, অনলাইনে জমা দেয়া যাবে। কিন্তু পুরো পদ্ধতিটাই এত জটিল যে আইনজীবীর সহায়তা ছাড়া শিক্ষিত লোকের পক্ষেও নির্ঝঞ্ঝাটে আয়কর রিটার্ন জমা দেয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে রাখা হয়েছে, যাতে নাগরিকরা আইনজীবীর কাছে যেতে বাধ্য হয় এবং ফি দিয়ে আয়কর রিটার্ন জমা দেয়।

তুলনামূলক বেশি বা উচ্চহারে যাদের কর দিতে হয়, তাদেরও সশরীরে কর অফিসে হাজির হতে হয়। ঘুস দিয়ে কর কমাতে হয়। যাদের উচ্চহারে কর আসে, তারা মোটা অঙ্কের কর ফাঁকি দেয়। কর অফিসের লোকদের পকেট ভারী হয়। সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। সব মিলিয়ে একটি বিশাল দুষ্টচক্র পুরো রাজস্ব ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

সুতরাং এসব পদ্ধতিগত পরিবর্তন তথা রাষ্ট্রীয় সেবাসমূহ হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত না করে সাধারণ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতেও টিআইএন বাধ্যতামূলক করার মতো নিয়ম আরও বেশি আতঙ্ক তৈরি করবে। করব্যবস্থার প্রতি মানুষের ভীতি বাড়াবে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে মানুষ নিরুৎসাহিত হবে। ব্যাংকে টাকা জমা রাখার বদলে নগদ অর্থ সংরক্ষণের প্রবণতা বাড়বে। তাতে ব্যক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে। ছোট ছোট আমানতের মধ্য দিয়ে মানুষ যে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করত, সেখানে বড় ধরনের ধাক্কা আসবে। এর মধ্য দিয়ে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অথচ বিএনপি শুরু থেকেই সাধারণ মানুষের কল্যাণ হয়, এমন নীতি নিয়ে এগোচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সাহসী পদক্ষেপগুলোর মধ্য দিয়ে এই সরকার যেমন প্রশংসিত হচ্ছে, তেমনি সমালোচিত হবে যদি ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিধানটি সত্যিই চালু করা হয়। বাংলাদেশের জনগণ এবং দেশের অর্থনীতি এখনো সেই অবস্থায় পৌঁছায়নি।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকের জীবন সহজ করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিটি সেবা সে যাতে কোনো ধরনের হয়রানি, ঘুস ও সময়ক্ষেপণ ছাড়া পেতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা। কিন্তু তার বিপরীতে গিয়ে যদি সাধারণ নাগরিক সেবা পেতেও করের জটিল জালে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য বোঝা তৈরি করবে।

বরং করব্যবস্থা সহজ এবং দুর্নীতিমুক্ত করে করযোগ্য আয়ের প্রতিটি মানুষকে করের আওতায় নিয়ে আসা জরুরি। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে এখনো যে সমান্যসংখ্যক মানুষ কর দেয়, সেটি খুবই বিস্ময়কর। সুতরাং যাদের আয়ের সীমা করযোগ্য আয়ের মাত্রা অতিক্রম করেছে, তাদের প্রত্যেককে কত সহজে এবং হয়রানিমুক্ত উপায়ে কর প্রদানে বাধ্য করা যায়, সেই উপায় বের করা জরুরি।

এমন একটি ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে মানুষ ঘরে বসেই সহজে, স্বেচ্ছায় ও আনন্দের সঙ্গে কর দিতে পারে এবং একজন করদাতা নাগরিক হিসেবে গর্ব অনুভব করতে পারে। কিন্তু কর যদি আতঙ্কের বিষয় হয়ে ওঠে, তাহলে মানুষ নানা উপায়ে কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করবে। করব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত লোকদের পকেট ভারী হবে, কিন্তু সরকারের রাজস্বভান্ডার দুর্বলই থাকবে।

পরিশেষে, ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক না করে করব্যবস্থা আধুনিক, সহজ, হয়রানিমুক্ত এবং জনবান্ধব কীভাবে করা যায়, সরকারকে সেই পথ খুঁজতে হবে। অন্যথায় জনকল্যাণের স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি এবং এই সরকারের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মানুষের আস্থায় চিড় ধরবে।

লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও