শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

[the_ad id='15178']

বাংলাদেশের যুব সমাজ: চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও উত্তরণের পথ

আতাউল হাকিম আরিফ

বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার বর্তমান পর্যায়ে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো যুবসমাজ। কারণ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং টেকসই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং দক্ষ, সচেতন ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ। আর বাংলাদেশের মানবসম্পদের সবচেয়ে বড় অংশই যুবসমাজ।

- Advertisement -

বর্তমানে বাংলাদেশ এমন এক জনমিতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, যা দেশের জন্য এক বিরল সুযোগ সৃষ্টি করেছে। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সের-যা অর্থনৈতিক ভাষায় “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” বা জনমিতিক সুবিধা নামে পরিচিত। ইতিহাস বলে, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো এই জনমিতিক সুবিধাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতির অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সামনেও সেই সুযোগ রয়েছে। তবে এই সুযোগের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে এটি আশীর্বাদের পরিবর্তে বোঝায় পরিণত হতে পারে।

- Advertisement -shukee

বাংলাদেশের ইতিহাসে যুবসমাজ সবসময় পরিবর্তনের অগ্রনায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশগত ও মানবিক উদ্যোগ সব ক্ষেত্রেই তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জাতিকে এগিয়ে নিয়েছে। ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে যুবকরাই সাহস, উদ্যম ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছে।

বর্তমান বিশ্ব চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স, অটোমেশন, ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল অর্থনীতি বিশ্বব্যবস্থাকে দ্রুত পরিবর্তন করছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের তরুণরাও নিজেদের নতুনভাবে প্রস্তুত করার চেষ্টা করছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের তরুণদের সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স এবং স্টার্টআপ উদ্যোগে তাদের অংশগ্রহণ ক্রমাগত বাড়ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবিক সহায়তা এবং স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডে যুবসমাজের ইতিবাচক অবদান আশাবাদ জাগায়।

কিন্তু সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতার কঠিন চিত্রও রয়েছে। যুব বেকারত্ব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান অসামঞ্জস্য দক্ষতার ঘাটতি সৃষ্টি করছে। ফলে অনেক শিক্ষিত তরুণ চাকরি পাচ্ছেন না, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল খুঁজে পাচ্ছে না। এই বৈপরীত্য দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিস্তার। মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি, সহিংসতা, অনলাইন জুয়া, সাইবার অপরাধ এবং অসহিষ্ণুতার মতো সমস্যা সমাজের একটি অংশের তরুণদের বিপথগামী করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন তথ্যপ্রাপ্তি ও যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার ভুয়া তথ্য, বিদ্বেষ এবং সামাজিক বিভাজনের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা- বিশেষ করে হতাশা, উদ্বেগ, একাকীত্ব এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট- আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি নীরব সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এই বাস্তবতায় যুব নেতৃত্ব বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্ব কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনের বিষয় নয়; এটি সমাজ, শিক্ষা, ব্যবসা, প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের প্রতিটি ক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন দক্ষ যুব নেতা সমাজের সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন, সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারেন এবং অন্যদের সম্পৃক্ত করে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যুব সংগঠন এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নেতৃত্ব বিকাশের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

বর্তমান সময়ে উদ্যোক্তা উন্নয়নও যুব ক্ষমতায়নের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। চাকরির সীমিত সুযোগের বাস্তবতায় আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়। দেশের অসংখ্য তরুণ প্রযুক্তি, কৃষি, পর্যটন, সামাজিক ব্যবসা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্প এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছেন। তবে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, বাজারে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা, পরামর্শের অভাব এবং ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতার ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের যুব উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারী যুবদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে কখনোই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নেতৃত্ব এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে নারী যুবদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জাতীয় অগ্রগতির পূর্বশর্ত।

করণীয় ও নীতিগত সুপারিশ:

বাংলাদেশের যুবশক্তিকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক এবং কর্মমুখী করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুত হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং গ্রিন জবসের মতো ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তৃতীয়ত, যুব উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, স্টার্টআপ তহবিল, মেন্টরশিপ এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে যুব উন্নয়ন নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

পঞ্চমত, স্থানীয় সরকার, জাতীয় নীতিনির্ধারণ এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় যুবদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

ষষ্ঠত, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম, সামাজিক নেতৃত্ব এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ বিকাশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তার যুবসমাজ। তাদের শক্তি, মেধা, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে যথাযথভাবে বিকশিত করতে পারলে বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক উন্নয়নেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে। আজকের তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। তাই যুব উন্নয়নকে কোনো খাতভিত্তিক কর্মসূচি নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রীয় অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ তারুণ্যের শক্তিই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, আর যুবদের ক্ষমতায়নই একটি সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

লেখক পরিচিতি: প্রকল্প কর্মকর্তা, ইপসা ।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও