রোদ কারো কাছে কিছু চায় না। সে শুধু ওঠে, তার আলোয় শীত কাটে, ফসল পাকে, অন্ধকার সরে যায়। আমরা রোদের কাছে ঋণী , কিন্তু সেই ঋণ কেউ শোধ করতে পারে না। কিছু মানুষের জীবনও ঠিক তেমনি। চট্টগ্রামের শ্রমিক আন্দোলনের কিংবদন্তি, ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক কমরেড আহসানউল্লাহ চৌধুরীও ঠিক তেমনি।
গত বছরের ১৭ অক্টোবর কমরেড আহসানউল্লাহ চৌধুরী প্রয়াত হন। পরদিন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ৮ নম্বর দূর্গাপুর ইউনিয়নের জনার্দনপুর গ্রামে নিজ বাড়ির আঙিনায় রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদানের মাধ্যমে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। একটি বছর পেরিয়েও তাঁর অনুপস্থিতি যেমন অনুভূত হয়, তেমনি তাঁর জীবন আজও নতুন প্রজন্মকে পথ দেখায়।
১৯৩৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ফেনীর বালীগাঁওয়ে তাঁর জন্ম। কিশোর বয়সেই ইলা মিত্র ও জামিলা বুপাশার মতো সংগ্রামী নেতাদের জীবনী পড়ে তিনি ভাবতেন, তাঁরা মানুষের মুক্তির জন্য লড়তে পারলে আমরা পারব না কেন? এই প্রশ্নই তাঁর সারা জীবনের পথ ঠিক করে দেয়। ফেনী সরকারি কলেজের সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পাদক হিসেবে তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঠেকাতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে পাশে দাঁড়াতে চাঁদা তুলতেন। ১৯৫২ সালে মাত্র ষোল বছর বয়সে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে কলেজসংলগ্ন আমতলায় মিছিল-সমাবেশে নেতৃত্ব দেন। ২১ ফেব্রুয়ারি এলে তিনি আজীবন সকালে শহীদ বেদিতে ফুল দিতে যেতেন। ২০১৫ সালে তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাষাসৈনিকের স্বীকৃতি পান।
১৯৫৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে চাকরিতে ঢুকে তিনি দেখলেন, একটি সাধারণ দরখাস্ত লিখাতেও শ্রমিকদের টাকা খরচ করতে হয়। তিনি বিনা পারিশ্রমিকে তাঁদের দরখাস্ত লিখে দিতে শুরু করলেন। এই ছোট কাজ থেকেই শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁর আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠে; শুরু হয় নেতৃত্বের পথচলা। ১৯৫৯ সালে বন্দর শ্রমিক ইউনিয় গঠন করে তিনি বছরে ১২ মাসে ১৪ মাসের বেতনের দাবি তোলেন, যা পরে আদায় হয়। ১৯৬১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচনের দাবিসহ পাঁচ দফার দাবীতে তাঁর নেতৃত্বে বন্দরের ধর্মঘট কার্যত চট্টগ্রাম শহরের হরতালে রূপ নেয়। ১৯৬৫ সালের আন্দোলনের ফলে বন্দরে ডক শ্রমিকদের সরাসরি নিয়োগ, হাসপাতাল ও স্কুলের প্রতিষ্ঠার মতো সুবিধা অর্জিত হয়। সেই আন্দোলনেই তিনি প্রথমবার কারাবরণ করেন। ১৯৬৯ সালে সামরিক আদালত তাঁর অনুপস্থিতিতে কারাদণ্ড, বেত্রাঘাত ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের রায় দেয় এবং তাঁকে ধরিয়ে দিলে পুরস্কারও ঘোষণা করে। তবু তিনি থামেননি।
একাত্তরের মার্চে ‘এমভি সোতয়া’ জাহাজ বোঝাই অস্ত্র নামানোর পাকিস্তানি পরিকল্পনা ঠেকাতে তিনি বন্দর, ডক ও রেল শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করেন। টানা প্রায় ৫৯ ঘণ্টা বন্দরের কাজ অচল হয়ে থাকে। গণহত্যার পর তিনি ‘ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ যৌথ গেরিলা বাহিনী’ গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং তরুণদের আগরতলায় প্রশিক্ষণে নেওয়া-আনার ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এর মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে, পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং বড়ভাই আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীকে হত্যা করে।
স্বাধীনতার পর তাঁর রাজনৈতিক নৈতিকতার পরিচয় আরও স্পষ্ট হয়। চাকরিতে পুনর্বহাল হয়ে পাওয়া বকেয়া বেতনের বড় অংশ তিনি পার্টি তহবিলে দান করেন, পরে সার্বক্ষণিক সংগঠনের কাজে সময় দেয়ার জন্য চাকরি ছেড়ে দেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বন্দর চ্যানেল সচল করতে সোভিয়েত মাইনসুইপার দলের আগমনের পেছনে তাঁর উদ্যোগ ছিল, যে অভিযানে নাবিক ইউরি রেডকিন প্রাণ দেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি ‘স্কপ’ গঠনে নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি লালদিঘীর সমাবেশের মূল সংগঠকদের একজন ছিলেন। সিপিবির কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে নব্বইয়ের দশকের সংকটকালেও তিনি সংগঠনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় ভূমিকা ভূমিকা পালন করেন।
তিনি শুধুমাত্র সংগঠকই ছিলেন না, নিজের সময়ের সাক্ষীও ছিলেন। ‘চট্টগ্রামের শ্রমিক আন্দোলন: নানা রং ও পথ (১৯৫৭–১৯৬৬)’ এবং ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সহযোদ্ধাদের স্মৃতি’ গ্রন্থ দুটি আজ প্রামাণ্য দলিল। জীবনের শেষ পর্বে তিনি ব্যক্তিগত লাইব্রেরি গড়েছেন, তরুণদের সঙ্গে নেতৃত্ব ও নীতি নিয়ে সংলাপে সময় দিয়েছেন। ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল এ্যাকশন (ইপসা)য় একটি ডেভেলপমেন্ট রিসোর্স সেন্টার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন এবং সেটি উদ্বোধন ও কার্যক্রম সচল রাখায় প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন। জ্ঞানচর্চার প্রতি এই আগ্রহই প্রমাণ করে, তিনি পরের প্রজন্মের স্বপ্নের কথা ভাবতেন।
তাঁর প্রয়াণের পর এক বছরে স্মৃতিচারণ থেমে থাকেনি। টিইউসি প্রকাশ করেছে স্মরণপত্র ‘এক মুঠো রোদ্দুর’, প্রগতির যাত্রীর আয়োজনে হয়েছে শোকসভা ও স্মরণ-সংকলন। ‘রোদের কাছে ঋণী’ নামে আরেকটি স্মরণ-প্রকাশনা বেরিয়েছে ব্লাক আই’র পক্ষ থেকে। সিপিবি আয়োজন করেছে আবেগঘন স্মরণ সভা । এছাড়া বিভিন্ন স্থানীয়, জাতীয় পত্র পত্রিকায় তাঁর জীবনী ও কর্মের উপর প্রকাশিত হয়েছে অজস্র আলোকপাত। বিভিন্ন গণ মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও ক্লিপসসহ বিভিন্ন বর্ণাঢ্য উদ্যোগ প্রমাণ করে, তিনি আজো মানুষের হৃদয়ে কতটা আলোকিত ও স্মরণীয়।
রোদের ঋণ কেবলি স্মরণসভা ও ফুল দিয়ে শোধ হয় না। যে শ্রমিক অধিকার তিনি আদায় করেছিলেন, যে সকল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা আজকের সমাজেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। তাঁর জীবন-সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়াই তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা। যে রোদ আমাদের গায়ে লেগেছে, তা অন্যের উঠোনে পৌঁছে দেয়াই এই ঋণের একমাত্র শোধ। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করি।
লেখক: উন্নয়ন সংগঠক
