অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এপি মুলার বাংলাদেশে আসাটা মাইলস্টোন। তারা লালদিয়ায় আধুনিক বন্দর নির্মাণ করবে।
রবিবার (৩০ আগস্ট) দুপুরে পতেঙ্গায় এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার ভিত্তিস্থাপন (গ্রাউন্ডব্রেকিং সিরোমনি) অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এ কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, এমপি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি আনন্দিত, আমার সংসদীয় আসনে এ টার্মিনাল হচ্ছে।
ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমি সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়, প্রাইভেট সেক্টরকে এগিয়ে আসতে হবে। চট্টগ্রাম হবে বৈশ্বিক লজিস্টিক হাব যার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। একটি বন্দরনগরী হিসেবে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই আধুনিক বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে চট্টগ্রামের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং এটি বাংলাদেশের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই এধরনের আরো কয়েকটি বৃহৎ বন্দর, লজিস্টিকস সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে সরকার আলোচনা ও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবেই নয়, বরং পুরো অঞ্চলের মধ্যে বৈশ্বিক একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত। সরকারের কাজ ব্যবসা পরিচালনা করা নয়; বরং বেসরকারি খাতকে ব্যবসা পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, নীতিগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। এলক্ষ্যে সরকার সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের জন্য উন্নতমানের লজিস্টিকস ব্যবস্থা, কার্যকর বাণিজ্য সুবিধা, সময়োপযোগী বাণিজ্য নীতি, বিনিয়োগবান্ধব প্রণোদনা এবং সরকারের কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন। আজকের এই প্রকল্পের যাত্রা সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী নর্ডিক দেশগুলোর মানবিক মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতার প্রশংসা করে বলেন, বিশ্বব্যাপী একটি নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামো বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার অব্যাহত থাকবে এবং বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে আরো গভীরভাবে সম্পৃক্ত হবে। দেশের লজিস্টিকস খাতের উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারের সঙ্গেও বাংলাদেশের সংযোগ বাড়ানো হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বৈশ্বিক তহবিল ব্যবস্থাপক এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারের সঙ্গে কাজ করছে সরকার। বৈদেশিক বাজারে ডলার বন্ড ছাড়ার উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, আজ নতুন অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে। আমাদের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য আন্তর্জাতিক মানের হতে চলেছে। এপিএম টার্মিনাল লালদিয়া পিপিপি পদ্ধতিতে বড় বিনিয়োগ। অনেক ফ্যাসিলিটিজ থাকবে। নিশ্চয় এটি জাতির জন্য সুসংবাদ।
চট্টগ্রাম বন্দর অর্থনীতির প্রাণশক্তি। এখানে বাণিজ্যিক হাব আছে, সেটি প্রসারিত হচ্ছে। এটি চলমান থাকবে। আরও অনেক প্রতিষ্ঠান বন্দরে বিনিয়োগে আগ্রহী। তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। যেখানে যাকে দেশের স্বার্থে ব্যবহার করা যায় সেটি করতে সক্ষম হচ্ছে। এপিএম কনটেইনার টার্মিনাল বাস্তবায়নে সহযোগিতার অঙ্গীকার করেন মন্ত্রী।
স্বাগত বক্তব্য দেন এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রমেশ ডেভিড। তিনি বলেন, এ টার্মিনালে অ্যাডভান্সড টেকনোলজি ব্যবহার করা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, আমি খুবই আনন্দিত। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের মেজর গেটওয়ে। এ বন্দর দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি রপ্তানি এবং ৯৮ শতাংশের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে। ডেনমার্কে গ্রিন টেকনোলজির কিছু টার্মিনাল আমি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। ১০ বছরে আমাদের কনটেইনার হ্যান্ডলিং দ্বিগুণ হচ্ছে। আমরা বিদেশি বিনিয়োগ পার্টনারকে বাংলাদেশে স্বাগত জানাই।
বক্তব্য দেন এপিএম টার্মিনালস বিভি’র গ্লোবাল হেড অব বিজনেস ইমপ্লেমেন্টেশন জেক ক্রেইগ, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া। উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত, চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হকসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগে ডেনমার্কের বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ায় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করছে। তাদের লোকাল পার্টনার হিসেবে থাকছে কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেড। এ টার্মিনালে থাকবে ৭টি শিপ টু শোর (এসটিএস) গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন (ইআরটিজিএস) এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্র্যাক্টরস।
কর্ণফুলী নদীর পাড়ের ৪৯ দশমিক ১৫ একর জায়গায় হবে টার্মিনালটি। এর মধ্যে ৩২ একরে মূল টার্মিনাল, ৭ দশমিক ১৫ একরে কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একরে ট্রাক পার্কিং। নির্মাণকাল ৩ বছর। অপারেশন চলবে ৩০ বছর, প্রয়োজনে বাড়বে আরও ১৫ বছর। বছরে ৯ লাখ টিইইউএস হ্যান্ডলিং ক্ষমতার এ টার্মিনালে ৬১৩ মিটারের জেটিতে ভিড়তে পারবে ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফট ও ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার বড় জাহাজ। এ টার্মিনালে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ আনা নেওয়া করা যাবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এপিএম টার্মিনালস থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে এককালীন। বছরে পাবে আড়াই লাখ ডলার কনসেশন ফি। কনটেইনার প্রতি পাবে ২৩ ডলার। প্রকল্প এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ১৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে এপিএম টার্মিনালস। ২০৩০ সালে অপারেশনে যাবে লালদিয়া টার্মিনাল।

