শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

[the_ad id='15178']

জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের নির্দেশনা দিলেন চসিক মেয়র

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

- Advertisement -

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিরসনকল্পে গঠিত ১৯ সদস্যবিশিষ্ট সমন্বয় কমিটির এক জরুরি সভায় সভাপতিত্ব করেন তিনি।

- Advertisement -shukee

সভায় চলমান বর্ষা মৌসুমে নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে খাল, নালা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্থার চলমান কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় জলাবদ্ধতা নিরসনসংক্রান্ত চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়ানো, খাল ও নালা নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, প্রতিবন্ধকতা দ্রুত অপসারণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত সমস্যার সমাধানে গুরুত্ব দেয়া হয়।

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করবে এবং চলমান প্রকল্পসমূহের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।

সভায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কমিটির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এটি একটি ব্যতিক্রমী প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কয়েক দিনের মধ্যে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ। বিশ্বের যেকোনো শহরের জন্যই এ ধরনের বৃষ্টিপাত বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করছি।

“অস্বাভাবিক মাত্রার টানা বৃষ্টিপাতের মধ্যেও খাল পুনঃখনন, ড্রেনেজ উন্নয়ন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার চলমান কাজের কারণে নগরীতে জলাবদ্ধতার তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে যেসব এলাকায় এখনো পানি জমে রয়েছে, সেসব স্থানের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা হবে।

তিনি জানান, ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, রেড ক্রিসেন্ট, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একযোগে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে কাজ করছে। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষদের জন্য শুকনো খাবার, রান্না করা খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে।

ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, মানবিক বিপর্যয় যাতে না ঘটে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ের ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসতে সবাইকে আরও সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, বোঝানোর মাধ্যমেই তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে আনা প্রয়োজন।

জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে চলমান কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে মেয়র বলেন, অতীতে দখল, ভরাট ও অবৈধ স্থাপনার কারণে অনেক খাল, ড্রেন ও বক্স কালভার্টের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও খাল ভরাট করে আবাসিক এলাকা, ক্লাব, গরুর খামার ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। অনেক ড্রেনের ওপর স্থায়ী ফুটপাত নির্মাণ করায় পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এসব অবৈধ দখল ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করার কাজ চলছে।

তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি জলাবদ্ধ এলাকার কারণ অনুসন্ধান করছি। কোথায় খাল বন্ধ হয়েছে, কোথায় ড্রেন দখল হয়েছে, কোথায় বক্স কালভার্ট নষ্ট হয়েছে সবকিছু শনাক্ত করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চকবাজার, দুই নম্বর গেটসহ যেসব এলাকা আগে নিয়মিত পানিতে তলিয়ে যেত, সেখানে এখন দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। অবশিষ্ট সমস্যাগুলোও ধাপে ধাপে সমাধান করা হবে। সিটি কর্পোরেশন নিজস্ব উদ্যোগে আরও ৪০টি খাল উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধারের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরীর জলাবদ্ধতা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা অসম্ভব কোনো লক্ষ্য নয়। সমন্বিত পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, খাল পুনরুদ্ধার এবং জনগণের সহযোগিতা পেলে আমরা ধাপে ধাপে সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারব।

মেয়র জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সহায়তায় খাল প্রশস্তকরণ ও পুনরুদ্ধারের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এ কাজের সুফল ইতোমধ্যে নগরবাসী পেয়েছে। একই সঙ্গে বর্ষা শেষে হিজড়া খাল, গুলজার খাল, জামালখান খাল, রামপুরা খাল, বামনশাহী খাল, আজববাহারখালসহ অবশিষ্ট খালগুলোর কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।

নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, “এই শহর আমাদের সবার। জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। যত্রতত্র প্লাস্টিক, পলিথিন ও বর্জ্য ফেলে আমরা নিজেরাই ড্রেন ও খাল বন্ধ করে দিচ্ছি। সিভিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। সবাই মিলে দায়িত্বশীল আচরণ করলে চট্টগ্রামকে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও জলাবদ্ধতামুক্ত নগরীতে পরিণত করা সম্ভব।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের দায়িত্ব হলো মাঠে। আমি আশা করবো এখন থেকে এই জাতীয় দুর্যোগ যখন হবে আপনারা মেয়রকেন্দ্রিক, সিডিএ চেয়ারম্যানকেন্দ্রিক ছুটাছুটি না করে আপনারা প্রত্যেকটা পয়েন্টে যাবেন।

“আমি বলব এটা দীর্ঘদিনের ১৭-১৮ বছরের জঞ্জাল। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম আমরা দেখেছি চট্টগ্রাম একটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত নান্দনিক শহর। পূর্ববর্তী শাসনামলে অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে আজকে এই শহরের এই অবস্থা। । যদি আমরা একসাথে কাজ করি আমার মনে হয় আমরা চট্টগ্রামকে আগের সেই নান্দনিক চট্টগ্রাম অবস্থায় আমরা ফিরিয়ে নিতে পারব। ভবনের একটা ডিজাইন পেতে নাগরিকদের যে দুর্ভোগ তা লাঘবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি সামনে ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে এই কাজটি করব।

“উই আর কমিটেড। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে যখন আলাপ হয়েছে উনি এক কথায় বলেছেন মেয়র মহোদয়ের সাথে যৌথভাবে কাজ করতে। সমন্বয়ের ভেতরে কাজ করতে। চট্টগ্রামকে একটা মডেল, সবুজ, নান্দনিক শহরে পরিণত করতে চাই আমরা। সে লক্ষ্য পূরণে আপনাদের সকলের সহযোগিতা লাগবে। আর কেউ এ কথাটি বলবেন না এটা সিটি কর্পোরেশনের, এটা সিডিএর, এটা গণপূর্তের। অতীতের একে অপরের দোষারোপের রাজনীতি থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে।”

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, এবার যে অতিবৃষ্টি হয়েছে আমরা মোকাবিলা করতে পেরেছি কারণ সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটা টিম কিন্তু সক্রিয় ছিল মাঠে এবং যেখানে প্রবলেম হয়েছে প্রত্যেকটা টিম বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃক খুব বেশি সক্রিয় ছিল। আমরা চট্টগ্রামের জন্য একসাথে কাজ করব সিটি কর্পোরেশনকে সামনে রেখে, মাননীয় মেয়রকে সামনে রেখে। আমরা সবসময় উনাকে সহযোগিতা করব।

আমাদের লাইফলাইন কিন্তু কর্ণফুলী নদী। কাপ্তাই আমাদের চট্টগ্রামের লাইফলাইন। চট্টগ্রামকে আরও সমৃদ্ধ করতে চাইলে কর্ণফুলী নদী, হালদা নদী এবং কাপ্তাইকে ঘিরে একটি বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নগরীতে প্রতিদিন চাহিদা ৬৫ হাজার কোটি লিটার আমরা উৎপাদন করি ৫৫ হাজার কোটি লিটার। ১০ হাজার কোটি লিটার কিন্তু ঘাটতি আছে। এজন্য আমরা আগামী ১০০ বছরের চাহিদা বিবেচনায় পরিকল্পনা করছি।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামছুল আলম বলেন, সাম্প্রতিক রেকর্ড বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা যাতে সৃষ্টি না হয় সেজন্য আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করেছি। ফলে, যখনই বৃষ্টি কিছুক্ষণের জন্য থেমেছে দ্রুত বৃষ্টির পানি নেমে গেছে। এটা সম্ভব হয়েছে দখলকৃত খাল-নালা উচ্ছেদ করে জলপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে অভিযান পরিচালনার জন্য। যেসব জায়গায় এখনো উচ্ছেদের প্রয়োজন আছে সেগুলো উচ্ছেদ করে, রেগুলেটরগুলো ঠিকমতো কাজে লাগালে, অসমাপ্ত কাজ শেষ হলে নগরীর জলাবদ্ধতা মোকাবিলার সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে।

সভায় আরো বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া, ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী, এডিসি মো. কামরুজ্জামান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল) মো. জামিলুর রহমান, চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মো. ওবায়দুর রহমান, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একেএম মামুনুল বাশরী , চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আহমদ মঈনুদ্দিন, চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাঈদ, আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আবদুর রহমান খান, ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের খাল ও জলাবদ্ধতা বিষয়ক উপদেষ্টা শাহরিয়ার খালেদ। কমিটির সভা শেষে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি এবং সিটি রেড ক্রিসেন্টের সেক্রেটারি গোলাম বাকী মাসুদ বক্তব্য রাখেন।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও