আওয়ামী লীগের জন্মদিন আজ । ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের এইদিন পুরোনো ঢাকার টিকাটুলীর কে এম দাশ লেনে ঢাকা পৌরসভার ভাইস-চেয়ারম্যান কাজী বশির হুমায়ুনের অপূর্ব কারুকার্য খচিত ভবন রোজ গার্ডেনে আওয়ামী লীগ ভূমিষ্ঠ হয়। প্রথম নাম আওয়ামী মুসলিম লীগ। কারণ তখন বাঙালি ‘মুসলিম’ হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিলো। আরব, পারস্যের বীর সোহরার রুস্তমের বীরত্বের কাহিনী শুনে শুনে বাঙালি রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিত। স্বদেশী বীর ঈশা খাঁ, কেদার রায়, মুসা খাঁ এবং শমসের গাজীর স্থান তখন বাঙালি মানসে ছিলো না।
জিন্নাহ’র দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দু’বছর পূর্বে ৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাঙালি জীবন এমন ইসলামী জজবায় আক্রান্ত হয় যে বিভিন্ন ক্লাব ও প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ‘ইসলাম’ শব্দ জুড়ে না দিলে বাঙালির মুখে রুচি হচ্ছিলো না। মাঝিরঘাটে কুন্ডুদের বাজার হয়ে গেল পাকিস্তান বাজার। মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী সাহেব পাকিস্তান চাননি, তাঁর বাড়ির সামনের বাজারটিও পাকিস্তান বাজার হয়ে গেল। সমস্ত প্রতিষ্ঠানের শিরে পত পত করে উড়তে লাগল পাকিস্তানের চাঁদতারা পতাকা। ছাত্ররা স্কুলে এসেম্বলিতে গাইতে লাগল-“পাক সার জমিন সাদ বাদ”।

এমনি দমবন্ধ পরিস্থিতিতে বরমার ছেবন্দী গ্রামের অধ্যক্ষ আবুল কাশেম ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু বা বাংলা’ শীর্ষক এক ক্ষুদ্র পুস্তিকা লিখে হৈ চে ফেলে দিলেন।
যারা ইসলামীকরণের তাত্ত্বিক জমি তৈরি করে দিয়েছিলেন, কাশেম সাহেব তাঁদের চেয়ে বেশি বই কম মুসলিম ছিলেন না এবং অনেক বড় ইসলামী পণ্ডিত ছিলেন। তমদ্দুন মজলিশ তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন এবং ভাষা আন্দোলনেরও সূচনা করেন। ভাষা আন্দোলন বাঙালির স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি ফিরে তাকাবার অবকাশ সৃষ্টি করে। বদরুদ্দীন উমর সাহেব বাঙালি জীবনে ভাষা আন্দোলনের প্রভাব নির্ণয় করতে গিয়ে যথার্থই বলেছেন, ‘বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’।
আওয়ামী মুসলিম লীগ ৫২’র ভাষা আন্দোলনের আগের ঘটনা। ২৩ জুন সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাঙালি চৈতন্যের ডিমে তা দিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রসব করেন। তার পরদিনই লীগের ওপর মুসলিম লীগ হামলে পড়লো। ২৪ জুন আরমানিটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের জনসভার ওপর হামলা চালানো হলো, কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে স্থানীয় নেতা ইয়ার মোহাম্মদ খান এবং কাদের সর্দারের পরোক্ষ সমর্থন থাকায় আওয়ামী লীগ নেতারা বেঁচে গিয়েছিলেন।
২৩ জুন সমগ্র পূর্ববঙ্গ থেকে তিন শতাধিক ডেলিগেটস রোজগার্ডেনে উপস্থিত হয়েছিলেন। চট্টগ্রাম থেকে ১১ জন অংশগ্রহণ করেছিলেন।
আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সম্মেলনে কিছুক্ষণের জন্য উপস্থিত থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। সম্মেলনে প্রাদেশিক পরিষদের উপ-নির্বাচনে নির্বাচিত তরুণ এমএলএ শামসুল হক ‘মূল দাবি’ নামক একটি লিখিত পুস্তিকায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, জনগণের প্রত্যাশা ইত্যাদি বিষয় উপস্থাপন করেন।
আওয়ামী লীগ গঠনের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন দু’জন—হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সোহরাওয়ার্দী কলকাতা থেকে ঢাকায় আসার জন্য জাহাজে করে বুড়িগঙ্গায় আসলেও তাঁকে নামতে দেয়া হয়নি। তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় এবং ভারতের লেলিয়ে দেয়া কুকুর বলে ঘৃণ্য অপবাদ দেয়া হয়। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে রাজনীতি আরম্ভ করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানে একটি বিরোধী দল গঠন করার জন্য ঢাকার নেতাদের অনুপ্রাণিত করেন। সেই বিরোধী দলই হল আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা ভাসানীকেও নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করা হয়। ১৯৫৫ সালের ২১ থেকে ২৩ অক্টোবর মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে সদরঘাট রূপমহল হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে ৫ থেকে ৬ শত প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে শেখ মুজিবসহ বিভিন্ন নেতা বক্তৃতা করেন এবং লিখিত আকারে সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদন পাঠ করেন। এ সম্মেলনে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘আওয়ামী লীগ’। আওয়ামী লীগকে সর্বজনীন রাজনৈতিক দলে পরিণত করার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রিপোর্টে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, দেশের এবং জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে আওয়ামী লীগকে অসাম্প্রদায়িক দলে পরিণত করতে হবে। সম্মেলনে আওয়ামী মুসলিম লীগকে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করে আওয়ামী লীগ নামকরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে আওয়ামী লীগের দ্বার সকলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগকে অসাম্প্রদায়িক সংগঠনে পরিণত করা ছিল বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের পথে প্রথম বড় পদক্ষেপ। (মোনায়েম সরকার/আশফাক-উল-আলম : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পৃ. ১৪৫)। সম্মেলনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে একটি কমিটি গঠিত হয়। গঠিত কমিটি ছিল নিম্নরূপ : সভাপতি-মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী; সহ-সভাপতি (ক) আতাউর রহমান খান, (খ) আবুল মনসুর আহমদ, (গ) খয়রাত হোসেন। ২. সাধারণ সম্পাদক- শেখ মুজিবুর রহমান, ৩. সাংগঠনিক সম্পাদক-অলি আহাদ, ৪. প্রচার সম্পাদক-আবদুল হাই, ৫. শ্রম সম্পাদক-আবদুস সামাদ, ৬. সংস্কৃতি ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক-তাজউদ্দীন আহমদ, ৭. মহিলা সম্পাদিকা-মিসেস সেলিনা বানু, ৮. দপ্তর সম্পাদক-মোহাম্মদ উল্লাহ, ৯. কোষাধ্যক্ষ-ইয়ার মোহাম্মদ খান, সদস্য- (১) জহুর আহমদ চৌধুরী (চট্টগ্রাম), (২) আবদুল আজিজ (চট্টগ্রাম), (৩) অধ্যাপক আসহাবউদ্দিন আহমদ (চট্টগ্রাম), (৪) আবদুল জব্বার খদ্দর (নোয়াখালী), (৫) আবদুল বারী (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), (৬) রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া (ময়মনসিংহ), (৭) হাতেম আলী খান (টাঙ্গাইল), (৮) আবদুল হামিদ চৌধুরী (ফরিদপুর) (৯) সৈয়দ আকবর আলী (সিরাজগঞ্জ), (১০) শেখ আবদুল আজিজ (খুলনা), (১১) মোমিন উদ্দিন আহমদ (খুলনা), (১২) মশিউর রহমান (যশোর), (১৩) সাদ আহমদ (কুষ্টিয়া), (১৪) তহুর আহমদ চৌধুরী (রাজশাহী), (১৫) কাজী গোলাম মাহবুব (বরিশাল), (১৬) ক্যাপ্টেন মনসুর আলী (পাবনা), (১৭) আমজাদ হোসেন (পাবনা), (১৮) ডা. মাযহারউদ্দীন আহমদ (রংপুর), (১৯) মাওলানা আলতাফ হোসেন (ময়মনসিংহ), (২০) রহিমুদ্দিন আহমদ (দিনাজপুর), (২১) আমিনুল হক চৌধুরী (বরিশাল), (২২) আকবর হোসেন আখন্দ (বগুড়া), (২৩) দবিরউদ্দীন আহমদ (নীলফামারী), (২৪) মীর হাবিবুর রহমান (সিলেট), (২৫) কমরুদ্দীন আহমদ (ঢাকা)। (প্রাগুক্ত- পৃ. ২৪৯) এই কমিটিতে চট্টগ্রাম থেকে তিনজন সদস্য হিসেবে স্থান পেয়েছেন; তন্মধ্যে জহুর আহমদ চৌধুরী এক নম্বর সদস্য, তারপরেই এমএ আজিজ ও অধ্যাপক আসহাব উদ্দীনের স্থান। কলাম লেখক ইদরিস আলম লিখেছেন, ১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সে অধিবেশনে জহুর আহমদ চৌধুরীর প্রস্তাবক্রমে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে সন্তোষের মহারাজার নাটভবনে অনুষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক কাউন্সিল অধিবেশন। সে অধিবেশনে সোহরাওয়ার্দী ও তাঁকে সমর্থন করার জন্য বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়। কিন্তু জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের কাউন্সিলরগণ সে ষড়যন্ত্র বানচাল করে দেন।… ১৯৫৭ সালে ঢাকার গুলিস্তান সিনেমা হলে আয়োজিত আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনে উগ্রপন্থীরা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টা করে। সে অধিবেশনে দীর্ঘ ১ ঘণ্টা ধরে এক তেজোদ্দীপ্ত ভাষণ দিয়ে জহুর আহমদ চৌধুরী তাদের মুখোশ উন্মোচন করে দেন। (ইদরিস আলম : জনতার যোদ্ধা, জহুর আহমদ চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ) ১৯৬৬ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার ইডেন হোটেলে। কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমানের ৬-দফাকে দলের প্রধান ইশতেহার হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পূর্ব বাংলার জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনকেই আওয়ামী লীগ দলের প্রধান নীতি বলে বিবেচনা করে। কাউন্সিল অধিবেশনের শেষদিন ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জনসভায় শেখ মুজিব ৬-দফার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন। কাউন্সিল অধিবেশনে একটি নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত হয়। এতে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটিতে জহুর আহমদ চৌধুরীর অবস্থান আরো সুদৃঢ় হয়েছে। এবার বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে তাঁর পদোন্নতি ঘটেছে, তিনি শ্রম সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে শ্রম সম্পাদক বেশ গুরুত্বপূর্ণ পদ, সাংগঠনিক সম্পাদকের পরে যার স্থান। অবশ্য ৫৭ সাল থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সে বছর আওয়ামী লীগ ভেঙে ‘ন্যাপ’ এর জন্ম হলে দলের শ্রম সম্পাদক আবদুস সামাদ আজাদ সেই দলে যোগদান করেন। জহুর আহমদ চৌধুরীকে তাঁর স্থলে আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়। নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি : সভাপতি- শেখ মুজিবুর রহমান; সহ-সভাপতি- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, হাফেজ হাবিবুর রহমান, মুজিবর রহমান (রাজশাহী); সাধারণ সম্পাদক- তাজউদ্দীন আহমদ; সাংগঠনিক সম্পাদক- মিজানুর রহমান চৌধুরী; শ্রম সম্পাদক- জহুর আহমদ চৌধুরী; প্রচার সম্পাদক- এডভোকেট আবদুল মোমেন; মহিলা সম্পাদক- মিসেস আমেনা বেগম; অফিস সম্পাদক- মোহাম্মদ উল্লাহ; সমাজকল্যাণ সম্পাদক- কে এম ওবায়দুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ- নুরুল ইসলাম চৌধুরী। (প্রাগুক্ত- পৃ. ৩২৪- ৩২৫) সিরাজউদদীন আহমেদ লিখিত ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ গ্রন্থে (পৃ. ১০৩-১০৪; ভাস্কর প্রকাশনী, ঢাকা : ১৬ ডিসেম্বর, ২০১১) ৭ জন সহ-সভাপতির নাম দেয়া হয়েছে। তারা হচ্ছেন- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুস সালাম খান, খন্দকার মোশতাক আহমদ, এম মনসুর আলী, মুজিবুর রহমান ও শাহ আজিজুর রহমান। এখানে আবার হাফেজ হাবিবুর রহমানের নাম নেই। ২২ জন সদস্যের নাম দেয়া হয়েছে, তারা হচ্ছেন, এস ডব্লিউ লকিয়তুল্লাহ, আবদুর রহমান খান, এমএ রশিদ, রওশন আলী, মমিনউদ্দিন আহমদ, আতাউর রহমান, রহিমুদ্দিন আহমদ, সাদ আহমদ, জালালউদ্দিন আহমেদ, আমজাদ হোসেন, সোহরাব হোসেন, অধ্যাপক ইউসুফ আলী, আবদুল মালেক উকিল, নুরুল হক, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, শামসুল হক, শেখ আবদুল আজিজ, আফজাল হোসেন, জাকিরুল হক, আবদুস সামাদ, আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, মোল্লা জালালউদ্দিন।
সত্তরের নির্বাচনকে সামনে রেখে ১৯৭০ সালের ৪ জুন মতিঝিল ইডেন হোটেল প্রাঙ্গণে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে দলীয় প্রধান বঙ্গবন্ধু বলেন, দাবি আদায়ের জন্য যাঁরা প্রাণ দিল, তাঁদের রক্তের দাগ যেন কেউ ভুলে না যায়। নির্বাচনের মাধ্যমে শহীদের রক্তের বদলা নেয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানান। কাউন্সিল অধিবেশনে যে কমিটি নির্বাচিত হয়, তাতে জহুর আহমদ চৌধুরী পুনরায় দলের শ্রম সম্পাদক নির্বাচিত হন। কমিটি ছিল নিম্নরূপ : সভাপতি : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সহ-সভাপতি : সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক : তাজউদ্দীন আহমদ, সাংগঠনিক সম্পাদক : মিজানুর রহমান চৌধুরী, প্রচার সম্পাদক : আবদুল মোমিন, দপ্তর সম্পাদক : মোহাম্মদউল্লাহ, শ্রম সম্পাদক : জহুর আহমদ চৌধুরী, সমাজসেবা ও সংস্কৃতি সম্পাদক : বেগম বদরুন্নেসা (নবনির্বাচিত), কোষাধ্যক্ষ : মোহাম্মদ মোহসিন (নবনির্বাচিত)। মোনায়েম সরকার, আশফাক-উল-আলম : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ, আগামী প্রকাশনী, ২০১১, পৃ. ২৫১)। এই আওয়ামী লীগ ৭০-এর নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের দাবিদার হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ইতিমধ্যে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি লাভের পর ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন, তিনি পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য বাঙালির, ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে বিজয়ী হয়েও ক্ষমতায় বসতে পারেনি, এবারও বাঙালি যাতে ক্ষমতায় বসতে না পারে, সেজন্য নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু হয়। সেই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে বঙ্গবন্ধু ৭১-এর ৭ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের নাম প্রায় মুছে ফেলেন। অবশেষে ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান।
ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনুসর আলী এবং কামরুজ্জামান অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠন করে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। সৈয়দ নজরুল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে। বঙ্গবন্ধু ১৭ জানুয়ারি দেশে ফিরে এসে জাতিকে সংবিধান দেন এবং দেশ পুনর্গঠন করেন। ভারতীয় বাহিনীকে তাদের দেশে ফেরত পাঠান এবং ১৯৭৩ সালে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস পরিক্রমায় আমরা দেখলাম ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অবদান এবং আওয়ামী লীগের কাছে বাঙালি জাতি চিরদিনের জন্য কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সিনিয়র সাংবাদিক

