আগামী ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ লাখ জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগ দেবে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। অন্যদিকে, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ কার্যক্রম সমন্বয় করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত মার্চে নিয়োগ প্রস্তাবনা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা চেয়ে গত ৭ মার্চ সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠি পাঠায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এর পর মার্চের মাঝামাঝিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-বিভাগ ও দপ্তর-সংস্থার শূন্য পদে নিয়োগের পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পাঠায়।

এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, আমরা সব মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ পরিকল্পনা পেয়েছি। এখন তা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
এদিকে পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম গতকাল রাতে সমকালকে বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে পিএসসি কতজন জনবল নিয়োগ দেবে, এ-বিষয়ক তথ্য জানতে চেয়েছিল মন্ত্রণালয়। আমরা বিস্তারিত পরিকল্পনা জানিয়েছি। তবে কোন পদে কতজন নিয়োগ হবে, তা নথি দেখে বলতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিবছর একটি বিসিএস সম্পন্ন করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে পিএসসি। এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিশেষ কোনো বিসিএস বা নিয়োগের উদ্যোগ নিলে সেই কাজ করার চেষ্টা করব।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বাজেট ব্যবস্থাপনা অধিশাখার এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, পাঁচ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের বিপরীতে প্রয়োজন হবে সাড়ে আট কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) শেষ চার মাসে (মার্চ-জুন) লাগবে সাড়ে চার কোটি টাকা। আর আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২৭) জুলাই ও আগস্টে লাগবে চার কোটি টাকা। নিয়মিত রাজস্ব বাজেটের আওতায় এটি পরিচালিত হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘স্ট্যাটিসটিকস অব পাবলিক সার্ভেন্টস-২০২৪’ অনুযায়ী, সব শ্রেণি মিলিয়ে বর্তমানে ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৯১ জন সরকারি চাকরিজীবী কর্মরত আছেন। এর বিপরীতে শূন্য আছে চার লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদ। বর্তমানে সরকারি চাকরির প্রথম শ্রেণিতে কর্মরত আছেন এক লাখ ৯০ হাজার ৭৭৩ জন, এর মধ্যে শূন্য পদ ৬৮ হাজার ৮৮৪টি। দ্বিতীয় শ্রেণিতে কর্মরত দুই লাখ ৩৩ হাজার ৭২৬ জন, শূন্য এক লাখ ২৯ হাজার ১৬৬টি পদ। তৃতীয় শ্রেণিতে কর্মরত ছয় লাখ ১৩ হাজার ৮৩৫ জন, শূন্য এক লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯টি পদ। চতুর্থ শ্রেণিতে কর্মরত চার লাখ চার হাজার ৫৭৭ জন, শূন্য এক লাখ ১৫ হাজার ২৩৫টি পদ।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সমকালকে বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সরকার কাজ করার চেষ্টা করছে। সে অনুযায়ী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১৮০ দিনের একটি কর্মসূচি নিয়েছে। এই কর্মসূচিতে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ কত সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করতে পারবে, সে ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে পাঁচ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের চেষ্টা চলছে।
এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সব পর্যায় মিলিয়ে ৩২ শতাংশ পদ খালি আছে। খালি পদের সংখ্যা ৭৭ হাজার ৮৭৭টি। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা আছে, সরকারের বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থায় পাঁচ লক্ষাধিক সরকারি কর্মচারীর পদ শূন্য আছে। যত দ্রুত সম্ভব স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতার ভিত্তিতে মেধাবী তরুণ-তরুণীকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়ার গতি খুবই কম। কোনো কোনো দপ্তর ও সংস্থার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের চার-পাঁচ বছরেও নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হচ্ছে না। এতে রাজস্ব খাতের পদগুলো বছরের পর বছর শূন্যই থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া সমকালকে বলেন, জনবল নিয়োগে সরকার কত শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে, এ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ, অনেক দপ্তর-সংস্থায় পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু নিয়োগ বিধি তৈরি করা হয়নি। এ ছাড়া প্রবিধিমালা ও আইনি আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। অনেক ক্ষেত্রে পাঁচটি পদে রাজনৈতিক তদবির থাকে ১০টি। তখন নিয়োগ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ জন্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সহজ হবে। এর পরও কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা নিজের লোক নিয়োগ দিতে না পারলে জটিলতা তৈরি করে। তাদের শক্তভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সমকালকে বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারলে ভালো। এ জন্য কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে, সেগুলো দূর করতে হবে। নিয়মবহির্ভূত মামলা ও নিয়োগ বিধির সমস্যা নিরসন করতে হবে। সমস্যা নিরসন না হলে দ্রুত জানাতে হবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে।

