বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সংস্কার প্রস্তাব ও গণভোট: সব কী জনগণ জানে?

শাকিলা জেরিন

গণভোটের ব্যালট পেপার; একটি প্রশ্ন, চারটি পয়েন্ট ও হ্যাঁ/ না’র মুখোমুখি জনগণ। গণভোটের কথা এখন আর কারোরই অজানা নয়। ইতোমধ্যে সরকার প্রচারণাও শুরু করেছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে। প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে আছে ‘সরকারি সরকারি’ যোগাযোগে লোগো ব্যবহার, সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ব্যানার টানানো, সারা দেশে ব্যানার, বিলবোর্ড, লিফলেট ও ফেস্টুন। রয়েছে বিশেষ উদ্যোগ ভোটের গাড়ি- সুপার ক্যারাভান। ভিডিও বার্তা, ফটোকার্ডের মাধ্যমে চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা। উদ্দেশ্য, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’র ভিত্তিতে হতে যাওয়া গণভোট সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা। কিন্তু এত আয়োজনেও কি গণভোটের বিষয়বস্তু নিয়ে জনগণ সম্পূর্ণ ও স্বচ্ছ ধারণা পেয়েছে?

- Advertisement -

গণভোট বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁক। যেহেতু গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে, তাই সনদে প্রস্তাবিত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব সম্পূর্ণরূপে বোঝা সঠিক ও সুস্থ গণতন্ত্র চর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সিলেক্টিভ প্রচারণা এবং জনগণের কাছে বিস্তারিত তথ্যের অনুপস্থিতি ‘তথ্যের শূন্যতা’ (Information Gap) তৈরি করছে।

- Advertisement -shukee

যেকোনও গণভোটের পূর্বশর্ত হলো- ভোটাররা কীসের ওপর ভোট দিচ্ছেন, সে সম্পর্কে তাদের সম্যক ধারণা থাকা। যদি ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের সবক’টি জনগণের সামনে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন না করা হয়, তবে সেই গণভোটের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। সরকার যদি কেবল জনপ্রিয় বা সুবিধাজনক কিছু প্রস্তাব প্রচার করে এবং অন্য বিষয়গুলো আড়ালে রাখে, তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হবে। তাই জুলাই জাতীয় সনদের দিকে মনোযোগ দেয়া জরুরি। ৫টি কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ১৬৬টি সুপারিশের মধ্যে ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৭২ বার বৈঠকের পর ৮৪টি সুপারিশ সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রথম ভাগে ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কারের বিষয়সমূহতে ১১টি শিরোনামের অধীনে ৪৭টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। দ্বিতীয় ভাগ ‘আইন/ অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কারের বিষয়সমূহের মধ্যে রয়েছে ৩৭টি সংস্কার প্রস্তাব।

কিন্তু আলোচনায় রয়েছে কেবল উচ্চকক্ষ, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মতো সিলেক্টিভ কিছু বিষয়। প্রচার করা হচ্ছে সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধির বিষয়ও। কিন্তু কোনোটিরই বিস্তারিত তথ্য, ইতিবাচক-নেতিবাচক উভয় দিক জনগণকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলা হচ্ছে না।

৮৪টি পয়েন্টের মধ্যেও রয়েছে একাধিক উপ-পয়েন্ট। ৭ নম্বর পয়েন্টে বর্তমানে বাংলাদেশ সংবিধানের চারটি মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’র কথা বলা হয়েছে। সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদার ধারণা জনগণের কাছে কি স্পষ্ট? সামাজিক ন্যায়বিচার হলো এমন একটি আদর্শ সমাজব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার অধিকার, সুযোগ এবং সম্পদের সুষম বণ্টন পায়। এটি কেবল আইনের চোখে সমান হওয়া নয়, বরং জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা অর্থনৈতিক অবস্থা নির্বিশেষে সমাজে সবার জন্য মর্যাদা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার একটি প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রীয় একক আইনের পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন রেখে কি নারী পুরুষ বা যেকোনও লিঙ্গের জন্য সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব? আরও বলা হয়েছে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা, ধর্মীয় স্বাধীনতা বলতে কী বোঝানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। শুধু বিদ্যমান বা প্রচলিত ধর্ম চর্চার অধিকার? নাকি প্রতিটি নাগরিকের নিজের স্বাধীনতায় ধর্ম পালন বা বর্জন করার অধিকার? সেক্ষেত্রে অ্যাথিস্টদের বিষয়ে অবস্থান কী?

৮ নম্বর পয়েন্টে বলা হয়েছে, সংবিধানে যুক্ত করা হবে ‘সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদা’। যেখানে শত বছরের বাঙালি ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নস্যাৎ করতে একটি দল সক্রিয়, সংখ্যালঘুদের উৎসবে হামলা, প্রতিমা ভাঙার ঘটনা ঘটে সেখানে কীভাবে সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে? নাকি অতীতে যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা থাকা সত্ত্বেও মর্যাদা শুধু নয়, জীবনের ঝুঁকি ছিল, তেমনই হবে? পরিবর্তন শুধু কাগজে নয়, বাস্তবেও দৃশ্যমান হওয়া চাই। তিনটি দলের নোট অব ডিসেন্টও রয়েছে এই পয়েন্টে, কিন্তু কারণ অনুপস্থিত।

৯ নম্বরে মৌলিক অধিকারের তালিকা সম্প্রসারণের কথা রয়েছে। প্রশংসনীয় উদ্যোগ, কিন্তু কোন কোন অধিকার যুক্ত করা হবে তার কোনও উল্লেখ নেই। জনগণের জন্য ভালো-মন্দ যে উদ্যোগই গ্রহণ করা হোক তা স্পষ্টভাবে জানার অধিকার তাদের রয়েছে।

১০ নম্বর পয়েন্টে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির নিয়োগের সাথে উচ্চকক্ষ জড়িত। উচ্চকক্ষ হবে কিনা তা এখনও নিশ্চিত নয়, যদি না হয় তবে বিকল্প কোনও ব্যবস্থার কথা রাখা হয়নি। শুধু রাষ্ট্রপতি নয়, গুরুত্বপূর্ণ বেশিরভাগ সংস্কারেই উচ্চকক্ষের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অথচ উচ্চকক্ষ কী? এর গঠন, কাজ, ক্ষমতা, প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ জনগণের স্পষ্ট কোনও ধারণাই নেই।

১১ নম্বর পয়েন্টে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্বের বিষয়ে উল্লেখ আছে, অন্তর্বর্তী সরকার শুধু ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা প্রচার করছে। যেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদের নিয়োগ রাষ্ট্রপতির হাতে থাকবে। এর সুবিধা কী বা এর কোনও অসুবিধা আছে কিনা তা জনগণের কাছে তুলে ধরা না হলে জনগণ কীসের ভিত্তিতে তার ভোট দেবে? এই পয়েন্টে ৯টি রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট আছে, কিন্তু কারণ উল্লেখ নেই।

১৩ নম্বর পয়েন্টে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের বিষয়ে বলা হয়েছে, ক্ষমা করার আগে মামলার বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের সম্মতি নেওয়া হবে। এই বিষয়টির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো জনগণের অজানা। প্রস্তাবিত পরিবর্তনের ফলে ক্ষমতার অপব্যবহার যেমন কমাবে, তেমনি অনেক সময় মানবিক কারণে বা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ক্ষমা প্রদর্শনের প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রে পরিবার বাস্তবতা নয় আবেগ দিয়ে ভাববে। ফলে অনুমতি প্রদান নাও করতে পারে, এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে।

১৪ নম্বরে আছে, ‘একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে সর্বোচ্চ ১০ (দশ) বছর থাকতে পারবেন, এজন্য সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদসমূহের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।‘ বিশ্বের অনেক দেশেই এই নিয়ম রয়েছে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিষয়টি নতুন, ফলে কেন ১০ বছরের বেশি থাকতে পারবে না, থাকলে কী সমস্যা তা জনগণের কাছে স্পষ্ট করে তুলে না ধরলে জনগণ এই মতের পক্ষে হ্যাঁ ভোট দেবে কীসের ভিত্তিতে? যেখানে বাংলাদেশে পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি বিদ্যমান।

১৬ নম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার (৩)-এ বলা,  ‘মেয়াদ অবসানের ক্ষেত্রে সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ৩০ (ত্রিশ) দিন পূর্বে আইনসভার নিম্নকক্ষের স্পিকারের তত্ত্বাবধানে এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনায় (১) প্রধানমন্ত্রী, (২) বিরোধীদলীয় নেতা, (৩) স্পিকার, (৪) ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলের) এবং (৫) সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি (যদি সংসদে আসন সংখ্যার বিবেচনায় একাধিক দল দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের অবস্থানে থাকে তাহলে সেসব দলের মধ্য থেকে নির্বাচনে সর্বোচ্চ পরিমাণে ভোটপ্রাপ্ত দলটিই দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে বিবেচিত হবে) মোট ৫ (পাঁচ) সদস্য সমন্বয়ে একটি ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই কমিটি’ গঠিত হবে। যেখানে সরকার পক্ষের দুই জন ও বিরোধীদলের দুই জন এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের ১ জন সদস্য হলে ক্ষমতা একই হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে জনগণের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা দল কি তা মেনে নেবে?

১৭ নম্বর পয়েন্টটি আইনসভা নিয়ে। এখানে নিম্ন ও উচ্চকক্ষ নিয়ে আইনসভা গঠনের কথা বলা হয়েছে। ১৮ নম্বরের (ক)-এ পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের গঠন, (খ)-এ মেয়াদের উল্লেখ রয়েছে। তবে গণভোটের প্রচারণায় নেই বিস্তারিত আলোচনা। পিআর পদ্ধতি আসলে কী? এর সুবিধা অসুবিধা বা ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক কী? জনগণ কি পিআর পদ্ধতি চায়? বিএনপিসহ ৭টি রাজনৈতিক দল এই পয়েন্টে দ্বিমত প্রকাশ করেছে। এবং এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা বাংলাদেশের বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থা এককক্ষবিশিষ্ট, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হলে পুরো কাঠামোই পরিবর্তন হয়ে যাবে। আর উচ্চকক্ষ গঠিত হলে অনেক নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রণয়নের সাথে উচ্চকক্ষ জড়িত থাকবে। অথচ অতি গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে নেই স্পষ্ট আলোচনা, বিতর্কের ব্যবস্থা, যা জনগণকে বুঝতে ও ভোট দিতে সাহায্য করতে পারে।

(গ)-এ বলা আছে রাজনৈতিক দলগুলো নিম্নকক্ষের সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের সময় একই সঙ্গে উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে। উচ্চকক্ষের তালিকায় কমপক্ষে ১০ (দশ) শতাংশ নারী প্রার্থী থাকতে হবে। ৩০০ সংসদীয় আসনের জন্য দলগুলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করলেও উচ্চকক্ষের তালিকা কোন দল এখন অব্দি প্রকাশ করেনি। এবং ১০ শতাংশ নারী প্রার্থীর বিষয়ে লক্ষণীয়, জাতীয় নির্বাচনের ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী রাখার বিষয়টিই কোনও রাজনৈতিক দল পালন করেনি।

১৯ নম্বর পয়েন্টে বলা হয়েছে, ‘উচ্চকক্ষ নিম্নোক্ত দায়িত্বসমূহ পালন করবে: (ক) নিম্নকক্ষের প্রস্তাবিত আইন প্রণয়নের বিষয়টি পর্যালোচনা করবে। উচ্চকক্ষের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থাকবে না; তবে কোনও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইন প্রণয়নের জন্য নিম্নকক্ষ বরাবর প্রস্তাব করতে পারবে। নিম্নকক্ষে পাসকৃত অর্থবিল এবং আস্থা ভোট ব্যতীত সকল বিল উচ্চকক্ষে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত হতে হবে। উচ্চকক্ষ কোনও বিল স্থায়ীভাবে আটকে রাখতে পারবে না। উচ্চকক্ষ কোনও বিল সর্বোচ্চ ২ (দুই) মাসের বেশি আটকে রাখলে তা উচ্চকক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত বলে বিবেচিত হবে।‘ অর্থাৎ আইন প্রণয়নের ক্ষমতা না থাকলেও খারিজ করার ক্ষমতা থাকবে।

(খ) যদি উচ্চকক্ষ কোনও বিল অনুমোদন করে সেক্ষেত্রে উভয় কক্ষ কর্তৃক পাসকৃত বিল রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতি সম্মতি না দিলে কী হবে?

(গ) যেক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ সংশোধনের সুপারিশসহ বিল পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্নকক্ষে পাঠাবে সেক্ষেত্রে নিম্নকক্ষ উচ্চকক্ষের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। নিম্নকক্ষের যদি উচ্চকক্ষের সুপারিশ মানার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা না থাকে, তবে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা কী?

(ঘ) উচ্চকক্ষ থেকে ফেরত পাঠানো বিল যদি নিম্নকক্ষের অধিবেশনে আবারও পাস হয়, তবে উচ্চকক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য প্রেরিত হবে। যদি এই হয় নিয়ম তবে উচ্চকক্ষের ক্ষমতা কোথায়?

(ঙ) সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত যেকোনও বিল উচ্চকক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করতে হবে। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তনের মতো জাতীয় ইস্যুতেই গণভোট হবার কথা। যদি মুষ্টিমেয় লোকের হাতেই সে ক্ষমতা থাকে তবে এই গণভোট কি কেবল মুষ্টিমেয় লোকের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া মাত্র? এত এত প্রশ্নের উত্তর জানা নেই সাধারণ মানুষের।

২০ নম্বর পয়েন্টে আছে উচ্চকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা হবে নিম্নকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতার অনুরূপ। কিন্তু কী সেই যোগ্যতা? অতীতে সংসদ সদস্যদের মধ্যে জনগণ দেখেছে অশিক্ষিত, রুচিহীন, দুর্নীতিগ্রস্ত অনেক সদস্য।

২১ নম্বরে জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ক্রমান্বয়ে ১০০ আসনে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু পরিষ্কার নয় সেই আসন সংরক্ষিত না নির্বাচিত।

২২-এর (খ)-এ বলা হয়েছে সংসদীয় আসনের জন্য প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলগুলো ন্যূনতম ৫ (পাঁচ) শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিবে, তবে এটি সংবিধানে উল্লেখ করা হবে না। যে প্রতিশ্রুতি ইতোমধ্যে ভঙ্গ করেছে দলগুলো। তার ওপর সংবিধানে উল্লেখ কেন করা হবে না? যদি নাই হয় তবে সংবিধান সংস্কার অংশে কেন যুক্ত করা হয়েছে?

(গ) পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো ন্যূনতম ১০ (দশ) শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। মজার বিষয় হচ্ছে কয়েকটি ইসলামী দল রাজি না হলেও বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামী সম্মতি জানিয়েছে। ১০ শতাংশ তো দূরের বিষয়, এবারের নির্বাচনে তাদের দলের নারী প্রার্থীর সংখ্যা শূন্য। যেহেতু জুলাই সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার সাপেক্ষে করা, সেহেতু কথা ও কাজের এই দ্বিচারিতা জুলাই সনদের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

(ঘ) এই পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩৩ (তেত্রিশ) শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ (পাঁচ) শতাংশ বর্ধিত হারে নারী প্রার্থী মনোনয়ন অব্যাহত রাখবে। এই পয়েন্টে ৪টি দল একমত নয়। এবং অবাক করা বিষয় হচ্ছে জুলাই সনদ যাদের হাত ধরে তৈরি হয়েছে সেই এনসিপি এই প্রস্তাবে রাজি নয়।

২৩ ও ২৪ নম্বর পয়েন্টে ডেপুটি স্পিকার, জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যগণ দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া, জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে। এতগুলো পদ বিরোধী দলের অধীন হলে সুবিধা কী? কোন নেতিবাচক দিক আছে কিনা? পদগুলোর ক্ষমতা, এখতিয়ার, কাজ সাধারণ মানুষ কি জানেন?

২৮-এ রয়েছে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৫-এর বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করবেন। বর্তমান পদ্ধতির সমস্যা নতুন পদ্ধতির সুবিধা সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা প্রয়োজন।

৩১ ও ৩২-এ আছে, সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন (Judicial Appointment Commission-JAC) গঠন করা হবে। এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক নিয়োগ কমিশন সংক্রান্ত বিধানকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে দুই ক্ষেত্রেই বিএনপি সংবিধানে যুক্ত করার বিরোধিতা করে আইন প্রণয়নের কথা বলেছে। দুটোর মধ্যে তফাৎ ও সুবিধা-অসুবিধা না বুঝতে পারলে জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে কীভাবে?

৩৩-এ বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হবে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে কোনও দ্বিমত কোনও নাগরিকেরই থাকার কথা নয়, কিন্তু যে বিষয়টি বিদ্যমান রয়েছে তার উল্লেখের প্রয়োজনীয়তা বোধগম্য না। বিষয়টি কি সূক্ষ্মভাবে ম্যানিপুলেশনের নিমিত্তে করা? জনগণকে বিভ্রান্ত করা যে আইনত বিচার বিভাগ স্বাধীন নয়, যা জনগণকে ভুল বোঝানোর শামিল।

৩৪-এ বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। এই বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা ও সুবিধা নিয়ে আলোচনা নেই। বিকেন্দ্রীকরণের যেমন কিছু সুবিধা আছে, আছে অসুবিধাও।

৩৫-এ বলেছে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬-এ বর্ণিত সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা ও এর এখতিয়ার বৃদ্ধি করা হবে। শক্তিশালী বলতে কী বোঝানো হয়েছে? এখতিয়ারই বা কতটুকু বৃদ্ধি করা হবে? সুফল কী? নেতিবাচক কোন দিক কি আছে? ৩৭-এ স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের কথা বলা আছে। এই যে বিচার বিভাগের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের এত সংস্কারের পক্ষে যদি ভোট দিতে হয় তবে সাধারণ মানুষকে জানতে হবে সম্পূর্ণ, বুঝতে হবে যদি, কিন্তু ছাড়াই।

৩৯ নম্বর পয়েন্টে বলা হয়েছে ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগের কথা। ন্যায়পাল কী, এর কাজ, প্রয়োজনীয়তা, ন্যায়পালের হওয়ার যোগ্যতাই বা কী? অধিকাংশ জনগণের সে বিষয়ে ধারণা নেই। ৩৯-এর (ঘ)তে বলা আছে, ন্যায়পালের যোগ্যতা-অযোগ্যতা, বয়সসীমা, কর্মের শর্তাবলি ও কর্মপরিধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা, পদত্যাগ ও পুনঃনিয়োগ লাভের সুযোগ/অধিকার ইত্যাদি সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ এখনও কিছুই নিশ্চিত নয়। তাহলে কীসের ভিত্তিতে ভোটাররা ন্যায়পালের প্রয়োজনীয়তা বিচার করবে? সরকারি কর্ম কমিশনের ক্ষেত্রেও একইরকম অস্পষ্ট।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান থেকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের কথা। সাধারণ জনগণ কি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মানে এবং পার্থক্য বোঝে? সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলে কি কি সুবিধা বা কোন নেতিবাচক দিক আছে কিনা, না জানলে কোনটা দেশের জন্য ভালো তা বেছে নেবে কী করে?

 

৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭-এ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের বিষয়ে বলা হয়েছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বায়ত্তশাসনের কথা কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনগণের উপলব্ধি কী? বলা হয়েছে, ‘কর্মকর্তা/কর্মচারী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাজে সরাসরি নিয়োজিত, তারা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিদের অধীন হবেন’, এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি হবে কিনা এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হয়েছে কিনা? হলে জনগণের কাছে তা প্রকাশ করাটাও জরুরি। বলা হয়েছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে নিজস্ব তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে। তহবিল কীভাবে, কোন উৎস থেকে সংগ্রহ করবে? বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের বোধগম্য না হলে, জনগণ কি শুধু অন্ধের মতো হ্যাঁ ভোট অনুসরণ করবে?

আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কারের বিষয়সমূহের মধ্যে ৪৮ নম্বরে রয়েছে, ‘সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৮(৫) সংশোধন সাপেক্ষে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংসদের কমিটিসমূহ ও সদস্যদের বিশেষ অধিকার, অধিকারের সীমা এবং দায় নির্ধারণ করা হবে। ‘বর্তমানে কী আছে? আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে না কমানো হচ্ছে? কী সেই সীমা?

৪৯-এ নির্বাচন ব্যবস্থায় বলা হয়েছে, বিশেষায়িত কমিটির মাধ্যমে সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা হবে। বর্তমানে যে সীমানা নির্ধারিত আছে তার পরিবর্তন হলে এক আসনের লোক ভবিষ্যতে অন্য আসনে পড়তে পারে সে ক্ষেত্রে সেই আসনের জনগণের মতামত কী নেওয়া হবে?

বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে ৫১ নম্বরে বলা হয়েছে, সাবেক বিচারপতিদের আচরণবিধি প্রণয়ন করা হবে। কী ধরনের আচরণবিধি তা স্পষ্ট করে উল্লেখ নেই। সেই বিধির মধ্যে কি ব্যক্তিগত বিষয়, জীবনযাপন, বিশ্বাস অন্তর্ভুক্ত? যে নিয়ম চাকরিতে থাকা অবস্থায় প্রযোজ্য ছিল তা চাকরি থেকে অবসর, অব্যাহতির পরও যদি মেনে চলতে হয় তাবে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে।

৫১ নম্বরে বিচার বিভাগের নিজস্ব সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এই সংস্কার যেমন কাজের স্বাধীনতা দেবে তেমনি স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে?

৫৩ নম্বরে একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠনের জন্য আইন প্রণয়ন এবং তা কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এর কাজ, ক্ষমতা, এখতিয়ার, প্রয়োজনীয়তার বিষয় জনগণ কি অবগত?

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাকে অধিদপ্তরে রূপান্তর করার কথা আছে ৫৫ নম্বরে। অধিদফতরে রূপান্তর করলে জনগণ কি বিশেষ সুবিধা পাবে? সংস্থা কেন অনুরূপ কাজ করতে পারছে না?

গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি সংস্কার প্রস্তাব আছে ৬৮ নম্বরে। কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি প্রশাসনিক বিভাগ করার প্রস্তাব রয়েছে। ছোট এই দেশে ইতোমধ্যে ৮টি বিভাগ রয়েছে। আরও দুটি বিভাগের যদি প্রয়োজন থাকে তাহলে এর পেছনের কারণগুলো জনগণকে জানানো দরকার।

পুলিশ সংস্কারের জন্য বেশ কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, স্বাধীন পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। কমিশনে সরকারি দল, বিরোধী দল, বিচার বিভাগ, পুলিশ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ২ জন নারী এবং ১ জন মানবাধিকার কর্মী থাকলেও কোনও সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কাউকে রাখার কথা উল্লেখ নেই।

দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে ৭৭ নম্বরে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ধারা ৭(১) থেকে ৭ (৫) সংশোধন করে প্রস্তাবিত “বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি” দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রম পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন জানুয়ারি ২০২৫-এর সুপারিশ অনুসরণ করা হবে। ২০২৫-এর সুপারিশে কী আছে?

৭৯-তে বলা হয়েছে, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩০৯ সংশোধনপূর্বক এটি নিশ্চিত করতে হবে যে দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক চাহিত কোনও তথ্যাদি বা দলিলাদির ক্ষেত্রে এই ধারা প্রযোজ্য হবে না। ধারাটিতে কী রয়েছে? ৬টি দল একমত নয় কেন?

এবং ৮৪ নম্বরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে Open Government Partnership-এর পক্ষভুক্ত হতে হবে। ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা কী?

সংস্কার প্রস্তাব সংখ্যায় অনেক। সাধারণ মানুষের পক্ষে এতগুলো পয়েন্ট পড়া, মনে রাখা বা সেগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা প্রায় অসম্ভব। এর আইনি ও প্রশাসনিক ভাষা সাধারণের জন্য দুর্বোধ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা চাকরিজীবীরা হয়তো জুলাই সনদ পড়ে প্রস্তাবগুলো বুঝতে পারবে বা বোঝার চেষ্টা করবে, কিন্তু জুলাই সনদেও সবগুলো বিষয়ে সহজ ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশে নানান শ্রেণি পেশার জনগণ রয়েছে। অশিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত, কৃষক, শ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে রাষ্ট্র সংস্কারের এই তাত্ত্বিক দফা তাদের দৈনন্দিন জীবন-সংগ্রামের চেয়ে অনেক দূরের বিষয়। সুতরাং গণভোটের ব্যালটে উল্লেখিত বিষয়ের ভিত্তিতে বা সরকারের অস্পষ্ট প্রচারণায়, হ্যাঁ বা না’র পক্ষ বেছে নেওয়া সাধারণ জনগণের জন্য শুধু দুরূহ নয়, বরং অসম্ভব।

জুলাই জাতীয় সনদ পর্যালোচনা করে আরও কিছু বিষয় সামনে আসে। যেমন, ৮৪টি পয়েন্টে মধ্যে ৩৯টি পয়েন্টে নোট অব ডিসেন্ট নেই। বাকি ৪৫টি পয়েন্টে এক বা একাধিক দলের দ্বিমত আছে। অর্থাৎ ৫৩.৫৭ শতাংশ নোট অব ডিসেন্ট আছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যদিকে ৩৩টি দল ও জোটের উল্লেখ থাকলেও ৩২টি মতামত পাওয়া গেছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয়ে নিজস্ব প্রস্তাব ও মতামত দিয়েছে দলগুলো। জুলাই সনদ আরেকটু স্পষ্ট ও স্বচ্ছ হতে পারতো নোট অব ডিসেন্টগুলোর বিস্তারিত উল্লেখ থাকলে। বিএনপির কয়েকটি ব্যাখ্যা ও প্রস্তাব উল্লেখ থাকলেও সে সংখ্যা নগণ্য। আর অন্য দলগুলোর দ্বিমতের কারণ জানা যায় না।

পুরো জুলাই সনদে নারীদের বিষয়ে সংস্কার বলতে সংসদে প্রার্থী বাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যে প্রতিশ্রুতি ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো ভাঙছে। নারী বিষয়ক আর কোনও সংস্কারের বিষয়ে জুলাই সনদে উল্লেখ নেই। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি নারী সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। জনমনে প্রশ্ন, সেই কমিশনের ইনপুট কী? এমনকি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যের তালিকায়ও নেই কোনও নারীর নাম।

প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে ২০ জানুয়ারির ভিডিও বার্তায় বলা হয়েছে, হ্যাঁ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ, নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে দেশ। অথচ বৈষম্য, শোষণ, নিপীড়নের সবচেয়ে বেশি শিকার নারী, শিশু, সংখ্যালঘু বিষয়ে উল্লেখ নেই গণভোটের ভিত্তি জুলাই সনদে।

জুলাই জাতীয় সনদে বারবার গণতন্ত্র, মানবাধিকার, জনগণের অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। অভ্যুত্থানের পর থকে কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করলে আক্রমণের শিকার হয়েছে। ধর্ম অবমাননার নামে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। নির্যাতন, নিপীড়ন এমনকি আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। মব সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষকে নির্যাতন, নিপীড়ন, এমনকি হত্যা করা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার হয়েছে নারীরা। কিন্তু অত্যন্ত লজ্জাজনক ও দুঃখজনক হলেও জুলাই জাতীয় সনদে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই।

আরেকটি উল্লেখ্য বিষয়, জুলাই সনদে উল্লেখিত সংস্কার ও পরিবর্তনগুলো সব স্বতন্ত্র নয়। একটির সাথে অন্যটি জড়িত। যেমন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের সাথে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সরকার ও বিরোধীদল এবং প্রধান বিচারপতি জড়িত। ন্যায়পাল, দুদকের প্রধান, মহাহিসাব-নিরীক্ষকের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে একে অন্যের সাথে জড়িত। আর প্রত্যেকটি পদের নির্বাচন পদ্ধতি নির্ভর করছে হ্যাঁ/ না ভোটের ওপর।

জুলাই সনদকে আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে বারবার সংবিধানের অনুচ্ছেদ নম্বরের উল্লেখ করে তা পরিবর্তনের কথা। দেশের অধিকাংশ মানুষ সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদে কী আছে জানে না। সুতরাং জুলাই সনদ পড়েও কি জনগণ তুলনা করতে পারবে কী ছিল আর কী হচ্ছে? গণভোটের ব্যালটে বিষয়গুলো একদম অস্পষ্ট ও অস্বচ্ছ। জুলাই সনদও কি সংস্কার বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিচ্ছে?

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণভোট মানেই হলো কোনও সুনির্দিষ্ট নীতি বা প্রস্তাবের ওপর জনগণের প্রত্যক্ষ রায়। জুলাই সনদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার মাধ্যমে ৮৪টি প্রস্তাবকে একবারে বৈধতা দেওয়ার একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ নাগরিকরা এই ৮৪টি দফার খুঁটিনাটি কতটুকু জানেন? সরকার কেবল ‘প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল সীমাবদ্ধ করা’ বা ‘নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন’-এর মতো আকর্ষণীয় কিছু বিষয় সামনে আনছে। অথচ বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ কিংবা আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতির মতো জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে জনমনে অস্পষ্টতা রয়েই গেছে।

গণভোটের ব্যালটে ৪টি পয়েন্টের আড়ালে ৮৪টি বিষয়কে সংযুক্ত করা অনেকটা ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ বা সাদা কাগজে সই নেওয়ার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণ যদি কেবল ১-২টি বিষয়ের মোহে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয় এবং পরে যদি ৮৪ দফার কোনও একটি বিতর্কিত ধারা দেশের জন্য সংকট তৈরি করে, তবে সেই দায়ভার কে নেবে? সংস্কার হওয়া উচিত সর্বজনীন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক।

সরকারের উচিত কেবল সিলেক্টিভ প্রচারণা বন্ধ করে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র বা নির্দেশিকা সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়া। প্রতিটি প্রস্তাবের সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে বিতর্ক আয়োজন করা। জুলাই বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী ত্যাগের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বৈরাচারের পতন এবং রাষ্ট্র মেরামত। সেই সংস্কার যদি স্বচ্ছতার অভাবে বিতর্কিত হয়, তবে তা বিপ্লবের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হবে। গণভোট সফল করতে হলে জনগণকে কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে, তাদের প্রতিটি প্রস্তাব সম্পর্কে অবহিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। তথ্য গোপন বা খণ্ডিত তথ্য প্রদান প্রকৃত গণতন্ত্রের সহায়ক নয়।

লেখক: সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী

 

সর্বশেষ

র‌্যাবের নতুন নাম এসআইএফ

এই বিভাগের আরও