বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র কি চাইলেই কাউকে তুলে নিয়ে যেতে পারে

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২ (৪) অনুযায়ী, অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ বা হুমকি নিষিদ্ধ। ফলে আপাত দৃষ্টিতে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল।

- Advertisement -

তবে এই আইনেরও ব্যতিক্রম আছে। আত্মরক্ষার যুক্তিতে অথবা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন থাকলে স্বাধীন দেশের ভূখণ্ডে দ্বিতীয় কোনো দেশ অভিযান চালাতে পারবে। কিন্তু কাউকে তুলে নিয়ে বিচারের মুখোমুখি করতে পারবে কি না সেটির আইনি দিক বেশ জটিল।

- Advertisement -shukee

অর্থ্যাৎ, আইনি দিক থেকে ব্যাখ্যা করতে চাইলে এখানে দুটি বিষয় সামনে আসছে। একটি বিদেশের ভূখণ্ডে হামলা অন্যটি ভিন্ন দেশ থেকে কাউকে তুলে আনা। শুরুতে হামলা ও এর পেছনে আত্মরক্ষার মার্কিন যুক্তির দিকে নজর দেয়া যাক।

যুক্তি প্রতিষ্ঠা করেছে যেভাবে

বিগত মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র যখন ক্যারিবিয়ান সাগরে ছোট ছোট নৌকায় হামলা করছিল তখন দাবি করা হয়েছিল, সেগুলোতে ভেনেজুয়েলা থেকে আসা মাদক আছে। প্রতিটি নৌকায় হামলার পরই ডোনাল্ড ট্রাম্প সামনে এনেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মাদক সেবনে মৃত্যুর প্রসঙ্গ। তিনি প্রায়ই বলেছেন, এসব মাদক মার্কিন নাগরিকদের ধ্বংস করছে, যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করছে।

কিন্তু মাদক সেবনে কতসংখ্যক মার্কিন নাগরিক মারা যায় সে সংখ্যা নিয়ে ট্রাম্প কখনো স্পষ্ট তথ্য দেননি। এ নিয়ে দুই বছর আগের তথ্য পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ড্রাগ অ্যাবিউজ নামের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ২০১৯ থেকে ২৩ সাল পর্যন্ত কোকেনের কারণে মারা গেছে ২৯ হাজার ৪৪৯ জন। আরেকটি সরকারি ওয়েবসাইট ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ স্ট্যাটিসটিকস মরটালিটি ডেটা’ অনুযায়ী, ফ্যান্টানিল সেবনে ২০২৩ সালে মারা যায় ৭২ হাজার। আর ২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৭ হাজারের বেশি।

এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, মাদুরোর ওপর মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হলে তা অনেকাংশেই আগ্রাসনের ক্ষেত্রে সাধারণ মার্কিনীদের আবেগীয় বৈধতা পাবে। আবার মাদুরোকে উৎখাতের ক্ষেত্রে শক্তিশালী অভিযোগ হিসেবেও এটিকে দাঁড় করানো যাবে। করা যাবে বিচারে মুখোমুখি।

শনিবার তুলে আনার পর মাদুরোকে ঠিক মাদক চোরাচালানের অভিযোগেই গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

তুলে আনার আইনি দিক

জাতিসংঘের আইনে অন্য দেশে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ হলেও যুক্তরাষ্ট্রকে এটি মানানোর ক্ষেত্রে জটিলতা আছে। যা তৈরি হয়েছে মার্কিন সংবিধানের কারণে।

নিউইয়র্ক টাইমস তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদন দিলে সেটি দেশেরও আইনের অংশ হবে। অর্থ্যাৎ, প্রেসিডেন্ট তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও আছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে কাজ করা আইনজীবীদের মতে, সংবিধান কখনো কখনো প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বিদেশে বলপ্রয়োগের ক্ষমতা দেয়। উদাহরণ হিসেবে তারা ১৯৮৯ সালে পানামায় সামরিক হস্তক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।

ওই অভিযান প্রসঙ্গে মার্কিন বিচার বিভাগের অফিস অব লিগ্যাল কাউন্সেল (ওএলসি) দাবি করেছে, সাংবিধানিকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিদেশে এফবিআই পাঠিয়ে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত কোনো পলাতককে গ্রেপ্তার করানোর ক্ষমতা আছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হলেও এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে। টাইমস বলছে, মার্কিন আইনবিশেষজ্ঞদের মাঝে এমন যুক্তি নিয়ে বেশ সমালোচনা আছে।

নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকেই মাদক চোরাচালানের অভিযোগ আছে। তাঁকে ধরিয়ে দিলে ৫ কোটি ডলার পুরস্কার দেওয়া সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনও প্রকাশ করেছিল মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট।

মাদকের অভিযোগ কতটা বাস্তব

যুক্তরাষ্ট্র, কলম্বিয়া এবং জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, কোকেনের বড় অংশ উৎপাদিত হয় লাতিন আমেরিকার তিনটি দেশে- কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়ায়। কোকেন কখনো কখনো ফেন্টানিলের সঙ্গে মেশানো হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলা ফেন্টানিল সরবরাহ করে না।

আটকের পর নিকোলাস মাদুরোকে হস্তান্তর করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) এর কাছে। এই সংস্থাটির ২০১৯ সালের তথ্যের বরাত দিয়ে গত অক্টোবরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল নিউইয়র্ক টাইমস। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ক্যারিবিয়ান সাগর নয় কোকেন পাচায় হয় প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে- ৭৪ শতাংশ।

এই সরবরাহ পথ বুঝতে মানচিত্রে নজর দেওয়া যাক। প্রশান্ত মহাসগারীয় উপকূলের দেশ হলো কলোম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়া। এর মধ্যে কলম্বিয়ার একটি অংশ আবার ক্যারিবিয়ান সাগর উপকূলেও পড়েছে। এই সাগর পথে তারা কোকেন পাচার করে ১৬ শতাংশ। ভেনেজুয়েলা কলম্বিয়ার প্রতিবেশী। দেশটি থেকে কী পরিমাণ কোকেন পাচার হয় সে তথ্য নেই। নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়া থেকে কোকেন মেক্সিকোতে যায়। এরপর সেখান থেকে স্থলপথে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকে।

অপরদিকে ফেন্টানিল পাচারে ভেনেজুয়েলা কোনো ভূমিকাই রাখে না। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, বিচার বিভাগ এবং কংগ্রেসিয়নাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, এই মাদকের বড় অংশ তৈরি হয় মেক্সিকোতে। যার রাসায়নিক উপকরণ আসে এশিয়ার দেশগুলো থেকে বিশেষ করে চীন।

ফলে মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ এবং এর বিপরীতে জনসাধারণের আওতায় থাকা প্রকাশিত তথ্যের বেশ অমিল আছে।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও