প্রতিনিয়ত ভয়-আতঙ্কে স্থবির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) সংলগ্ন জোবরা গ্রাম। পুরুষেরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। গ্রামটি হয়ে পড়েছে প্রায় ‘পুরুষশূন্য’। গ্রামের রাস্তাঘাটে কেবল নারীর দেখা মিলছে। তবে তারাও ভয়ে ভরসাহীন দিন কাটাচ্ছেন। রাতের আঁধারে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রতিরোধ করার মতো কাউকে পাওয়া যাবে না— এমন আতঙ্কে দিন গুনছেন সবাই।
এমন অবস্থায় পরিস্থিতি শান্ত করতে গতকাল ওই এলাকা পরিদর্শন করেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মুমিন। দীর্ঘদিন ধরে গ্রামবাসী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করলেও সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় অশান্তি দেখা দিয়েছে। প্রশাসন উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জোবরা এলাকা প্রায় পুরুষশূন্য। স্থানীয় নারীরা জানান, রাতে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রতিরোধ করার মতো কেউ নেই। ফলে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এদিকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব নাছির উদ্দিন মুনির বলেন, ‘জোবরা গ্রামবাসী তাদের জায়গা-জমি বিসর্জন দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। তখন থেকে গ্রামবাসী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল-যা নব্বইয়ের দশকে ছাত্র থাকাকালে দেখেছি।’
একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষে অত্যন্ত মর্মাহত হেফাজতের এই নেতা।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নাছির উদ্দিন বলেন, ‘ঘটনার সঠিক তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করতে হবে। পাশাপাশি গ্রামবাসীর ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং আহত শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।’
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একাডেমিক ও সামাজিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। গ্রামবাসী ও শিক্ষার্থীরা যেন মিলেমিশে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রশাসন কাজ করছে।
ইউএনওর পরিদর্শনকালে আরো উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদ, ফতেপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মুছা সিদ্দিকী, ২ নম্বর ইউপি সদস্য আব্দুল কাদের, মো. আবুল বশর বাবুল, আনন্দ বিকাশ বড়ুয়া, মো. মোজাহের ও লোকমান চৌধুরী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষের ঘটনায় এক হাজার ব্যক্তির নামে থানায় মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। মামলায় সুনির্দিষ্ট ৯৮ জন এবং অজ্ঞাতনামা ৮০০ থেকে ১ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে।
চবির সংঘর্ষ তদন্তে ৭ সদস্যের কমিটি : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মাঝে সংঘর্ষের ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, দোষীদের চিহ্নিতকরণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ৫৬৩তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় এ কমিটি গঠন করা হয়। এর আগে উপাচার্যের আহ্বানে বিকাল ৩টায় জরুরি এই সিন্ডিকেট সভা শুরু হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শেষ হয়। সভা শেষে রাত ৮টায় গৃহীত সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের জানান রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৈয়ব চৌধুরীকে। সদস্য সচিব হিসাবে রাখা হয়েছে গোপনীয় শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রশাসন) সৈয়দ ফজলুল করিমকে। এছাড়া কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন-পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজাউল আজিম, ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মুহাম্মদ শামসুল হুদা, চবি নিরাপত্তা দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমান উল্লাহ, সহকারী প্রক্টর সাইদ বিন কামাল চৌধুরী, ছাত্রছাত্রী পরামর্শ ও নির্দেশনা সহকারী পরিচালক তাহমিদা খানম।
প্রসঙ্গত, গত ৩০ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকার ভাড়া বাসায় এক নারী শিক্ষার্থীর প্রবেশকে কেন্দ্র করে হেনস্তার ঘটনায় শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পরদিন ৩১ আগস্ট এ সংঘর্ষ আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। এতে আহত হন প্রোভিসি, প্রক্টরসহ কয়েকশ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

