Wednesday, 7 October 2026

[the_ad id='15178']

চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের সাবেক সভাপতি ও হিসাব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

মোহাম্মদ ইউসুফ

চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরী ও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো.বেলাল উদ্দীনের বিরুদ্ধে দুই কোটি আটত্রিশ লাখ পঁচানব্বই হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বেলা ১১ টায় দুর্নীতি দমন কমিশন,জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১ এর উপসহকারী পরিচালক সবুজ হোসেন এজাহার দাখিল করেন। আসামীরা অসৎ উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজসে দুর্নীতি,প্রতারণা ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে বরাদ্দকৃত সরকারি অনুদানের ২ কোটি ২১,লাখা টাকা ও অন্যান্য অনুদানের ১৭ লাখ ৯৫হাজার টাকাসহ মোট ২ কোটি ৩৮ লাখ, ৯৫হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অপরাধ করেছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে বরাদ্দকৃত অনুদানের টাকা বেতন-ভাতা খাতে সহায়তা, এমএসআর, পণ্য ও সেবা বাবদ, গরীব রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান ও অন্যান্য খাতে ব্যয় করার শর্ত থাকলেও জাহাঙ্গীর চৌধুরী মঞ্জুরীকৃত খাতে ব্যয়ের পরিবর্তে অনুদানের এই টাকা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসেবে স্থানান্তরপূর্বক আত্মসাৎ করেন। এজাহারে আরও বলা হয়, ১ নম্বর আসামী মো. জাহাঙ্গীর চৌধুরী ও সমিতির কোষাধ্যক্ষ মো. শাহাব উদ্দিন ব্যাংকে এই হিসাবটি পরিচালনা করতেন। ২০২১ সালের ২৩ এপ্রিল কোষাধ্যক্ষ শাহাব উদ্দীন মৃত্যুবরণ করলে এবং পরবর্তী কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই হিসাবের সমস্ত লেনদেন বন্ধ থাকার কথা থাকলেও এ হিসাব থেকে জাহাঙ্গীর চৌধুরী মৃত কোষাধ্যক্ষ শাহাব উদ্দীনের স্বাক্ষর করা চেক ব্যবহার করে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে প্রদত্ত অনুদানের ২ কোটি ৩৮ লাখ, ৯৫হাজার টাকা তার ব্যক্তিগত হিসাব, যা বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড, আগ্রাবাদ শাখায় স্থানান্তর ও উত্তোলনপূর্বক আত্মসাৎ করেন। এছাড়া ১ নম্বর আসামী জাহাঙ্গীর চৌধুরী সরকারি অনুদানের টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে একক সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতায় সমিতির নির্বাহী কমিটির অনুমোদন না নিয়ে ও মিথ্যা কার্যবিবরণী তৈরি চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা ২ নম্বর আসামী মো. বেলাল উদ্দীনের সাথে পরস্পর যোগসাজশে মো. বেলাল উদ্দীনকে বায়নানামা গ্রহীতা ও নিজেকে বায়নানামা দাতা দেখিয়ে জমি বিক্রির অনিবন্ধিত বায়না দলিল সৃজন করে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে বরাদ্দকৃত সরকারি অনুদানের ২ কোটি ২১লাখ  টাকা ও সিডিবি প্রকল্পের নামে ১৭ লাখ ৯৫হাজার  টাকাসহ সর্বমোট ২কোটি ৩৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা তার ব্যক্তিগত হিসেবে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেন।
উল্লেখ্য,শুধু স্বাস্থ্য বিভাগ নয়, জাহাঙ্গীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান,ব্যক্তিগত দান-অনুদানসহ জাকাত-ফিতরার টাকা আত্মসাতের অভিয়োগ রয়েছে। সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড,আন্দরকিল্লা শাখায় চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের নামে হিসাব খুলে জাহাঙ্গীর চৌধুরী নিজেই পরিচালনা করতেন-যা সংগঠনের গঠনতন্ত্রপরিপন্থী ও বেআইনী। এ হিসেবে নামে-বেনামে হাসপাতালের অনুকূলে যত টাকা আসে,সব টাকা তিনি উত্তোলন করে পকেটে ঢুকিয়েছেন। ২০১৫ সালে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের জন্যে হাসপাতাল হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করে তা আর পরিশোধ করেননি। তিনি আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড এর ও আর নিজাম রোড শাখায় কর্মকর্তা-কর্মচারিদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা বেআইনিভাবে উত্তোলন করে কমার্স ব্যাংক থেকে নেয়া তার ব্যক্তিগত ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেন-যা এখনো পরিশোধ করেননি। ২০১৯-২০ রোটারিবর্ষে রোটারি ক্লাব অব চিটাগং ইস্ট থেকে জাহাঙ্গীর চৌধুরী রোটারি ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিক্ট ৩২৮২ এর গভর্নর পদে নির্বাচন করার সময় হাসপাতাল ফান্ড থেকে অবৈধভাবে প্রায় ২কোটি ৫০লাখ টাকা ব্যয় করেন-যা এখনও ফেরত দেননি। অন্যদিকে তিনি বায়ো-ট্রেড নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে অবৈধ লেনদেনে লিপ্ত হয়ে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের টাকা লোপাট করেছেন। ইটিটি মেশিন কেনার নামে হাসপাতাল তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলন করা হলেও মেশিন কেনা হয়নি; চালু করা হয়নি ইটিটি বিভাগ। জাহাঙ্গীর চৌধুরী এলইডি টিভি ও ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা-সফটওয়্যার বাণিজ্যও করেছেন। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম আইন কলেজের অধ্যক্ষ পদ পাকাপোক্ত করতে তিনি হাসপাতাল তহবিলের টাকায় আইন কলেজের শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্যে ট্রাস্ট সীট করে দেন। হাসপাতালটিতে কেনাকাটা থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত কোনো কাজে দরপত্র আহবান করা হয়নি। হাসপাতালের একটি ৬তলা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। হাসপাতাল পরিচালনা পর্ষদের (পকেট কমিটি) সহ-সভাপতি এস এম শওকত হোসেনকে এ নির্মাণপ্রকল্পের প্রধান করে বহুতল ভবন তৈরির কাজ শুরু করা হয়। সিডিএ’র অনুমতি না নিয়ে ৬তলার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে ৬তলা ঢালাইয়ের যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি সিডিএ’র সংশ্লিস্ট বিভাগ অবহিত হয়ে ১৯নভেম্বর ২০২২ নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে;এখনো কাজ শুরু হয়নি। হাসপাতাল তহবিল থেকে দেড়-দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ভবননির্মাণ করা হলেও হাসপাতালের কোনো কাজে আসছে না, এক্ষেত্রেও রয়েছে দুর্নীতি। জাহাঙ্গীর চৌধুরী ঢাকা বারডেম হাসপাতাল ও অন্যান্য দাতাসংস্থা থেকে প্রাপ্ত জীবন রক্ষাকারী ইনসুলিন নিজের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ ও বিভিন্ন ফার্মেসীতে বিক্রি করে দিতেন। তার পরিবারের সদস্যরাসহ আত্মীয়স্বজন বিনামূল্যে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিতো। Novo Nordisk কোম্পানি প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ হাসপাতালের রোগীদের HbA1c টেস্ট করতে প্রতিমাসে ৭/৮লাখ টাকা অনুদান দিত,তা-ও নয়-ছয় করা হয়েছে। ২৮জুন ২০২১ জনতা ব্যাংক লিমিটেড ও ইউসিবিএল, খাতুনগঞ্জ শাখা কর্তৃক দায়েরকৃত অর্থঋণ মামলায় চট্টগ্রামের চকবাজার থানা পুলিশ জাহাঙ্গীর চৌধুরীকে গ্রেফতার করে। থানা থেকে নিজেকে ছাড়ানোর কথা বলে একইদিনে হাসপাতালের হিসাব থেকে ৩৯লাখ টাকা উত্তোলন করেি নেয়-যা এখনও পরিশোধ করেননি। এছাড়া ইনস্যুলিন ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ কর্মচারিদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৪ কোটি টাকা, জাকাত-ফিতরার টাকা, সরকারি-সেরকারি দান-অনুদান ও জীবন সদস্যদের কাছ থেকে নেয়া সদস্য ফি (১০ হাজার টাকা) লোপাট করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার অনিয়ম-দুনীতি নিয়ে যারা উচ্চবাচ্য করেছেন,তাদের চাকরি খোয়াতে হয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ৪৩জন চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারিকে তিনি জোরপূর্বক পদত্যাগে ও বেআইনিভাবে চাকরি থেকে অবসরে যেতে বাধ্য করেছেন।

- Advertisement -

জাহাঙ্গীর চৌধুরী ২০০১ সালে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর উদ্দিনকে হটিয়ে ওই পদে আসীন হন। গঠনতন্ত্রে নিজের সুবিধামতো সংশোধনী এনে ২০০২ সাল থেকে সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি পদে বহাল থেকে একক সিদ্ধান্তে হাসপাতালের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতাল পরিণত হয়েছিল “জাহাঙ্গীর হাসপাতাল”-এ। আয়-ব্যয়ে ছিল না কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। গঠনতন্ত্রের ১২ (ঘ) ধারা মোতাবেক ব্যাংক হিসাব- যা সমিতির নামে কোষাধ্যক্ষ সমিতির যাবতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করার কথা। ১৭ (গ) ধারা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব-যা সমিতির নামে কোষাধ্যক্ষ নিজে এবং সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে যে-কোনো একজনসহ দুজনের যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হওয়ার নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। তিনি নিজেই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ এর সব দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কোষাধ্যক্ষের বাসায় গিয়ে ‘ব্ল্যাংক চেক’-এ স্বাক্ষর নিয়ে আসা হতো। তার অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে পত্রপত্রিকায় বহু লেখালেখি হয়েছে; হাসপাতাল কর্মচারিরা তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রেসক্লাব ও ডায়াবেটিক হাসপাতালের সামনে মানরবন্ধন,সভা-সমাবেশ করেছেন এবং তার প্রতিকৃতিতে জুতোপেটা ও থুথু নিক্ষেপ করেছেন। সরকারি দুই সংস্থার তদন্তে দুনীতি প্রমাণিত হওয়ার পরও আদালতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি নিজেকে বাঁচানোর অপচেষ্টায় আছেন। সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁর বাণী অনলাইন নিউজপোর্টালে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।দুর্নীতি নিয়ে নিউজ করায় জাহাঙ্গীর চৌধুরী চাটগাঁর বাণীর প্রধান-সম্পাদক এবং সম্পাদকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম সাইবার ক্রাইম আদালতে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু তার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার মামলা খারিজ করে দেয় আদালত।
লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও