চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক কমিটি পুর্নগঠন করেছে। কমিটির মেয়াদ ৯০দিন (৮সেপ্টেম্বর থেকে ৭ডিসেম্বর ২০২৬। কমিটির আহবায়ক চট্টগ্রামের সাবেক সিভিল সার্জন ডা.খুরশিদ জামিল চৌধুরী। সদস্যরা হলেন-চট্টগ্রাম ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড হেলথ্ সাইন্স এর নাক-কান-গলা বিভাগের প্রফেসর ডা.মো.আব্বাস উদ্দিন,চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মফিজুল হক ভূঁইয়া, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক ও পূর্বনাসিরাবাদ নিবাসী ডা.গোলাম কাদের চৌধুরী নোভেল।
চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিধদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম ফারুকের ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে নতুন এ তত্ত্বাবধায়ক কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়টি জানা যায়। পরিপত্রে নতুন তত্ত্বাবধায়ক কমিটির যে কার্যপরিধির কথা বলা হয়েছে, তা হলো- ক. ১৯৬১ সালের স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ,এতদসংক্রান্ত বিধি ১৯৬২ এবং অনুমোদিত গঠনতন্ত্র মোতাবেক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। খ. তত্ত্বাবধায়ক কমিটি কার্যকরী কমিটির ন্যায় কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।গ.তত্ত্বাবধায়ক কমিটি এ আদেশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে অনতিবিলম্বে গঠনতন্ত্র অনুসারে নবনির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্বভার হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং ঘ.তত্ত্বাবধায়ক কমিটি এ আদেশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৯০ (নব্বই)দিনের মধ্যে গঠনতন্ত্র অনুসারে নবনির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।


এর আগে ডায়াবেটিক হাসপাতাল পরিচালনায় বৈধ কোনো কমিটি না থাকায় ১৬ জুন ২০২৫ তারিখে চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তৎকালীন উপ-পরিচালক মো.ফরিদুল আলম প্রচলিত আইন অনুযায়ী পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটির আহবায়ক বা প্রধান ছিলেন চট্টগ্রাম অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক। সদস্যসচিব-চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক উর্বশী দেওয়ান। সদস্যরা ছিলেন- চট্টগ্রাম ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা.তৌহিদুল আনোয়ার,সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.মো.জসিম উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম শহর সমাজেসেবা কার্যালয়-৩ এর সমাজসেবা অফিসার আশরাফ উদ্দিন। ২০২৫ সালের ২২ জুন থেকে তত্ত্বাবধায়ক কমিটি হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ওই কমিটি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও তা-ও করা সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির সাবেক বহিস্কৃত দুর্নীতিবাজ সভাপতি,উচ্চআদালতে আইনী লড়াইয়ে হেরে যাওয়া জাহাঙ্গীর চৌধুরী সভাপতি না হয়েও সভাপতি হিসেবে আদালতে তত্ত্বাবধায়ক কমিটির বিরুদ্ধে রীট করায়,নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়াকে আদালতের অবমাননা মনে করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আদালতে রিটকারী জাহাঙ্গীর চৌধুরী যে ভুয়া,চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির যে তিনি কেউ নন,তা জেনেও তত্ত্বাবধায়ক কমিটি কেন তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি,তা বোধগম্য নয়। অথচ হাসপাতালসংক্রান্ত কোনো আইনী জটিলতার উদ্ভব হলে তা নিরসনে তত্ত্বাবধায়ক কমিটিকে বিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ করা এবং হাসপাতাল ফান্ড থেকে যাবতীয় আর্থিক ব্যয় সম্পাদনের ব্যবস্থা করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। অবশ্য ওই কমিটির সদস্যদের সীমাবদ্ধতা ছিল। কমিটির সকলেই সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় তাদের পক্ষে যথাযথভাবে হাসপাতাল পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।
জাহাঙ্গীর চৌধুরী চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির অসংখ্য ভুয়া জীবন সদস্য করেছিল। তার গ্রামের কৃষক-শ্রমিক,চট্টগ্রাম আইন কলেজের ছাত্র-ছাত্রী,তার স্ত্রীর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বন্ধু-বান্ধবকে (স্বামী-স্ত্রীসসহ) টাকা ছাড়াই জীবন সদস্য করেছিল। পূর্বেকার কমিটি এনআইডিসহ ছবিযুক্ত স্বচ্ছ ভোটার তালিকা প্রণয়ন করেছে- যা সত্যিই প্রশংসনীয়। বর্তমান কমিটি যাতে সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখে। জাহাঙ্গীর চৌধুরীর রেখে যাওয়া ঋণ ছিল ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে, তা পরিশোধ করা হয়েছে। সর্বোপরি অনুদানের টাকা দিয়ে জাহাঙ্গীর চৌধুরী কনসালটেন্টদের বেতন দিতো;এমন হিসাব তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে জমা দিতেন। অথচ আহবায়ক কমিটি গত দেড় বছরে অনুদানের টাকা ছাড়াই প্রতিমাসে ৫২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারির বেতন-বোনাস দিয়েছেন। বর্তমানে জাহাঙ্গীর চৌধুরীর অনেক আত্মীয় ও দোসর হাসপাতালে কর্মরত আছে। অতি সম্প্রতি তিনি হাসপাতালের প্রশাসন শাখায় কর্মরত তার অনুগত ব্যক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের প্যাডে স্মারক নম্বর দিয়ে একটি দরখাস্ত চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কাছে পাঠান- যা একটি জঘন্য অপরাধ। অথচ তত্ত্বাবধায়ক কমিটি এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

বর্তমান নতুন তত্ত্বাবধায়ক কমিটির এখন যা করা জরুরি প্রয়োজন,তা হলো-স্বনামধন্য অডিট ফার্ম দিয়ে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতাল তথা সমিতির আর্থিক খাতসমূহ অডিট করা। বিগত ২১ বছর ধরে কোটি কোটি টাকার যেসব অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে তার প্রকৃত চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া। এছাড়া যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ৯০দিনের সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নবনির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা।
চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের বর্তমান এই দৈন্যদশার জন্যে দায়ী জাহাঙ্গীর চৌধুরী। তিনি ছিলেন হাসপাতালের স্বঘোষিত মা-বাপ। জাহাঙ্গীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ,যা দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে ধরা পড়েছে, তা হলো,হাসপাতাল পরিচালনা কমিটিকে না জানিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জায়গা চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের কাছে ১০কোটি টাকায় বিক্রির লক্ষ্যে ৫০লাখ টাকার বায়নানামা দলিল করেছিল। সেখানে জাহাঙ্গির চৌধুরী গ্রহীতা ও হাসপাতালের তৎকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমানউল্লাহকে (যিনি তার ভাতিজা,কর্মচারিদের আন্দোলনের মুখে যার চাকরি চলে যায়) দাতা দেখানো হয়েছে। হাসপাতালের কোষাধ্যক্ষের জাল স্বাক্ষর দেয়া হয় সেই দলিলে। জায়গা বিক্রির নামে ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হলেও ক্রয়-বিক্রির ঘটনা ঘটেনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদকের) তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার জাবেদ আবছার চৌধুরী ছাড়া অন্যরা সবাই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন যে,জাহাঙ্গীর চৌধুরীর অনিয়ম-দুর্নীতি সর্ম্পকে তারা কিছুই জানেন না। হাসপাতালের হিসাববিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ সব পদে আত্মীয়স্বজনকে বসিয়ে তিনি দীর্ঘ ২১ বছর লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।

এদিকে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড,আন্দরকিল্লা শাখায় চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের নামে হিসাব খুলে জাহাঙ্গীর চৌধুরী নিজেই পরিচালনা করতেন-যা সংগঠনের গঠনতন্ত্রপরিপন্থী ও বেআইনী। এ হিসেবে নামে-বেনামে হাসপাতালের অনুকূলে যত টাকা আসে, সব টাকা তিনি উত্তোলন করে করে পকেটে ঢুকিয়েছেন। ২০১৫ সালে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের জন্যে হাসপাতাল হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করে তা আর পরিশোধ করেননি।তিনি এ বি ব্যাংক লিমিটেড এর খুলশী শাখায় কর্মকর্তা-কর্মচারিদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা বেআইনিভাবে উত্তোলন করে কমার্স ব্যাংক থেকে নেয়া তার ব্যক্তিগত ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেন- যা এখনো পরিশোধ করেননি। ২০১৯-২০ রোটারিবর্ষে রোটারি ক্লাব অব চিটাগং ইস্ট থেকে জাহাঙ্গীর চৌধুরী রোটারি ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিক্ট ৩২৮২ এর গভর্নর পদে নির্বাচন করার সময় হাসপাতাল ফান্ড থেকে অবৈধভাবে প্রায় ২কোটি ৫০লাখ টাকা ব্যয় করেন-যা এখনও ফেরত দেননি। অন্যদিকে তিনি বায়ো-ট্রেড নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে অবৈধ লেনদেনে লিপ্ত হয়ে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের টাকা লোপাট করেছেন। হাসপাতালের টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ইটিটি মেশিন কেনার নামে হাসপাতাল তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলন করা হলেও মেশিন কেনা হয়নি; চালু করা হয়নি ইটিটি বিভাগ। জাহাঙ্গীর চৌধুরী এলইডি টিভি ও ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা-সফটওয়্যার বাণিজ্যও করেছেন। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম আইন কলেজের অধ্যক্ষ পদ পাকাপোক্ত করতে তিনি হাসপাতাল তহবিলের টাকায় আইন কলেজের শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্যে ট্রাস্ট সীট করে দেন। হাসপাতালটিতে কেনাকাটা থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত কোনো কাজে দরপত্র আহবান করা হয়নি। হাসপাতালের একটি ৬তলা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। হাসপাতাল পরিচালনা পর্ষদের (পকেট কমিটি) সহ-সভাপতি এস এম শওকত হোসেনকে এ নির্মাণপ্রকল্পের প্রধান করে বহুতল ভবন তৈরির কাজ শুরু করা হয়। সিডিএ’র অনুমতি না নিয়ে ৬তলার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে ৬তলা ঢালাইয়ের যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি সিডিএ’র সংশ্লিষ্ট বিভাগ অবহিত হয়ে ১৯নভেম্বর ২০২২ নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে;এখনো কাজ শুরু হয়নি। হাসপাতাল তহবিল থেকে দেড়-দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ভবননির্মাণ করা হলেও হাসপাতালের কোনো কাজে আসছে না, এক্ষেত্রেও রয়েছে দুর্নীতি। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালে এস এইচ আর শিপিং কোম্পানি ও আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক কর্তৃক দানকৃত দুটি অ্যাম্বুলেন্স ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার হয়। জাহাঙ্গীর চৌধুরী ঢাকা বারডেম হাসপাতাল ও অন্যান্য দাতাসংস্থা থেকে প্রাপ্ত জীবন রক্ষাকারী ইনসুলিন নিজের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ ও বিভিন্ন ফার্মেসীতে বিক্রি করে দিতেন। তার পরিবারের সদস্যরাসহ আত্মীয়স্বজন বিনামূল্যে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিতো। Novo Nordisk কোম্পানি প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ হাসপাতালের রোগীদের HbA1c টেস্ট করতে প্রতিমাসে ৭/৮লাখ টাকা অনুদান দিত,তা-ও নয়-ছয় করা হয়েছে। ২৮জুন ২০২১ জনতা ব্যাংক লিমিটেড ও ইউসিবিএল, খাতুনগঞ্জ শাখা কর্তৃক দায়েরকৃত অর্থঋণ মামলায় চট্টগ্রামের চকবাজার থানা পুলিশ জাহাঙ্গীর চৌধুরীকে গ্রেফতার করে। থানা থেকে নিজেকে ছাড়ানোর কথা বলে একইদিনে হাসপাতালের হিসাব থেকে ৩৯লাখ টাকা উত্তোলন করে নেয়- যা এখনও পরিশোধ করেননি। এছাড়া ইনস্যুলিন ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ কর্মচারিদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৪ কোটি টাকা, জাকাত-ফিতরার টাকা, সরকারি-বেসরকারি দান-অনুদান ও জীবন সদস্যদের কাছ থেকে নেয়া সদস্য ফি (১০ হাজার টাকা) লোপাট করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার অনিয়ম-দুনীতি নিয়ে যারা উচ্চবাচ্য করেছেন, তাদের চাকরি খোয়াতে হয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ৪৩জন চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারিকে তিনি জোরপূর্বক পদত্যাগে ও বেআইনিভাবে চাকরি থেকে অবসরে যেতে বাধ্য করেছেন।

জাহাঙ্গীর চৌধুরী অবৈধ কমিটির সভাপতি হিসেবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে উচ্চআদালতে রিট করেও তার শেষ রক্ষা হয়নি। আদালতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ডায়াবেটিক হাসপাতাল আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করেও উচ্চআদালতের রায়ে শেষমেষ তাকে ডায়াবেটিক হাসপাতাল ছাড়তে হয়। হাসপাতাল থেকে বিতাড়িত হয়েও তিনি হাসপাতালের বিরুদ্ধে লেগেই আছেন। সভাপতি না হয়েও তিনি সভাপতি হিসেবে আদালতে মামলা করে হাসপাতালের লাখ লাখ টাকা খরচ করিয়েছেন। চট্টগ্রাম দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান চালিয়ে তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট আলামত পেয়েছে-যা ইতোমধ্যে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের আত্মসাৎকৃত সাড়ে ২৭ লাখ টাকা এখনো তিনি সরকারি কোষাগারে জমা দেননি। শুধুমাত্র তার দুর্নীতির কারণে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় এই হাসপাতালকে বছরে যেই দুই কোটি টাকা অনুদান দিতো,তা বন্ধ করে দিয়েছে।
জাহাঙ্গীর চৌধুরী ২০০১ সালে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর উদ্দিনকে হটিয়ে ওই পদে আসীন হন। গঠনতন্ত্রে নিজের সুবিধামতো সংশোধনী এনে ২০০২ সাল থেকে সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি পদে বহাল থেকে একক সিদ্ধান্তে হাসপাতালের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতাল পরিণত হয়েছিল “জাহাঙ্গীর হাসপাতাল”-এ। ডায়াবেটিক হাসপাতালে প্রতিদিন ১০ লাখ টাকার ওপরে আয় হলেও হাসপাতালের নামে কোনো আয়-ব্যয়ের রেজিস্ট্রার বই ছিল না। আয়-ব্যয়ে ছিল না কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। গঠনতন্ত্রের ১২ (ঘ) ধারা মোতাবেক ব্যাংক হিসাব- যা সমিতির নামে কোষাধ্যক্ষ সমিতির যাবতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করার কথা। ১৭ (গ) ধারা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব- যা সমিতির নামে কোষাধ্যক্ষ নিজে এবং সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে যে-কোনো একজনসহ দুজনের যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হওয়ার নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। তিনি নিজেই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ এর সব দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মূলত সভাপতি-ই ছিলেন হাসপাতালের সর্বেসর্বা। কোষাধ্যক্ষের বাসায় গিয়ে ‘ব্ল্যাংক চেক’-এ স্বাক্ষর নিয়ে আসা হতো। তার অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে পত্রপত্রিকায় বহু লেখালেখি হয়েছে; হাসপাতাল কর্মচারিরা তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রেসক্লাব ও ডায়াবেটিক হাসপাতালের সামনে মানরবন্ধন,সভা-সমাবেশ করেছেন এবং তার প্রতিকৃতিতে জুতোপেটা ও থুথু নিক্ষেপ করেছেন। সরকারি দুই সংস্থার তদন্তে দুনীতি প্রমাণিত হওয়ার পরও আদালতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি নিজেকে বাঁচানোর অপচেষ্টায় আছেন। সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁর বাণী অনলাইন নিউজপোর্টালে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।দুর্নীতি নিয়ে নিউজ করায় জাহাঙ্গীর চৌধুরী চাটগাঁর বাণীর প্রধান-সম্পাদক এবং সম্পাদকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম সাইবার ক্রাইম আদালতে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু তার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার মামলা খারিজ করে দেয় আদালত।

সমাজসেবা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও ট্রেড-লাইসেন্স ছাড়াই চলছে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির নামে পরিচালিত হলেও ২০১৮ সাল থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমোদন নেয়া হয়নি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জাহাঙ্গীর চৌধুরী পাত্তাই দিতেন না। অনুমোদনহীন “পকেট কমিটি”র সভাপতি হিসেবে একক নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল চালিয়েছেন। তিনি প্রকাশ্যে বলতেন, ডায়াবেটিক হাসপাতাল পরিচালনা করতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কোনো প্রয়োজন নেই। এই হাসপাতালে আইসিইউ,সিসিইউ,এইচডিইউ বিভাগ আছে কিন্তু কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই; নেই সরকারের কোনো অনুমোদন। রোগীসেবার নামে বিভিন্ন তরফ থেকে কোটি কোটি টাকা আসলেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না ডায়াবেটিস-রোগীরা। গরীব রোগীরা যাতে বিনাচিকিৎসায় মারা না যায়,স্বল্পমূল্যে পায় চিকিৎসাসেবা-সেই মহৎ উদ্দেশে হাসপাতালটির গোড়াপত্তন হলেও বাস্তবে উদ্দেশ্য ও নীতি-আদর্শের বিপরীতে চলছে হাসপাতালটি। বিগত দুদশক ধরে এটি বাণিজ্যিক হাসপাতাল হিসেবে চলছে। হাসপাতালটিতে যদি অনিয়ম-দুর্নীতি না হতো, তাহলে এতদিনে হাসপাতাল-তহবিলে শত শত কোটি টাকা জমা হতো, অত্যাধুনিক চিকিৎসা-সরঞ্জাম কেনা যেতো, হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হতো, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া যেতো এবং গরীব রোগীরা কমমূল্যে চিকিৎসাসেবা পেতো।

উল্লেখ্য, ‘শৃঙ্খলাই জীবন’- এ স্লোগানকে সামনে রেখে ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতি চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা থেকে নিবন্ধন নেয়।নিবন্ধনের তিনবছর আগে থেকে চট্টগ্রাম শহরের কাপাসগোলা সিটি কর্পোরেশন দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্রে ডায়াবেটিক হাসপাতালের বর্হিবিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। অতঃপর সেখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে ১৯৭৮ সাল থেকে আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে, ১৯৮১ সাল থেকে মেহেদিবাগে এবং ১৯৮৮ সাল থেকে এনায়েতবাজারে একটি পরিত্যক্ত ভবনে চিকিৎসা কার্যক্রম চলে। ২০০১ সালের মার্চ মাসে খুলশী থানাধীন জাকির হোসেন রোডে রেলওয়ের দেয়া প্রায় একএকর জায়গার ওপর নির্মিত নিজস্ব ভবনে হাসপাতালটি স্থানান্তরিত হয়। ২০০৮ সালের মার্চ মাসে চালু হয় অন্তর্বিভাগ কার্যক্রম। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাসপাতালটির নামকরণ হয় চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল। বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে এ হাসপাতালের ৪টি শাখা আছে। শাখাগুলো- এনায়েতবাজার শাখা, বন্দরটিলা শাখা, অক্সিজেন শাখা ও বহদ্দারহাট শাখা।
লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

