আবুল মনসুর (৫৫) ছিলেন ফেরদৌস শিপ ইয়ার্ডের ফোরম্যান তার ছোট ভাই নাসির( ৫০) ছিলেন কাটারম্যান। দুজনেই প্রায় ১৭ বছর এই ইয়ার্ডে কাজ করছেন।
সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস লিকেজের ঘটনায় শুক্রবার (১৪আগস্ট) যে ৯ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ভাটিয়ারী মৌলভীপাড়ার দুইসহোদর মনসুর ও নাসির।

নাসিরের একমাত্র মেয়ে ইভা, যে এবার দশম শ্রেণিতে পড়ে বাবার নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার বলছিল, ‘আজ কাজ বন্ধ থাকায় বাবা বাড়িতে ঘুমাচ্ছিলেন। তিনি বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কারখানা থেকে ফোন করে তাকে ডেকে নিয়ে গেছেন সকালে। দুপুরে বাবা ফিরলেন লাশ হয়ে।’
একই করুণ দশা মনসুরের পরিবারেরও। দুই মেয়ের জনক মনসুর ছিলেন পুরো পরিবারের একমাত্র চালিকাশক্তি। তার এক মেয়ে এখনো পড়াশোনা করছেন। বাবার অকাল মৃত্যুতে সেই মেয়ের ভবিষ্যৎ এখন এক বিশাল অনিশ্চয়তার মুখে।
স্বজনরা জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তারা ইয়ার্ডে ছুটে যান। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছিল না বলে অভিযোগ করেন তারা। একপর্যায়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে কারখানার মূল গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। গ্রামবাসী ও শ্রমিকরা মিলে নিজেরাই উদ্ধার কাজ শুরু করেন এবং একের পর এক নিথর দেহ বের করে আনতে থাকেন। তাদের লাশ বিষাক্ত পাউডারে ঢেকেছিলো।
ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ জানিয়েছেন, জাহাজের ইঞ্জিন রুমের ট্যাংক থেকে গ্যাস লিকেজ হচ্ছে বলে সেফটি টিমের সদস্যরা শনাক্ত করেন। সেটি পরীক্ষা করতে গিয়ে শ্রমিকরা অচেতন হয়ে পড়েন। তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পরবর্তীকালে আরও কয়েকজন সংজ্ঞা হারান। ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, কার্বন মনোক্সাইড বা অন্য কোনো প্রাণঘাতী গ্যাস এই মৃত্যুর মিছিলের কারণ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় এখন কেবলই হাহাকার। স্বজনদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর থেকে ফেরদৌস স্টিলের কোনো মালিক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হাসপাতালে দেখা যায়নি।তবে এসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা রোগীদের খোজখবর চিকিৎসা করিয়েছেন।
শিপ ইয়ার্ডের এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মোহসীন জানান, জীবনতো আর ফেরৎ দেয়া যাবেনা তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।
হাসপাতালে কোনো প্রতিনিধি না থাকায় মরদেহ গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতেও বেগ পেতে হচ্ছে তাদের।
মৌলভীপাড়ার প্রতিবেশী ইমন বলেন, ‘তারা অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিলেন এবং বছরের পর বছর এখানে কাজ করে পরিবার চালাতেন। এখন দুই ভাইকেই হারিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’

