শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬

[the_ad id='15178']

নতুন খসড়া আইন পাস হলে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে’: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর, স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬-এ একাধিক মৌলিক সংশোধনের দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি)। তারা বলছেন, সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বা সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না। তাই কমিশনের স্বাধীনতা, তদন্তের পূর্ণ ক্ষমতা, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে আইনটি চূড়ান্ত করতে হবে।

- Advertisement -

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর টিআইবি’র মেঘমালা কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত ‘খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬: হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) ও টিআইবির পর্যালোচনা ও সুপারিশ’ শীর্ষক অধিপরামর্শ সভায় এসব কথা বলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

- Advertisement -shukee

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকারের কাছ থেকে দেশের মানুষ একটি কার্যকর, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রত্যাশা করে। অতীতে কার্যকর মানবাধিকার কমিশনের অভাবে দেশের মানুষ নানা ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে। বর্তমান সরকার ও সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী অনেকেরই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশনের অনুপস্থিতি মানুষের অধিকার সুরক্ষায় কত বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সেই বাস্তবতা থেকেই একটি কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠায় সরকার সঠিক পদক্ষেপ নেবে বলে তারা আশা করছেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, খসড়া আইনে কয়েকটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। যেমন কমিশনের সদস্য হতে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি সদস্য হতে পারবেন না, কমিশনের কার্যক্রম লিখিতভাবে প্রকাশের বিধান রাখা হয়েছে, মানবাধিকার সুরক্ষার বিদ্যমান ব্যবস্থার সমন্বিত পর্যালোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তার বিধান যুক্ত হয়েছে এবং জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে ইতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও খসড়া আইনের বেশ কয়েকটি ধারা ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় দুর্বল করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে বিচ্যুত হয়েছে। এর ফলে একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কমিশনের স্বাধীনতা। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশনকে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখার যে নীতি ছিল, নতুন খসড়ায় তা বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে কমিশনকে কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীন রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়। আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক বা স্বতন্ত্র সংস্থা হবে এবং সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে না।

তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বাহিনীসহ যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে, সেসব সংস্থার সম্ভাব্য আটকস্থল পরিদর্শন, তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করার ক্ষমতা কমিশনের ছিল। কিন্তু নতুন খসড়ায় সেই ক্ষমতা কার্যত বাতিল করা হয়েছে। গুম, নির্যাতন বা অবৈধ আটক হতে পারে এমন স্থানে কমিশনের প্রবেশাধিকার এবং তদন্তের ক্ষমতা পুনর্বহাল করতে হবে।

নির্বাহী পরিচালক বলেন, খসড়া আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রেও কমিশনের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। এখন কমিশন কেবল সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে এবং সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সুপারিশ করবে। অথচ অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, তদন্তের দায়িত্বও কার্যত তার কাছেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এটি স্বাধীন তদন্তের নীতির পরিপন্থী। তাই ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশনের নিজস্ব তদন্ত ও অনুসন্ধানের ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি কর্মকর্তা বা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা হলে তাদের গ্রেফতারে সরকারের পূর্বানুমতির বিধান রাখা উচিত নয়। আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা প্রয়োজন অনুযায়ী কমিশনের অনুমতিই যথেষ্ট হওয়া উচিত। এতে বিচার প্রক্রিয়া আরও স্বাধীন হবে। কমিশনের কাছে কোনো অভিযোগ বা তথ্য এলে তা কমিশনের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা ঠিক হবে না। অভিযোগ গণমাধ্যম বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রকাশিত হলেও কমিশনকে সক্রিয়ভাবে তা আমলে নিতে হবে। যদি কোনো অভিযোগ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে কেন তা করা হলো না, সেই কারণও কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

খসড়া আইনে মধ্যস্থতা ও সমঝোতার জন্য মধ্যস্থতাকারী নিয়োগে সরকারের নিয়ন্ত্রণ রাখার প্রস্তাবেরও বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণ কমিশনের নিজস্ব এখতিয়ারের মধ্যে থাকা উচিত। কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের জন্য যে বাছাই কমিটির প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে সরকারের অতিরিক্ত প্রভাব রয়েছে। স্পিকার, দুইজন মন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তাই ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে প্রস্তাবিত তুলনামূলক স্বাধীন বাছাই কমিটি পুনর্বহালের দাবি জানানো হয়।

সভায় বক্তারা বলেন, একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিতামূলক জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা শুধু মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্যও অপরিহার্য। তাই আইনটি চূড়ান্ত করার আগে নাগরিক সমাজের উত্থাপিত সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও