অনেকেই বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে সৌরশক্তির দিকে ঝুঁকছেন

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন গতি
দেশে ২০০৫ সালের দিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন শুরু হয় । পরীক্ষামূলক প্রথমে বায়ুশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে। সবচেয়ে বড় চমক দেখা গেছে এ বছর যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধকালীন সময়ে। এ সময় জ্বালানি সংকট ও ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে সোলার সিস্টেমের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ সময় সোলার প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের আমদানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ব্যক্তি উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন গতি এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের তিস্তা নদীর চরাঞ্চলে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়। এই প্রকল্পটি ২০২৩ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যায়। কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। মাসিক হিসাবে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। এই কেন্দ্র থেকে মাসে প্রায় ৩০ কোটি টাকার আয় হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশের পতিত জমিতে ফলের বাগান করে সবুজায়নও রক্ষা হচ্ছে।
এদিকে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার শৌলমারী চরে তিস্তা অববাহিকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্ট্রাকো আরেকটি বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করেছে। এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে দেশের শহর-মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলেও ব্যক্তি উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বাসাবাড়ি ও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সোলার সিস্টেম ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্তমানে আধুনিক সোলার সিস্টেমের মাধ্যমে টিভি, ফ্রিজ, মোটর, এসি, ফ্যান, লাইট, রাউটার, আইপিএস ও মাইক্রোওয়েভ ওভেনসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে অনেকেই বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে সৌরশক্তির দিকে ঝুঁকছেন।
জানা যায়, ২০০৫ সালে ফেনীর মুহুরী প্রজেক্টে বাংলাদেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু হয়। এই প্রকল্পে ৪টি ২২৫ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন টারবাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ০.৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে দেশে সোলার হোম সিস্টেম ও গ্রিড-সংযুক্ত সৌর প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ছে। একই সঙ্গে কক্সবাজারে ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পও নতুন মাইলফলক হিসেবে যুক্ত হয়েছে। সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে।
সম্প্রতি ‘ফস্টারিং বাংলাদেশ এনার্জি ট্রানজিশন’ শীর্ষক নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার মাত্র ২.৩ শতাংশ। যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৩৩.৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। চলতি বছর এলএনজি আমদানিতে প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ভর্তুকি দিতে হতে পারে। তবে সৌরবিদ্যুৎসহ বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা বেশি বেশি চালু করতে পারলে এই ভর্তুকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তাছাড়া উচ্চ আমদানি শুল্ক এই খাতের সম্প্রসারণে বাধা তৈরি করছে। তবে ১০০ মেগাওয়াট ছাদ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ফার্নেস অয়েল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় গ্রীন এনার্জির ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। ২০২৫ সালে ব্রাজিলের বেলেম শহরে অনুষ্ঠিত কপ-৩০ সম্মেলনেও জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। এ বছর একই সময়ে তুরস্কের আনাতোলিয়ায় অনুষ্ঠিত কপ৩১ সম্মেলনেও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। এরইমধ্যে এবছর চীন ও জার্মানি সৌর বিদ্যুতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উৎপাদন বাড়িয়েছে। জার্মানি ও চীনে অন্তত আগের তুলনায় ৭০ ভাগ সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে। অন্যান্য দেশগুলোও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই বলে জানা গেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান হতে পারে নবায়নযোগ্য শক্তি। প্রতিদিনের সূর্যালোক ও উপকূলীয় বায়ু ব্যবহারের মাধ্যমে দেশ সহজেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোলার সিস্টেম স্থাপনে প্রাথমিক ব্যয় বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সাশ্রয়ী। এছাড়া, প্রতিটি উপজেলা বা জেলায় বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে ভবিষ্যতে দেশের বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই দূর করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ইনস্টিটিউট অব এনার্জি টেকনোলজির সাবেক পরিচালক ও বিদ্যুৎ- জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম. শামসুল আলম বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সৌর বিদ্যুতের ওপর জোর দেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। এক্ষেত্রে সরকারকে খুব দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে ভ্যাট ট্যাক্স কমাতে হবে। এসব সহজীকরণ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য কোম্পানিগুলো নিজ উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারে। এ খাতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব যদি সরকার একটি নীতিমালা করে দেয় ।’

