দিনভর পরিশ্রমের পর আমরা যখন ঘরে ফিরি, তখন একটাই প্রত্যাশা থাকে- নিরাপত্তা। সন্তানের হাসি, পরিবারের স্বস্তি আর শান্ত একটি রাত। কিন্তু চট্টগ্রামের হালিশহরের সাম্প্রতিক মর্মান্তিক গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, সেই নিরাপদ ঘরও কখনো কখনো অপ্রস্তুতির কারণে বিপদের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
একটি সাধারণ রান্নাঘর। একটি সিলিন্ডার। আর কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতা। এতেই বদলে যেতে পারে একটি পরিবারের পুরো ভবিষ্যৎ।

বাংলাদেশে এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার গত এক দশকে বহুগুণ বেড়েছে। পাইপলাইনের সীমাবদ্ধতা ও নগর সম্প্রসারণের কারণে এখন শহর থেকে গ্রাম- সবখানেই সিলিন্ডার নির্ভরতা। কিন্তু ব্যবহার যত দ্রুত বেড়েছে, নিরাপত্তা সচেতনতা কি ততটা বেড়েছে? বাস্তবতা বলছে, না।
কেন সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়?
অনেকে মনে করেন সিলিন্ডার হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়। বাস্তবে বেশিরভাগ দুর্ঘটনার শুরু হয় গ্যাস লিকেজ থেকে। এলপিজি বায়ুর চেয়ে ভারী, তাই তা মেঝের নিচু অংশে জমে থাকে। সামান্য আগুন বা স্পার্ক- চুলা জ্বালানো, ম্যাচের কাঠি, এমনকি বৈদ্যুতিক সুইচ অন করার সময় সৃষ্ট স্পার্ক – মুহূর্তেই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ বিপর্যয়ের আগে সতর্ক হওয়ার সময় থাকে, কিন্তু আমরা তা বুঝতে পারি না বা গুরুত্ব দিই না।
হালিশহরের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও আমাদের আরেকটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি করেছে। আগুন লাগার পর কীভাবে নিজেকে বাঁচাতে হয়- সে প্রাথমিক জ্ঞান অনেকেরই নেই। গায়ে আগুন লাগলে দৌড়ালে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে- এ কথা আমরা অনেকেই জানি না। অথচ সহজ একটি কৌশল- থেমে যাওয়া, মাটিতে শুয়ে পড়া এবং গড়িয়ে আগুন নেভানো (Stop, Drop and Roll)পদ্ধতি ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার – প্রাণ বাঁচাতে পারে। তাই আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতিই পারে বিপদ কমাতে।

কেন ঝুঁকি বাড়ছে?
দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ প্রায়ই দেখা যায়- পুরোনো বা ত্রুটিপূর্ণ হোস পাইপ, ঢিলা রেগুলেটর, ভেন্টিলেশনহীন রান্নাঘর, কিংবা সিলিন্ডার সঠিকভাবে স্থাপন না করা। অনেক সময় বছরের পর বছর একই পাইপ ব্যবহার করা হয়। ডেলিভারির সময় সিলিন্ডার পরীক্ষা করা হয় না। এগুলো ছোট ভুল মনে হলেও, পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।
করণীয়: ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ
১. নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা সরকার অনুমোদিত কোম্পানি থেকে সিলিন্ডার কিনতে হবে। সিলিন্ডারের সিল, ওজন ও মেয়াদ যাচাই করতে হবে।
২. নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হোস পাইপ ৬–১২ মাসের মধ্যে পরিবর্তন করা উচিত। রেগুলেটর ঢিলা বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাৎক্ষণিক বদলাতে হবে।
৩. বায়ু চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। রান্নাঘরে জানালা বা ভেন্টিলেশন থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
৪. গ্যাসের গন্ধ পেলে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। চুলা ও রেগুলেটর বন্ধ করতে হবে, দরজা-জানালা খুলে দিতে হবে। কোনোভাবেই বৈদ্যুতিক সুইচ অন/অফ করবেন না।
৫. স্কুল, কলেজ, কমিউনিটি সেন্টার ও আবাসিক ভবনে নিয়মিত ফায়ার ড্রিল ও প্রাথমিক অগ্নি-নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ চালু করা প্রয়োজন। “Stop, Drop and Roll” পদ্ধতি ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহারের মৌলিক ধারণা সবাইকে জানতে হবে।
এক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতা যথেষ্ট নয়। কোম্পানির মাননিয়ন্ত্রণ, ডিলারদের জবাবদিহি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর তদারকি জরুরি।
হালিশহরের ট্র্যাজেডি আমাদের শোকাহত করেছে। কিন্তু শোক যদি সচেতনতায় রূপ না নেয়, তবে সেই শোক বৃথা। প্রতিটি দুর্ঘটনা আমাদের একটি করে শিক্ষা দেয়- প্রস্তুতি ছাড়া নিরাপত্তা আসে না। ঘরকে নিরাপদ রাখতে হলে শুধু ইট-পাথরের দেয়াল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দায়িত্বশীল আচরণ, নিয়ম মেনে চলার সংস্কৃতি এবং নাগরিক সচেতনতা। কারণ নিরাপত্তা কাকতালীয় নয়- এটি চর্চার ফল।
লেখকঃ সহকারী প্রকৌশলী- যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত বিভাগ (রোলিং মিল)
জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড ।

