শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
এনসিটি ইজারা দেয়ার চুক্তি থেকে সরে না আসা  এবং শ্রমিক কর্মচারীদের বদলির আদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে

চট্টগ্রাম বন্দর পুরোপুরি অচল লাগাতার কর্মবিরতিতে

আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ায় দিশেহারা তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা
নিজস্ব প্রতিবেদক

শ্রমিক কর্মচারীদের লাগাতার কর্মবিরতিতে চট্টগ্রাম বন্দর পুরোপুরি অচল । বন্দরে কন্টেনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বন্ধ হয়ে রয়েছে জাহাজ চলাচলও। শ্রমিক কর্মচারীদের লাগাতার কর্মবিরতির কর্মসূচিতে বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজের সারি দীর্ঘ হচ্ছে, বাড়ছে জাহাজজট। কন্টেনারের পাহাড়ও বড় হচ্ছে বন্দরের অভ্যন্তরে । সবকিছু মিলে চট্টগ্রাম বন্দর এক ভয়াবহ অচলাবস্থায় পড়েছে ।

- Advertisement -

বিদেশি অপারেটরের কাছে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল এনসিটি ইজারা দেয়ার প্রতিবাদে গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া শ্রমিক কর্মচারীদের কর্মসূচিতে দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্টগুলোতে সময়মতো পণ্য না পৌঁছানোর ফলে তৈরি পোশাকসহ বহু পণ্যই মাদার ভ্যাসেল ধরতে পারবে না। এতে এসব পণ্যের ভবিষ্যত নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গতকাল আন্দোলনকারী শ্রমিক কর্মচারীদের সাথে বৈঠক করেছেন বিজিএমইএসহ বন্দর ব্যবহারকারীরা। তারা কর্মসূচি প্রত্যাহারের অনুরোধ করলেও শ্রমিক কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এনসিটি ইজারা দেয়ার চুক্তি থেকে সরে আসার স্পষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

- Advertisement -shukee

শ্রমিক কর্মচারীদের লাগাতার কর্মবিরতির কারণে সবগুলো জাহাজই জেটিতে অলস বসে আছে। গতকালও জেটিতে ওই সময় ১১টি জাহাজ পণ্য খালাস বা বোঝাই করার জন্য অপেক্ষা করছিল। তবে এগুলোতে কোনো কাজ না হওয়ায় সবগুলো জাহাজেরই ক্রেন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এনসিটি এবং সিসিটির গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলোও অচল দেখা গেছে। বন্দরে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এবং কাজের হাকডাক নেই। বন্দরের ভেতরে কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করলেও ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং কন্টেনার মুভারের চলাচল ছিল না গতকাল পর্যন্ত।

নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত শনিবার থেকে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। এর আগেও প্রতিবাদ সমাবেশ এবং বিক্ষোভ মিছিল করা হলেও ওইদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৮ ঘন্টার কর্মবিরতিতে যায় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। পরপর তিনদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতির কর্মসূচি দেয় সংগঠনটি। আন্দোলন চলাকালে বেশ কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে বদলি করার ঘটনার পর আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে এবং বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি শুরু হয়। তবে সোমবার বিকেলেই ২৪ ঘণ্টার বদলে লাগাতার কর্মবিরতির ডাক দেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। সরকার এনসিটি ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসা এবং শ্রমিক কর্মচারীদের বদলির আদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত লাগাতার কর্মবিরতি চলবে বলেও শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ, চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালে (এনসিটি) অবস্থানকারী জাহাজগুলো অলস বসে আছে। এসব জেটি থেকে কোন জাহাজ বাইরে যায়নি, কোনো জাহাজ ভিড়েনি। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে মঙ্গলবার আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় বার্থিং মিটিং করলেও কোনো জাহাজ মুভমেন্ট করেনি। পাইলট এবং মুরিং গ্যাং কাজ করতে না পারায় জাহাজের মুভমেন্ট বন্ধ থাকে বলেও সূত্র জানিয়েছে। গতকাল জেটিতে ১০টি কন্টেনার জাহাজ এবং তিনটি পণ্যবাহী জাহাজ আটকে থাকার কথা জানিয়ে বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তরা বলেছেন যে, বহির্নোঙরে অপেক্ষমান জাহাজের সংখ্যাও ক্রমে বাড়ছে। বিদেশ থেকে কন্টেনার নিয়ে আসা জাহাজগুলো বহির্নোঙরে আটকা পড়ছে। বন্দরের প্রধান তিনটি টার্মিনালে কাজ বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের অন্ততঃ ৯৭ ভাগই মুখ থুবড়ে পড়েছে।

শুধু কন্টেনার হ্যান্ডলিংই নয়, চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ড থেকে গতকাল কোনো কন্টেনার বাইরে যায়নি, ডিপোগুলো থেকেও বন্দরে প্রবেশ করেনি কোনো কন্টেনার ।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন চট্টগ্রাম বন্দরে ভয়াবহ রকমের অচলাবস্থা নিয়ে বলেন, আমরা নিজেদের জন্য আন্দোলন করছি না। দেশের স্বার্থেই আমরা মাঠে নেমেছি। চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় এবং আধুনিক যে টার্মিনাল সেই এনসিটি ইজারা দেয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করে স্পষ্ট ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তিনি বলেন, শ্রমিক–কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন চালিয়ে গেলেও বিষয়টি সমাধানে সরকার থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। ফলে আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ায় দিশেহারা তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা।

বিজিএমইএ’র নেতা এম এ সালামের উদ্যোগে গতকাল বুধবার বিকেলে হোটেল আগ্রাবাদে আন্দোলনকারী শ্রমিক কর্মচারীদের সাথে ব্যবসায়ীরা নিজেদের উদ্যোগে প্রায় চারঘণ্টাব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। । এতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বেপজিয়া, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ প্রভৃতি সংগঠনের প্রতিনিধিরা এই বৈঠকে যোগদান করেন। বন্দর ব্যবহারকারীদের পক্ষ থেকে রমজানের আগে দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে দেখা দেয়া মারাত্মক সংকট তুলে ধরা হলে শ্রমিক কর্মচারীরা বলেন, আমরা সবকিছুই বুঝতে পারছি, শুধু বুঝতে পারছি না যে সরকার কেনো লুকোচুরি করে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক এবং বড় টার্মিনালটি গোপন চুক্তির মাধ্যমে ইজারা দিচ্ছে। আমরা অনেকদিন ধরে আন্দোলন করছি, কিন্তু আমাদের সাথে বিষয়টি নিয়ে বিন্দুমাত্র আলোচনাও করা হয়নি, হচ্ছে না। তারা বলেন, আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। আমরা সবকিছু জানতে চাই, আলোচনা করতে চাই। গোপন কোনো চুক্তি আমরা মেনে নেবো না। তারা ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দকে বলেন, এনসিটি নিয়ে গোপন চুক্তি থেকে ফিরে না আসা এবং শ্রমিক কর্মচারীদের বদলির আদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে। তারা সরকার নির্বাচনের আগে এতো তাড়াহুড়ো কেনো করছে সেটিই আমাদের প্রশ্ন। কেনো চট্টগ্রাম বন্দরের বোর্ড মিটিং ঢাকায় করতে হচ্ছে? আমরা বন্দরের চেয়ারম্যানের কাছে অনেককিছু জানতে চেয়েছি, তিনিই কিছুই জানাননি। এভাবেই তো হতে পারে না। আমরা মানতে পারিনা।

শ্রমিক নেতারা বলেন, বলা হচ্ছে চাঁদাবাজি চলছে। কিন্তু কারা চাঁদাবাজি করছে? বন্দরের চেয়ারম্যান নেভির লোক, এনসিটি নেভি পরিচালনা করছে। তাহলে চাঁদাবাজি কিভাবে চলছে? চারঘণ্টা ব্যাপী বৈঠক হলেও আন্দোলনকারী শ্রমিক কর্মচারীরা তাদের দাবি থেকে সরে না আসায় বৈঠক শেষ হয়েছে। কোনো ধরণের সুরাহা ছাড়াই

বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীরসহ আন্দোলনে জড়িত অন্তত ১৬ জন কর্মচারীকে প্রথমে ঢাকার পানগাঁও আইসিটি ও কমলাপুর আইসিডিতে পরে মন্ত্রণালয় তাদের মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করেছে। যদিও তারা কর্মস্থলে যোগ দেননি। চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল নির্মিত হয় ২০০৭ সালে। টার্মিনালটি নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সংযোজনে বন্দর কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে মোট ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বন্দরের আমদানি–রপ্তানি কন্টেনারের সিংহভাগ এই টার্মিনালে হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে। অপরদিকে বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) বন্দর অবরোধ কর্মসূচি পালন করে।

স্কপের সমাবেশ নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার শাখাওয়াতের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। নগরীর বন্দর সংলগ্ন ইসহাক ডিপো টোল প্লাজা চত্বরে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এস কে খোদা তোতন। টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম হোসেন খোকন ও হুমায়ুন কবির, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল বাতেন, জাতীয়তাবাদী ডক শ্রমিক দলের সভাপতি মোহাম্মদ হারুন, সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম জেলা শাখার সভাপতি সোহাগ হোসেন, মার্চেন্ট শ্রমিক নেতা ইয়াছিন রেজা রাজু, লেসিং–আনলেসিডিং শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা মোহাম্মদ ইকবাল, ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ (ইনসাব) চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি বাবুল হোসেন আনিস এবং বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুর রহিম প্রমুখ। সমাবেশ থেকে একাত্মতা ঘোষণা করা হয় বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচির প্রতি ।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও