ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, অংশগ্রহণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার জোরালো প্রত্যাশা তুলে ধরা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ডিস্যাবিলিটি রাইটস ওয়াচ (ডিআরডব্লিউ) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় প্রত্যাশার কথা।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিমণ্ডলে প্রতিবন্ধী নাগরিকদের বাস্তব অবস্থা কারও অজানা নয়। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ (সিআরপিডি) বাংলাদেশ ২০০৭ সালে অনুসমর্থন করে। পরবর্তীতে সনদের আলোকে জাতীয় সংসদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ পাস হয় এবং ২০১৯ সালে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতি না থাকায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।
টিআইবি জানায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ প্রতিবন্ধী। সে হিসাবে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা দুই কোটিরও বেশি হওয়ার কথা। এত বড় জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক দল টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না।
ডিস্যাবিলিটি রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জাতীয় অঙ্গীকার রক্ষার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা আজও কার্যকর হয়নি এবং এর জন্য মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ নেই। আইন অনুযায়ী গঠিত জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন কমিটি নিয়মিত সভা করে না, প্রতিবেদন ব্যবস্থাও কার্যকর নয়।

এছাড়া বিধিমালা ও কার্যবণ্টন পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে বলা হয়, প্রতিবন্ধীবিষয়ক সব দায়িত্ব কেবল সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত থাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যুব, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়গুলো কার্যত দায় এড়াচ্ছে। এর ফলে প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, থেরাপি ও কর্মসংস্থানের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য সম্মিলিত ১ শতাংশ কোটার পরিবর্তে কেবল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা করে ২ শতাংশ কোটা নির্ধারণের দাবিও জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার প্রসঙ্গে বলা হয়, সিআরপিডি বাস্তবায়নে একসময় অগ্রণী ভূমিকা থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক কমিটির সমাপনী পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আইন ও নীতিমালা সংস্কার, জাতীয় পরিবীক্ষণ কমিটিকে শক্তিশালী করা এবং ২০২৯ সালের মধ্যে বকেয়া পাঁচটি প্রতিবেদন প্রস্তুত ও জমা দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তথ্য ও সূচক অন্তর্ভুক্ত না করায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সংগঠনগুলোর মতে, জাতীয় পর্যায়ের জরিপ ও এসডিজি সূচকে প্রতিবন্ধীবিষয়ক আলাদা তথ্য অন্তর্ভুক্ত না হলে ২০৩০ সালে অগ্রগতি পরিমাপ করা সম্ভব হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘নাথিং অ্যাবাউট আস, উইথআউট আস’ নীতির আলোকে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন- সব পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনে অন্তত তিনজন প্রতিবন্ধী প্রতিনিধি মনোনয়ন, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত আসন, প্রবেশগম্য অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ এবং প্রতিবন্ধী ভাতা বাড়িয়ে মর্যাদাসম্পন্ন পর্যায়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এছাড়া নির্বাচন কমিশনের (ইসি) উদ্দেশে বলা হয়, ভোটকেন্দ্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিদ্যমান সুবিধাগুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রচার না থাকায় অনেকেই তা জানেন না। দ্রুত ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানোর সুপারিশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে সংগঠন দুটি আশা প্রকাশ করে জানায়, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর এসব ন্যায্য প্রত্যাশা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং নির্বাচনি ইশতেহারে তার প্রতিফলন ঘটাবে।
এতে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, ডিস্যাবিলিটি রাইটস ওয়াচের সভাপতি মনসুর আহমেদ চৌধুরী, ইয়ুথ অ্যাকটিভিস্ট মো. আবদুল্লাহ প্রমুখ।


