একটি দলের শক্তি কখনো শুধু ক্ষমতায় নয়- বরং সেই দলের মাটির মানুষ, নিবেদিতপ্রাণ কর্মী এবং ত্যাগী নেতাদের হৃদয়ে নিহিত থাকে।
যে মানুষ নিজের জীবন, সময়, অর্থ, এমনকি পরিবারকেও বিসর্জন দিয়ে দলের জন্য কাজ করে— সে কেবল একজন প্রার্থী নয়, সে দলের আত্মা।

কিন্তু যখন সেই ত্যাগী, সৎ ও গ্রহণযোগ্য মানুষটি মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়, তখন ক্ষতি শুধু একজন ব্যক্তির হয় না— ক্ষতি হয় পুরো দলের নৈতিক ভিত্তির।
তার চোখের নীরব কষ্ট, তার কর্মীদের ভাঙা মন, আর জনগণের হতাশা— এগুলো দলীয় পতাকার ভাঁজে জমে থাকা এক নিঃশব্দ আর্তনাদ হয়ে যায়।
যে নেতা সারাজীবন তৃণমূলের মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থেকেছে, জেল জুলমের শিকার হয়েছে,যে নেতা দলের বিপদে নিজের ঘর পুড়িয়েও পতাকা টিকিয়ে রেখেছে,যে মানুষের ভালোবাসায় জনপ্রিয়তার চূড়ায়—
যখন তাকেই অবহেলায় বাদ দেয়া হয়, তখন সেই সিদ্ধান্তে দলের মূল শেকড় কাঁপে।

কারণ মানুষ চেনে ত্যাগীকে, মানুষ জানে কে তাদের পাশে ছিল ঝড়-ঝঞ্ঝায়। মনোনয়ন শুধু একটি কাগজ নয়— এটি বিশ্বাসের প্রতীক।
আর সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে ভোটের মাঠে শুধু হার আসে না, হার আসে দলের মর্যাদা, ঐক্য ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনায়।
ত্যাগি কর্মীর অশ্রু একদিন দলের পতাকায় দাগ ফেলে যায়,বঞ্চিত জনতার নীরব অভিমান একদিন সংগঠনের ভিত দুর্বল করে ফেলে।
অথচ একটু স্বীকৃতি, সামান্য ন্যায়বিচার পেলেই তারা প্রাণ দিয়ে দলকে বাঁচিয়ে রাখে।
তাই সময় এসেছে দলগুলো বুঝুক—
যে ত্যাগ করেছে, যে ঘাম ঝরিয়েছে, যে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করেছে,মনোনয়নের আসল দাবিদার সে-ই।
কারণ ত্যাগি মানুষকে অবমূল্যায়ন মানে দলকে নিজের অজান্তেই দুর্বল করা।
দলের শিকড় শুকিয়ে যায় তখনই, যখন মাটির গন্ধ ভুলে যায় নেতৃত্ব।
এই প্রবণতা আওয়ামী লীগ ও বি এন পি’র মত বৃহত্তর দলে দেখা যায়।

বাংলাদেশের দুই প্রধান দল— আওয়ামী লীগ ও বিএনপি,দু’টিই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দুই দলেই একটি গভীর ও বিপজ্জনক প্রবণতা গড়ে উঠেছে—ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন,আর সুবিধাভোগী, ধনবান, সুযোগসন্ধানীদের অগ্রাধিকার দেয়া।
এই প্রবণতার ফলাফল ভয়াবহ ও বহুমাত্রিক।
যখন ত্যাগী কর্মী দেখে, তার সারাজীবনের পরিশ্রম, রক্ত, ঘাম,সবকিছু উপেক্ষা করে মনোনয়ন দেয়া হয় এমন কাউকে—যে দলের সুখে-দুঃখে কখনো পাশে ছিল না—তখন তার ভেতরে জন্ম নেয় হতাশা, ক্ষোভ ও অবিশ্বাস।
একসময় সেই কর্মীর হৃদয়ের আগুন নিভে যায়,
দল হারায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ— বিশ্বাস।
ত্যাগীরা যখন উপেক্ষিত হয়, তখন তারা বাইরে নয়—
ভেতর থেকেই নীরব প্রতিবাদ শুরু করে।
মনোনীত প্রার্থীর জন্য মাঠে আর আগের মতো কাজ করে না,প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেয় না, বরং নীরবে দূরে সরে যায়।
ফলে ভোটের মাঠে দেখা যায়,
দলের প্রতীক থাকে, কিন্তু প্রাণ থাকে না।
যেখানে ত্যাগের মূল্য নেই, সেখানে অর্থই হয়ে যায় যোগ্যতার মাপকাঠি।
ধনবান, প্রভাবশালী বা সুবিধাভোগী লোকেরা
দলকে “স্পন্সর” করার নামে নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে।
ফলে দল হয়ে পড়ে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান,
রাজনীতি পরিণত হয় বিনিয়োগের প্রকল্পে।
জনগণ খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে কে ত্যাগি, কে সুবিধাভোগী।
যখন তারা দেখে দলের মনোনয়ন পায় এমন কেউ,
যে কখনো জনগণের পাশে ছিল না,
তখন তারা আর দলকে নয়— নেতৃত্বকে প্রশ্ন করে।
এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় বিরক্তি, ভোট বিমুখতা, এমনকি রাজনৈতিক অস্থিরতা।
ত্যাগী কর্মী হারালে দল হারায় তার নৈতিক ভিত্তি ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা।
এভাবেই একসময় দল শক্তিশালী থাকলেও ভেতরে ভেতরে ফাঁপা হয়ে যায়,
একদিনের ছোট একটি ভুলেই পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ে। ইতিহাস সাক্ষী— এমন পতন কেবল প্রতিপক্ষ ঘটায় না,দল নিজেই নিজের ভিত খুঁড়ে ফেলে।
আমি আমার নির্বাচনী এলাকা সীতাকুণ্ডতেই দেখেছি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল্লাহ আল বাকের ভূঁইয়া পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করেও আওয়ামী লীগের জন্য শেষ পর্যন্ত ত্যাগ করে গেছে, ২৫ বছর ধরে সীতাকুণ্ড আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেছে। সীতাকুণ্ড আওয়ামী লীগের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় তিনি সাধারণ সম্পাদক সভাপতি ছিলেন কিন্তু আওয়ামী লীগের হাই কমান্ড তাকে মুল্যায়ণ করতে পারেনি। এ কারণে দলের মধ্যে গ্রুপিং তৈরি হয়েছে। ত্যাগী নেতাদের দলে স্থান হয়নি। এই ভুল অনেক নির্বাচনী এলাকায় হয়েছে।
একইভাবে দেখলাম সীতাকুণ্ড বিএনপি’র দু:সময়ের কাণ্ডারী ছিল লায়ন আসলাম চৌধুরী। দলের জন্য সর্বস্ব খুইয়েছেন, প্রায় ৮ বছর জেলে থেকেছেন,ব্যবসা বাণিজ্য সব হারিয়েছেন। সীতাকুণ্ড বিএনপি’র তৃণমূল পর্যায়ের খুব জনপ্রিয় ও জননন্দিত নেতা তিনি। অথচ তাকে মনোনয়ন দেয়া হলোনা। এতে কর্মী সমর্থকেরা বিক্ষুব্ধ হয়ে সড়ক অবরোধ করেছেন। এটাই স্বাভাবিক।
আমি লক্ষ্য করলাম জনাব সালাউদ্দিন এর নির্বাচনী পোস্টারেও বি এন পি’র সমর্থক গোষ্ঠী ৯৫% আসলাম চৌধুরীর পক্ষে কমেন্ট করছেন। আমি বলছিনা যে,জনাব সালাউদ্দিন অযোগ্য প্রার্থী, তিনি বয়সে তরুণ,ব্যক্তিগতভাবেও সজ্জন মানুষ,তার বড় ভাই মহিউদ্দিনও খুব ভদ্র ও সজ্জন মানুষ কিন্তু আসলাম চৌধুরীর মত গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করার সক্ষমতা এখনও তার হয়নি। তাঁকে আরও অপেক্ষা করতে হবে।
এছাড়াও আসলাম চৌধুরী এক সময় উত্তর জেলা বিএনপি’র আহবায়ক ছিলেন, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিন ছিলেন বর্তমানেও দলের চেয়ারপারসন এর উপদেষ্টা।
রাজনৈতিক প্রটৌকলেও তার অবস্থান অনেক শীর্ষে।
সীতাকুণ্ডের মাঠেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি, এক কথায় বলা যায় তিনি চট্টগ্রামে জাতীয়তাবাদী দলের জননন্দিত ও অবিসংবাদিত নেতা।
রাজনীতিতে ভিন্ন মত, মত পার্থক্য থাকবে। এমন নয় যে আমি বিএনপি’র কোনো কর্মী বা সমর্থক, চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুণ্ড নির্বাচনী এলাকার একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি আমার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরলাম। আমি প্রত্যাশা করি প্রত্যেক দলেই ত্যাগী ও গ্রহণযোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন করা হোক,তাহলেই জনগণের ইচ্ছার সঠিক প্রতফলন ঘটবে।
পরিশেষে শুধু এইটুকুই বলবো-
ত্যাগী কর্মীদের বঞ্চনা শুধু একটি অন্যায় নয়—
এটি দলের আত্মহত্যার পথ।
আওয়ামী লীগ বা বিএনপি—
যে দলই এই প্রবণতা বদলাতে পারবে,
যে দল আবার তৃণমূলের ত্যাগীদের মর্যাদা দেবে,
তারাই টিকবে আগামী রাজনীতিতে।
কারণ রাজনীতির আসল শক্তি ক্ষমতায় নয়—
মানুষের ভালোবাসায়। আর সেই ভালোবাসা একমাত্র ত্যাগীরাই অর্জন করতে পারে।
লেখক- কথাসাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক

