শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

[the_ad id='15178']

 আজ মধ্যরাতে ইলিশ ধরতে নদীতে নামবেন জেলেরা

বিশেষ প্রতিবেদক

মা-ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে । আজ শনিবার মধ্যরাত থেকেই সাগর ও নদ-নদীতে জাল ফেলা শুরু করবেন জেলেরা। এরই মধ্যে মাছ ধরতে যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে অপেক্ষায় রয়েছেন দেশের লাখ লাখ জেলে। তাদের প্রত্যাশা, নিষেধাজ্ঞা শেষে রূপালি ইলিশে ভরবে জেলের জাল, তাদের মুখে ফিরবে হাসি।

- Advertisement -

ইলিশের প্রজনন নিরাপদ রাখতে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনাসহ দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে গত ৪ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছিল ২২ দিনের ইলিশ আহরণ নিষেধাজ্ঞা। এসময় নদীতে মাছ ধরা, বিক্রি, পরিবহন ও মজুত সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর শনিবার (২৫ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে একবুক আশা নিয়ে নদীতে নামবেন জেলেরা।

- Advertisement -shukee

শেষ সময়ে কেউ মেরামত করছেন নৌকা, কেউবা পুরোনো জাল সেলাই করে নিচ্ছেন নতুন করে। চোখে মুখে আনন্দের অনুভূতি থাকলেও আশানুরূপ ইলিশ পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন জেলেরা। তারা বলছেন, এবছর ভরা মৌসুমেও নদীতে ইলিশের দেখা মেলেনি। আর এখন মৌসুম শেষ। জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পেলে কষ্টের পাল্লা ভারী হবে।

এদিকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন জেলে পরিবারকে খাদ্য সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হয়। কিন্তু তা ছিল জেলেদের কাছে অপ্রতুল। ওই সময় জীবিকা হারিয়ে চরম কষ্টে পড়েন জেলেরা।

চাঁদপুর সদরের আনন্দ বাজার এলাকায় মেঘনা পাড়ের জেলে মজিব দেওয়ান বলেন, ‘সরকার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিসে, আমরা পালন করেছি। কিন্তু কিছু অসাধু জেলে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নদীতে ইলিশ শিকার করেছে। যার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে ইলিশের প্রজনন সময়। আমরা এখন একবুক আশা নিয়ে নদীতে নামার অপেক্ষা করছি। আল্লাহ কবুল করলে নদীতে ইলিশ পাবো, না হলে ঋণের বোঝা বাড়বে।’

চাঁদপুর সদরের সফরমালী এলাকার জেলে জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা শেষ মুহূর্তে জাল সেলাই ও নৌকা মেরামত করছি। নৌকা নদীর কাছে নিয়ে এসেছি, এখন নদীতে শুধু মাছ ধরবো। আমরা ইলিশের পাশাপাশি নদীর অন্য মাছও ধরি। তবে নদীতে মাছ আছে কিনা বুঝতে পারছি না। না থাকলে সংসার চালাবো কী করে?’

চাঁদপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এই বছর পদ্মা-মেঘনা নদীতে মা ইলিশ রক্ষায় কঠোর অভিযান পরিচালনা হয়েছে। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি, যাতে মা ইলিশ ডিম ছাড়তে পারে। এ বছর চারশোর মতো অভিযান চালিয়েছি। যারা আইন অমান্য করেছে তাদের জেল জরিমানা করেছি। নিষেধাজ্ঞার সময়ে প্রত্যেক জেলেকে খাদ্য সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আমরা তাদের উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করার চেষ্টা করেছি, যাতে মাছ না ধরে।

তিনি আরও বলেন, আমরা মনে করি, চাঁদপুরে মা ইলিশ রক্ষা অভিযানটি সফল হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও চাঁদপুরে সেই তুলনায় তেমন ঘটনা ঘটেনি। এই বছর মা ইলিশ ডিম যেভাবে ছেড়েছে, ডিমগুলো জাটকা থেকে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারলে ইলিশের লক্ষ্যমাত্রা বাড়বে বলে জানান তিনি।

বিশেষ করে জেলেদের মনে নতুন করে বাসা বেঁধেছে বন ও জলদস্যু আতঙ্ক। বর্তমানে বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবন অঞ্চলে অন্তত ২০টি দস্যুবাহিনী সক্রিয় রয়েছে। সাগরে ট্রলার নিয়ে নামলেই এসব দস্যু বাহিনী হামলে পড়ার আশঙ্কা করছেন জেলেরা। এর পরও সব ভয় আর আতঙ্ক উপেক্ষা করে জীবিকার সন্ধানে গভীর সাগরে যেতে হবে তাঁদের।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে শরণখোলা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, অর্ধশতাধিক ফিশিং ট্রলার ঘাটে ভিড়ে আছে।

জেলেরাও সবাই কর্মব্যস্ত। কেউ ট্রলারে জাল তুলছেন, কেউ বরফ ভরছেন। আবার কেউ খাদ্যসামগ্রী ও জ্বালানি তেল তুলছেন ট্রলারে। এ সময় এফবি বিসমিল্লাহ ট্রলারের মাঝি উপজেলার নলবুনিয়া গ্রামের জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা ঝড়-বন্যার মধ্যে এবং ডাকাতের মুখে থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সাগরে মাছ ধরি। কিন্তু আমরা সরকারের তেমন কোনো সুবিধা পাই না। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও খোন্তাকাটা ইউনিয়নের বহু জেলে এখন পর্যন্ত চাল পাননি।’

আমড়াগাছিয়া গ্রামের জেলে রুবেল তালুকদার, রাজৈর গ্রামের শামীম বয়াতি, চালরায়েন্দা গ্রামের শাহীন তালুকদার, পূর্ব খোন্তাকাটা গ্রামের ইব্রাহীম খান ও সাইদুল ইসলাম জানান, ‘আমরা প্রকৃত জেলে হওয়া সত্ত্বেও আমাদের কার্ড হয়নি। আমরা সরকারি কোনো সুবিধা পাই না। বিভিন্ন অবরোধের সময় আমাদের খুব কষ্ট হয়। মহাজনদের কাছ থেকে ধারদেনা এবং সুদে টাকা এনে সংসার চালাতে হয়।’

শরণখোলার মৎস্য ব্যবসায়ী দেলোয়ার ফরাজী, বেলায়েত খান ও ইমাদুল ফরাজী বলেন, বর্তমানে সাগর ও সুন্দরবনে দস্যুদের উৎপাত বেড়েছে। দস্যুরা একবার ধরলে দু-তিন লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়। দস্যু আতঙ্ক মাথায় নিয়ে এখন সাগরে যেতে হচ্ছে জেলেদের।

শরণখোলা সমুদ্রগামী ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘দস্যুদের কারণে আমাদের ফিশিং ব্যবসা পূর্বের মতো আবার হুমকির মুখে পড়বে। দস্যু দমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই প্রশাসনের কাছে।’

শরণখোলা উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন সরকার বলেন, শরণখোলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ছয় হাজার ৮১৪ জন। এর মধ্যে সরকারি সুবিধাভোগী জেলের সংখ্যা চার হাজার ৪৫৯ জন। এসব জেলের প্রত্যেককে ২৫ কেজি করে খাদ্য সহায়তার চাল দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু এলাকায় চাল বিতরণে বিলম্ব হচ্ছে। যারা এখন পর্যন্ত চাল পায়নি, তাদেরকে দুই-এক দিনের মধ্যে দেওয়া হবে।

মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জ সরকার আরো বলেন, ‘সাগরে জল ও বনদস্যুদের নতুন করে উত্থানে জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে তাদের সতর্কভাবে মৎস্য আহরণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দস্যু দমনে কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর সঙ্গে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সমন্বয় করছে।’

 

সর্বশেষ

মহান মে দিবস আজ

এই বিভাগের আরও