চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ২৯ জন প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু। ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর ১৫ জন কন্যাশিশু খুন হয়েছে ও ৫ জন আত্মহত্যা করেছে।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) সারা দেশে ৩৯০ কন্যাশিশু ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০২৪ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২২৪ জন। এছাড়া নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫৪ কন্যাশিশু। আর শিশু আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১০৪টি। এ সময়ে ৩৪ জন শিশু অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে। যা ২০২৪ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের কন্যাশিশুর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতার চিত্র পর্যবেক্ষণ বিষয়ক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য ওঠে এসেছে। শনিবার (৪ অক্টোবর) প্রেস ক্লাবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছে এডুকো বাংলাদেশ। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও ফোরামের গবেষণা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে মোট ৫৪ জন কন্যাশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে, যা গতবছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৮টি। তবে ২০২৩ সালে ছিল আরো বেশি, ১১৭ জন। এসব যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে পথে-ঘাটে, যানবাহনে, বাজারে, পাবলিক প্লেসে, এমনকি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বাসা বাড়িতে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ২৯ জন প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু। ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর ১৫ জন কন্যাশিশু খুন হয়েছে ও ৫ জন আত্মহত্যা করেছে।
২০২৪ সালের একই সময়ে ২২৪ জন এবং ২০২৩ সালে ৪৯৩ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়। গত ৮ মাসে ১৩৪ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৩২ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে চার মাস থেকে এক বছর বয়সের শিশু। অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে ৩৪ জন কন্যাশিশু, তার মধ্যে অপহরণের শিকার ১৮ জন কন্যাশিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ২০২৪ সালে একই সময়ে ১৯ জন এর শিকার হয়েছিল।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের প্রথম আট মাসে যেখানে ১০ জন শিশু গৃহকর্তার হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে সেখানে এ বছর মাত্র একটি ঘটনা ঘটেছে। গেল বছরের তুলনায় কমেছে শিশু আত্মহত্যাও। ২০২৫ সালের আট মাসে ১০৪ জন কন্যাশিশু আত্মহত্যা করেছে, যা গত বছরের চাইতে কম (১৩৩টি)। এর মধ্যে অন্যের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে ৩২ জন, অভিভাবকের মতের সঙ্গে অমিল হওয়ার কারণে ২৬ জন, পারিবারিক কলহের কারণে ২১ জন, প্রেমের সম্পর্কের প্রভাবে ৯ জন এবং অজানা কারণে ১২ জন আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, স্বামী-স্বামীর পরিবারের সদস্যদের নির্যাতন এবং পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও অন্যান্যদের উপহাসের কারণে ১ জন করে মোট ৪ জন আত্মহত্যা করেছেন। গত বছর প্রথম ৮ মাসে ১৩৩ জন কন্যাশিশু আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
তবে এ বছর হত্যার ঘটনা বেড়েছে। ২০২৫ সালের ৮ মাসে ৮৩ জন কন্যাশিশু খুন হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৮১ জন। এর মধ্যে ধর্ষণের পর ১৫ জন, যৌতুকের জন্য ৪, পারিবারিক নির্যাতনে ৩১, পূর্ব শত্রুতার কারণে ৯ জন ও প্রেমের সম্পর্কের কারণে ৫ জন খুন হয়েছেন। ১৯ জন কন্যাশিশুর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। এছাড়া ৫০ জন কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে- যা গত বছরের একই সময়ের চাইতে আড়াই গুণ বেশি। ২০২৪ সালের জানুয়ারি-আগস্টে ২০ জন কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে, যাদের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায়নি।
গত ৮ মাসে ১৯ জন কন্যাশিশু নিজগৃহে ও স্বামীগৃহে সহিংসতার শিকার হয়েছে। গত ৮ মাসে ৪ জন কন্যাশিশু যৌতুকের জন্য খুন হয়েছেন এবং ১ জন যৌতুকের জন্য নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। এ সময়ে পানিতে ডুবে মারা গেছে ২০৫ জন কন্যাশিশু, যা গত বছর একই সময়ে ১৮৭ জন ছিল।
প্রতিবেদনে কন্যাশিশু ধর্ষণ, নির্যাতনের অন্যতম কারণ হিসেবে আইন বাস্তবায়নে শিথিলতাকে দায়ী করা হয়েছে। কন্যাশিশু নির্যাতনে বন্ধে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা, প্রচলিত আইনের বিধান সংশোধন করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গঠনে কঠোর নির্দেশনা মনিটরিংয়ের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা, নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া বন্ধ করা, শিশু সুরক্ষায় পৃথক অধিদপ্তর গঠন, সব ধরনের পর্নোগ্রাফিক সাইট বন্ধ করা, সাইবার বুলিংয়ের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানা সুপারিশ দিয়েছেন।

