দেশের কয়েকহাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কারণে যুগ যুগ ধরে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার মারাত্মক ক্ষতি হলেও এ নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। অতীতে বিভিন্ন সময়ে জেলা ও উপজেলাসদরে সরকারিভাবে স্বতন্ত্র পাবলিক পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি।
২০১৭ সালে ডিসি সম্মেলনে প্রত্যেক উপজেলায় আলাদা পরীক্ষাকেন্দ্র করার সুপারিশ করেছিল জেলাপ্রশাসকেরা। এই প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিয়ে পরের বছর উপজেলাসদরে স্বতন্ত্র পাবলিক পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের জন্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. মহিউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে একটি সভা হয়। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে স্বতন্ত্র পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রকল্পের সম্ভাব্যতা পরীক্ষানিরীক্ষা করতে শিক্ষাপ্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালাকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে উপজেলাভিত্তিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা, অবকাঠামো, কতগুলো কেন্দ্রে ও ভেন্যুতে পরীক্ষা নেয়া হয় এসব বিষয় পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কেননা, উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণ মানুষের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে থাকে; মন্ত্রী-এমপি ও বড়লোকদের ছেলেমেয়েরা এখানে লেখাপড়া করে না। তাই, তীব্র প্রয়োজনীয়তা থাকা সত্ত্বেও উপজেলা সদরে আলাদা করে পাবলিক পরীক্ষার্থীদের জন্যে পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়নি। মন্ত্রী-এমপি ও ওপরতলার লোকদের ছেলেমেয়েরা যদি উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করতো তাহলে অনেক আগেই উপজেলাসদরে স্বতন্ত্র পাবলিক পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হতো।

যেসব কেন্দ্রে এসএসসি ও এইচএসসি দুটো পরীক্ষাই হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া অনেক কেন্দ্রে বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার কারণে বন্ধ থাকে অন্তত ১০ দিন। ছুটিতে ছুটিতেই কেটে যায় এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের। আবার পাঠদানের সময় কম পাওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তেমন কোনো উদ্যোগও নেই। সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া শিক্ষাবর্ষের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৭০ দিন নানা ছুটিতে পাঠদান বন্ধ থাকে। এছাড়া শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময় পাঠদান বন্ধ থাকে। পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা সারা দেশের কয়েক হাজার স্কুল-কলেজ প্রতিবছর পরীক্ষা চলাকালীন গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ দিন বন্ধ থাকে। এ সময়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ওসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সারা বছরের শিক্ষাসূচি। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের থেকে পিছিয়ে পড়ে। বাস্তবতা হলো, স্কুল-কলেজের টার্ম পরীক্ষা, সমাপনী পরীক্ষা ইত্যাদি মিলে দীর্ঘ বিরতি ঘটে নিয়মিত ক্লাসে। কয়েকটি কেন্দ্রে পরীক্ষা চললে তা মনিটরিং করাও কষ্টসাধ্য। কিন্তু একটা সুনির্দিষ্ট স্থাপনায় পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্র থাকায় দেশজুড়ে হাজারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাসের পর মাস বন্ধ থাকে। ফলে পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাহত হয়। ৩৬৫ দিনের মধ্যে গড়পরতা হিসেবে ১৫০ দিনের মতো ক্লাস হয়। এমনিতেই বছরে বিভিন্ন সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। তার ওপর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার মতো পাবলিক পরীক্ষার জন্য পুরো প্রতিষ্ঠানই বন্ধ রাখতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়।
২০০১-২০০৬ সময়কালে সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন নকল প্রতিরোধ আন্দোলন করতে গিয়ে দেশের সকল জেলায়-উপজেলায় স্বতন্ত্র পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এমন অবকাঠামো নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। শিক্ষাপ্রকৌশল অধিদপ্তরকে দিয়ে সম্ভ্যবতা যাচাইও করা হয়েছিলো। অর্থাভাবে ও কিছু আমলার বিরোধিতায় কিন্তু তখন সেটা বাস্তবায়ন করা যায়নি। পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোকে তিনি মাল্টিপারপাস হল হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। যাতে এখানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সকল পরীক্ষা, নিয়োগ পরীক্ষা, সভা সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি আয়োজন করা যেতে পারে। এর জন্য আলাদা জনবল নেয়ার পরিকল্পনাও তিনি করেছিলেন।
পাবলিক পরীক্ষার্থীদের স্বতন্ত্র পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের জন্যে ২০১৯ সালের ২৩ নভেম্বর জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানিতে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি রুলও দিয়েছেন। এসএসসি, এইচএসসি, ডিগ্রিসহ পাবলিক ও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় জেলা-উপজেলা সদরে স্বতন্ত্র পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে। শিক্ষা, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ বিবাদিদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা ও ডিসিদের প্রস্তাবনাকে আমলে নেয়া হয়নি। কে শোনে কার কথা। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পড়াশোনার ক্ষতির কথা কারো কানে ঢোকেনি।
পরিশেষে বলতে চাই, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হলেও এখন সবচেয়ে অবহেলিত খাত হলো শিক্ষা। অতীতে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হলেও সবই কাগজে-কলমে সীমিত; এখনও আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতি নেই। বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি জাতির ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে আছে। কালক্রমে শিক্ষা এখন পণ্য হয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষাউপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার দেশের জেলা-উপজেলা সদরে পাবলিক পরীক্ষার্থীদের জন্যে স্বতন্ত্র পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেবেন। আমরা জানি, শিক্ষার জন্যে কিছু করতে তিনি বেশ আন্তরিক। এ কাজটি যদি তিনি শুরু করে যেতে পারেন তাহলে শিক্ষার ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

