Thursday, 17 September 2026

[the_ad id='15178']

হাম থেকে শিশুদের বাঁচাতে টিকাদান এবং আক্রান্তদের আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে: সিটি মেয়র

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, প্রায় অর্ধেক শিশু নিয়মিত টিকাদানের বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছে; তাই শুধু টিকাদান নয়, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাম থেকে শিশুদের বাঁচাতে টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য চট্টগ্রামের সিআরবিতে অবস্থিত রেলওয়ে হাসপাতালটিকে হামে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এর সাথে যোগাযোগ করেছি। সেখানে হামে আক্রান্তদের অন্য রোগীদের থেকে আলাদাভাবে চিকিৎসা করলে রোগের সংক্রমণের ঝুঁকি কমবে।

- Advertisement -

বুধবার (১৬সেপ্টেম্বর) “বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাব: রোগতাত্ত্বিক চিত্র, ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্য, জিনগত বিশ্লেষণ এবং মা ও শিশুর অ্যান্টিবডির অবস্থা” (“Measles Outbreak 2026 in Southern Bangladesh: Epidemiological Profile, Clinical Characteristics, Genetic Analysis with Maternal & Child Antibody Status”) শীর্ষক গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।

- Advertisement -shukee

প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং আগের কয়েক বছরের ব্যর্থতার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ভ্যাকসিনেশন ও আইসোলেশন দুটোই নিশ্চিত করতে হবে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও এত রোগী কেন। যেহেতু হাম উচ্চ সংক্রমণশীল, তাই মূল কাজ এখন আইসোলেশন। শিশুর মায়েদের পুষ্টিও নিশ্চিত করতে হবে। রেলওয়ে হাসপাতালকে যদি ডেডিকেটেড হামের হাসপাতাল করা যায় তাহলে সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। স্বাস্থ্য বিভাগ উদ্যোগ নিলে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আমরা সব রকম সহযোগিতা করব।

চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০০ জন শিশুকে নিয়ে যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনের গবেষণায় রিসার্চ কোলাবরেটর হিসেবে ছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ। গবেষণায় দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত ৩০০ জন শিশুর মধ্যে ৮৫.২ শতাংশই ছিল টিকাবিহীন। তাছাড়া শিশুদের শারীরিক জটিলতা ও হামে আক্রান্ত হওয়ার পেছনের কারণ হিসেবে অপুষ্টির বিষয়টি উঠে এসেছে। এসব শিশুর দেহে শতভাগ ক্ষেত্রে ‘বি৩ জেনোটাইপ’ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। পুরো গবেষণা প্রকল্পে ফান্ডিংয়ে সহায়তা করেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

গবেষণাটির প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর হিসেবে ছিলেন ডাঃ কামরুন নাহার, সহযোগী অধ্যাপক, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ। হাম প্রাদুর্ভাবের সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হাম আক্রান্ত ৩০০ জন শিশুকে গবেষণার আওতায় আনা হয়।

হামের উপর গবেষণা ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডাঃ মো. তসলিম উদ্দিন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ডাঃ মোহাম্মদ মুসা মিয়া, ডাঃ কামরুন নাহার, ডা. সেলিনা হক, ডা. আয়েশা বেগম, ডা. মুহাম্মাদ জাবেদ বিন আমিন চৌধুরী, ডা. সায়েদা হুমাইদা হাসান, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের ডা. আসমা ফেরদৌসী ও ডা. সানজানা ইসলাম, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ডা. এম এস জামানসহ চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানে এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার লিমিটেডর চেয়ারম্যান গোলাম বাকি মাসুদসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড ও এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান গোলাম বাকি মাসুদ বলেন, এই গবেষণা শুধু একটি প্রাদুর্ভাবের পরিসংখ্যান তুলে ধরার উদ্যোগ নয়; বরং হাম প্রতিরোধ, শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি এর জন্য প্রমাণভিত্তিক করণীয় তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। তিনি বলেন, হাম পরিস্থিতিকে আরও গভীরভাবে বোঝার একটি সমন্বিত গবেষণা প্লাটফর্ম তৈরি করতে চেয়েছি আমরা।

তিনি আরও বলেন, গবেষণার ফলাফলকে বাস্তবভিত্তিক জনস্বাস্থ্য উদ্যোগে রূপান্তর করতে হবে। গবেষণা কেবল ফলাফল প্রাপ্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; একে অবশ্যই কর্মের রূপ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে—এই প্রত্যয়ের সঙ্গে আমরা ভবিষ্যতেও গবেষণা কাজ করে যাব।

গবেষণায় অংশ নেয়া ৩০০ শিশুর মধ্যে ৪৬% এর বয়স ছিল ৯ মাসের কম—অর্থাৎ তারা নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছিল। আক্রান্তদের ৭৫.৫% গ্রামীণ এলাকার এবং ৬৪.৮% নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবারের শিশু।

গবেষণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো, ১৬৭ জন (৮৫.২%) শিশু টিকাবিহীন ছিল। তবে তাদের মধ্যে ৯১ জন তখনও নিয়মিত টিকাদানের বয়সে পৌঁছায়নি। টিকাবিহীন শিশুদের মধ্যে টিকা না নেয়ার প্রধান কারণ হিসেবে সচেতনতার অভাব বা টিকার তারিখ ভুলে যাওয়া (৫২%) উঠে এসেছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, মাত্র ৬৩ জন (৩২.১%) শিশু গত ছয় মাসে ভিটামিন এ সম্পূরক পেয়েছিল। একইসঙ্গে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু ভয়াবহ পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল।

গবেষণায় ৩০০ জন শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১% শিশুর বয়স ছিল ৬ মাসের কম এবং ২৩.৫% শিশু ১ থেকে ৫ বছর বয়সী। তবে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ৪৬% শিশুর বয়স ৯ মাসের নিচে। সাধারণত ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম টিকা দেয়া হয়, অর্থাৎ তারা টিকা নেয়ার বয়সের আগেই আক্রান্ত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে আক্রান্তদের বয়স ২ মাস থেকে ১১ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

প্রাদুর্ভাবের বড় একটি অংশ গ্রামীণ এলাকার সাথে সম্পর্কিত। গবেষণায় দেখা গেছে ৭৫.৫% (১৪৮ জন) শিশু গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসেছে। এছাড়াও ৬৪.৮% (১২৭ জন) শিশু নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থা থেকে আসা- যা প্রমাণ করে যে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই ভাইরাসের চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

হামের তীব্রতা বৃদ্ধিতে পুষ্টিহীনতা বড় একটি নিয়ামক। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩১%, ৫১ জন) তীব্র বা একিউট পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। এছাড়া ১৮.৯% (৩৭ জন) শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ (Exclusive Breastfeeding) খাওয়ানো হয়নি, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে।

আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মাত্র ১৬.৩% (৩২ জন) শিশুর পূর্বে হামে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এই সংক্রমিত শিশুদের মধ্যে ৫৯.৪% শিশুই কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে হামে আক্রান্ত হয়েছে- যা হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরে।

হাম থেকে বাঁচার অন্যতম উপায় টিকা হলেও, আক্রান্তদের ৮৫.২% (১৬৭ জন) শিশুই টিকা নেয়নি। এর মধ্যে ৪৬% শিশুর তো টিকার বয়সই হয়নি। বাকি যারা টিকা নেয়নি তাদের মধ্যে ৫২% অসচেতনতা বা তারিখ ভুলে যাওয়ার কারণে, ৩০% শিশু অসুস্থ থাকার কারণে, ৮% মায়ের অসুস্থতার কারণে এবং ৪% টিকার ভয় ও বাকি ৪% কার্ড হারিয়ে ফেলার কারণে টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

ভিটামিন ‘এ’ হামের মারাত্মক জটিলতা প্রতিরোধে সহায়তা করে। কিন্তু আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মাত্র ৩২.১% (৬৩ জন) শিশু গত ছয় মাসে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেয়েছে, যা একটি বড় ধরনের ঘাটতি নির্দেশ করে।

হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে জ্বর, র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি, কাশি, সর্দি এবং চোখ ওঠার মতো লক্ষণগুলো ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। রোগীদের জ্বরের গড় স্থায়িত্ব ছিল ৭.৩০ দিন এবং ফুসকুড়ি থাকার গড় স্থায়িত্ব ছিল ৫.৬৪ দিন।

গবেষণায় ৯১ জন (৯৪.৮%) মায়ের Measles IgG positive পাওয়া যায় এবং ৩৬ জন (৩৭.৫%) মা পূর্বে হাম টিকা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে maternal IgG status-এর সঙ্গে severe disease বা pneumonia-এর ক্ষেত্রে statistically significant association পাওয়া যায়নি।

যেসব শিশু ভিটামিন ‘এ’ পায়নি, তাদের মধ্যে ৫৯% শিশুর মারাত্মক ও তীব্র জটিলতা দেখা দিয়েছে। গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয় যে, শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো হামের তীব্রতা কমাতে পুরোপুরি সক্ষম নয়, এর সাথে অন্যান্য চিকিৎসা ও পুষ্টি অপরিহার্য।

প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়— মাঝারি বা তীব্র পুষ্টিহীনতা, গ্রামীণ বা বস্তি এলাকায় বসবাস, দরিদ্রতা, অতিরিক্ত জনবহুল ঘর এবং ভিটামিন ‘এ’ এর অভাব মারাত্মক জটিলতার ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।

চূড়ান্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাঝারি বা তীব্র পুষ্টিহীনতাই ছিল মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টির সবচেয়ে শক্তিশালী এবং স্বাধীন কারণ। পাশাপাশি গ্রামীণ পরিবেশ এবং অপর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ঘুপচি ঘরও এই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়েছে।

টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের তুলনায় টিকাবিহীন শিশুদের মারাত্মক জটিলতায় ভোগার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ ছিল। সবচেয়ে স্বস্তির ও উল্লেখযোগ্য খবর হলো, যারা টিকা নিয়েছিল তাদের মধ্যে একজন শিশুরও মৃত্যু হয়নি।

যেসব মায়েদের হামের টিকা নেয়ার কোনো ইতিহাস ছিল না, তাদের শিশুদের মধ্যে ৫৫% শিশুই মারাত্মক হামের জটিলতার শিকার হয়েছে। যদিও পরিসংখ্যানগত দিক থেকে এটি পুরোপুরি তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে প্রমাণিত হয়নি, তবে এর প্রভাব অস্বীকার করার মতো নয়।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও