খারিজ করা রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপীল করে হেরে যাওয়ার পরও একই বিষয় নিয়ে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বহিষ্কৃত সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরী নিম্নআদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। ১২ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির তত্ত্বাবধায়ক কমিটি, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পরিচালককে বিবাদী করে চট্টগ্রামের তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির তত্ত্বাবধায়ক কমিটির বিরুদ্ধে তিনি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনেও রিট পিটিশন করেছেন। চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তরের আদেশ অমান্য করে অবৈধভাবে সঠিত কমিটিকে (২০২৫-২৮) আইনী ভিত্তি দিতে তিনি আবারও নিম্ন ও উচ্চআদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জাহাঙ্গীর চৌধুরী মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। আইনগতভাবে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি না হয়েও ‘সভাপতি’ হিসেবেই তিনি মামলার বাদী হয়েছেন। এটি একটি জঘন্য অপরাধ। এখনও পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির প্যাড সীল ব্যবহার করে নানান অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জাহাঙ্গীর চৌধুরী চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া অবৈধ কমিটি দিয়ে ডায়াবেটিক হাসপাতাল পরিচালনা করেছেন। বিভিন্ন সময়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সাংবাদিকদের মিথ্যা তথ্য প্রদান ও গলাবাজি করতে তার জিহবা আড়ষ্ট হয় না। অথচ চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় থেকে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে নির্দেশ দেয়া হলেও তিনি তা দেননি। তিনি ও তার সহযোগিরা প্রকাশ্যে বলে আসছেন সেবামূলক সংগঠন পরিচালনা করতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। অথচ ১৯৬১ সালের সমাজসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ অনুযায়ী ১৯৭৮ সাল থেকে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।

চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তরের তদন্তে জাহাঙ্গীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। জাহাঙ্গীর চৌধুরী হাইকোর্টে রীট করলে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি ২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি স্থগিত করা হয়। প্রায় দুবছর পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ দীর্ঘ শুনানী শেষে মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও দেবাশীষ রায় চৌধুরী তার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির বৈধ কার্যকরী কমিটি না থাকায় উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে ১৬জুন ২০২৫ তারিখে চট্টগ্রাম সমাজসেবা কার্যালয় চট্টগ্রাম অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হককে আহবায়ক ও চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যলয়ের সহকারী পরিচালক ঊর্বশী দেওয়ানকে সদস্যসচির করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তত্ত্বাবধায়ক কমিটি গঠন করে। ২২ জুন ২০২৫ থেকে এ কমিটি চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতাল পরিচালনা করছে। ভোটার নিবন্ধনের কাজ শেষ হয়েছে। যেকোনো সময় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। তত্ত্বাবষায়ক কমিটি নির্বাচিত কমিটির কর্মকর্তাদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে।
জাসাঙ্গীর চৌধুরী সমাজসেবা কার্যালয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ২০২৫- ২৮ মেয়াদের যে অবৈধ পকেট কমিটি করেছেন সেই কমিটির সদস্য মেজর (অবঃ) মো. এমদাদুল ইসলাম চাটগাঁর বাণীকে মুঠোফোনে বলেছেন ‘চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতাল পরিচালনা পর্ষদের সাথে আমাকে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে নানা অনিয়ম দুর্নীতি ও নোংরামি দেখে আমি বিস্মিত ও হতাশ। একটি সেবামূলক সংগঠনে এসব থাকতে পারে তা আমি ভাবতেই পারিনি। তাই চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতি তথা হাসপাতালের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। একই কমিটির কোষাধ্যক্ষ এস এম জাফরকে আদালতে মামলার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন,” আমি কিছুই জানি না। এসব নিয়ে আমি আর ভাবতেও চাই না।” এই কমিটির আরও কজন সদস্যের সাথে কথা বলেছি। সকলের বক্তব্যের সুর একটাই- এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারবো না, সভাপতিই (জাহাঙ্গীর চৌধুরী) ভালো বলতে পারবেন।
এদিকে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির বেশ কয়েকজন আজীবন সদস্য চাটিগাঁর বাণীকে বলেন, “জাহাঙ্গীর চৌধুরী দু’যুগ ধরে হাসপাতালকে পকেট কমিটির মাধ্যমে একক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। নিজের দুর্নীতিকে ধামাচাপা দিতে যুগের পর যুগ সংবাদমাধ্যম ও হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সকলকে মিথ্যাকথা-ই বলে আসছেন। হায়া-শরম বলতে তার কিছুই নেই। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দ্বারা অপমান অপদস্ত হয়েও হাসপাতাল নিয়ে তিনি নানান ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। নিজের স্বার্থে মামলা-মোকাদ্দমা করে হাসপাতাল তহবিলের লাখ লাখ টাকা অপচয় করেছেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আইনী লড়াইয়ে হেরে হাসপাতাল থেকে বিতাড়িত হয়েও তিনি আবার চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এসব করে তিনি সকলকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, তিনি আইনী লড়াইয়ে আছেন, তিনি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি করেননি সবই তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার।”

