মানুষগড়ার কারিগর শিক্ষকসমাজ পাঁচদিন ধরে রাজপথে তাদের দাবি আদায়ের জন্যে আন্দোলন করছে। যুগের পর যুগ বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকেরা তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্যে আন্দোলন করে আসলেও অতীতের কোনো সরকার দাবি পূরণ করেনি।
২০শতাংশ বাড়িভাড়া, ১৫০০ টাকা চিকিৎসাভাতা ও ৭৫ শতাংশ উৎসবভাতা বৃদ্ধিসহ শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারিদের আন্দোলন চলছে। কেন্দ্রীয় শহিদমিনারে খোলা আকাশের নিচে রাতযাপন, সমাবেশ, মার্চ টু সচিবালয়, আন্দোলনরত শিক্ষক- করমচারিরা গতকাল আন্দোলনের চতুর্থদিনে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙ্গে শাহবাগে সমবেত হয়ে দাবি আদায়ের সমর্থনে লংমার্চ ও মিছিল স্লোগান দিয়েছেন। আজ দুপুরে শহিদমিনার থেকে যমুনা অভিমুখে যাত্রা শুরু করবে শিক্ষক- কর্মচারিরা। দাবিপূরণের সরকারি প্রজ্ঞাপন না দেয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষকনেতারা। প্রশ্ন হচ্ছে, যে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা কেন তারা রাজপথে, খোলা আকাশের নিচে, রোদে পুড়বেন, বৃষ্টিতে ভিজবেন? মাধ্যমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণে সরকারের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে কিন্তু শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি তো শতভাগ যৌক্তিক। পাঁচদিন ধরে শিক্ষকেরা রাজপথে আন্দোলন করে আসলেও শিক্ষামন্ত্রকের কর্তাব্যক্তিরা নাকে তেল দিয়ে কেন গুমোচ্ছেন। কেন শিক্ষক-নেতাদের নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসে তাদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে কথা বলছেন না। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার বারোটা বাজলেও শিক্ষকদের সমস্যা নিয়ে কথা বলার প্রয়োজনবোধ করছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অতীতের সরকারগুলো যেমন আচরণ করতো শিক্ষকদের প্রতি বর্তমান অন্তবর্তী সরকারও ঠিক একই আচরণ করছে। শিক্ষকদের লাঠিপেটা, সাউন্ডগ্রেনেড, জলকামান ব্যবহার, শারীরিক লাঞ্ছনা করা জাতির জন্যে বড় লজ্জার।

নানামুখি সমস্যা ও বৈষম্যের শিক্ষার বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মচারিরা। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা একই পাঠক্রমে একই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ান। কিন্তু তাদের বেতন-ভাতা ও সুবিধাদি এক নয়। বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বর্তমানে মূল বেতনের শতভাগ পেলেও বাড়িভাড়া, চিকিৎসাভাতা ও উৎসবভাতার ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল ফারাক। সরকারি শিক্ষকেরা মূলবেতনের ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া পান। আর এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা পান মাত্র একহাজার টাকা। সরকারি শিক্ষকের উৎসবভাতা মূলবেতনের সমান। বেসরকারি শিক্ষকেরা পান মাত্র ৫০ শতাংশ। চিকিৎসাভাতা দেয়া হয় মাত্র ৫শ টাকা। শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতনভাতা না দিলে কীভাবে ভালোমানের পাঠদান আশা করা যায়। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে ১৫ দিন অনশন করেছিলেন বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকেরা। তখন বলা হয়েছিল শিক্ষকদের জাতীয়করণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষাখাতে বাংলাদেশে বরাদ্দ যেমন কম তেমনি কম শিক্ষকদের বেতন-ভাতাও। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে নয় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ- সর্বস্তরেই বাংলাদেশে শিক্ষকদের বেতন তুলনামূলক কম। অথচ উন্নত জাতি গড়ে তোলার জন্যে উন্নত শিক্ষা জরুরি। আর উন্নত শিক্ষার জনো যে দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক প্রয়োজন ভালো বেতনভাতা না দিলে সেটি পাওয়া সম্ভব নয়।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, স্বাধীনতা অর্জনের ৫৪বছর পরও বাংলাদেশের কোনো শিক্ষানীতি নেই। বিভিন্ন সরকারের আমলে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। বৈষমামূলক শিক্ষানীতি জাতির ঘাড়ে চেপে আছে।
লেখক- প্রধান-সম্পাদক, চাটগাঁরবাণীডটকম

