চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক কিশোর অটোরিক্সা চালককে হত্যা করে অটোরিক্সা ছিনিয়ে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
মঙ্গলবার রাতে এ ঘটনার পর বুধবার (১ অক্টোবর) রক্তমাখা অটোরিক্সা বিক্রি করতে গেলে এলাকাবাসী দুই ছিনতাইকারীকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে।

সীতাকুণ্ড পৌর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি মো. আলাউদ্দিন প্রতিনিধিকে জানায়, বাপ্পি,রাজিব নামে (শালা-দুলাভাই) দুইব্যক্তি মঙ্গলবার রাত সাড়ে এগারটা-বারোটার সময় যাত্রী বেশে সীতাকুণ্ড সদর থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে পন্থিছিলা যাওয়ার কথা বলে হাবিবুর রহমান জিহাদ (১৫) এর অটোরিক্সা ভাড়া করে। ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড শেখপাড়া ময়লার ডিপোর কাছাকাছি নিরিবিলি জায়গা নিয়ে চালক জিহাদকে পেছন থেকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে কুপিয়ে হত্যা করে মহাসড়কের পাশে ডোবায় লাশ ফেলে অটোরিক্সাটি নিয়ে যায়। রাতে জিহাদ বাসায় না ফিরলে পরিবারের সবাই বিভিন্ন জায়গা খোজাখুজি করে, ভেবেছে দূরে কোথাও ভাড়া নিয়ে গেছে ।

সকালে জিহাদের অটোরিক্সা মালিক আকবরের কাছে ফোন আসে যে আপনার নম্বারটি অটোরিকশাতে পেয়ে ফোন দিলাম, অটোরিক্সাটি কি আপনার? আপনার হলে দ্রুত কদমরসুল আসেন। মালিক আকবর লোকজন নিয়ে কদমরসুল গিয়ে ছিনতাইকারী বাপ্পি (২৮) পিতা – মানিক,রাজিব (২৫) পিতা – সেলিম উভয়ের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্ধীপ উপজেলার হারামিয়ার বাসিন্দা তাদেরকে নিয়ে সীতাকুণ্ড থানায় এনে সোপর্দ করেন। এসময় জনতার গণপিটুনী দিলে চালক হাবিবুর রহমান জিহাদকে খুন করে ডোবায় ফেলে দেয় বলে তারা স্বীকারোক্তি দেয়।
আজ বুধবার পুলিশ সকাল ১০টায় ঘটনাস্হলে গিয়ে জিহাদের মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসেন। পুলিশ অটোরিক্সা ছিনতাইকারী আটক দুজনকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা শেষে একজনকে থানায় নিয়ে আসেন,আরেকজনকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করেন। মামলা রুজুর পর কোর্টে প্রেরণ করবেন বলে থানা সূত্রে জানায়।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি মুজিবুর রহমান প্রতিনিধি কে জানায়, সকাল ৮ টায় খবর পেয়ে এসআই বেলালকে ঘটনাস্হলে পাঠাই,তিনি লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল করে মর্গে প্রেরণ করেন। আটক আসামীদেরকে চিকিৎসা শেষে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিকভাবে খুনের বিষয় স্বীকার করে জবানবন্দী দেয়। এক আসামীকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করেছে, আরো কেউ জড়িত আছে কী-না পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে জানা যাবে। আটক দুইজন শ্যালক -দুলাভাই সম্পর্ক। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
স্হানীয় সাবেক কাউন্সিলর সামছুল আলম জানান, জিহাদ তাঁর এলাকায় ভাড়া থাকে ও জিনিয়াস স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ছিল,পুজা উপলক্ষে সংসারের অভাব গোছাতে তার এক চাচার অটোরিক্সা ভাড়া নিয়ে চালাতে গিয়ে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন, ছিনতাইকারীরা পরিচিত বিধায় তাকে হত্যা করেছে বলে ধারণা করছেন তিনি।
এদিকে জিহাদ এর হত্যাকারীদের ফাঁসীর দাবীতে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি মো. আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে অটোরিক্সা চালকদের একটি মিছিল থানার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এসময় পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ইউছুফ নিজামী বক্তব্য রাখেন।

জিহাদের মায়ের আহাজারি
সন্দ্বীপের মুছাপুরের দিদারুল আলম গত দেড় দশক ধরে সীতাকুণ্ড পৌরসদরের মডেল থানার পেছনে ছোবহানবাগ এলাকায় স্ত্রী ও জিহাদ এবং জিহান দুই ছেলে নিয়ে ভাড়াবাসায় বসবাস করেন। একটি চায়ের দোকানে চাকরিরত আলম একদশক আগে অন্যত্র বিয়ে করে আলাদা সংসার শুরু করেন। এরপর দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে ভীষণ বেকাদায় পড়েন আলম এর স্ত্রী। বাসাভাড়া ও দুই সন্তানের আহার ও ভরণপোষণ যোগাতে তিনি বাসার আশপাশের পরিচিতজনের বাসায় ভুয়ার কাজ শুরু করেন। দুই ছেলেকে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করান। স্বপ্ন ছিলো সন্তানেরা বড় হয়ে মায়ের দুঃখ গোছাবে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস বড় ছেলে জিহাদ মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আর ছোট ছেলে প্রাথমিকে । পূজা উপলক্ষে স্কুল বন্ধ হওয়ায় গত কিছুদিন থেকে তার এক চাচার অটোরিক্সা নিয়ে চালানো শিখে। কয়েকদিন যেতে না যেতেই ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে জিহাদের জীবন প্রদীপ নিভে যায়। ছেলের আকস্মিক মৃত্যুতে মা এখন পাগলপ্রায় । সন্তানহারা মায়ের আহাজারিতে ছোবহানবাগ এলাকা শোকের মাতম চলছে।

