আদালতের রায়ের সার্টিফাইড কপি পাওয়ায় চট্টগ্রাম সমাজসেবা কার্যালয় চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়ক কমিটি গঠন করেছে। ১৬জুন ২০২৫ তারিখে চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ফরিদুল আলম স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে বলা হয়, সমাজসেবা অধিদপ্তরাধীন নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা “চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতি” (রেজি নম্বর৬৯৫/৭৮) এর বৈধ কোনো কার্যকরী কমিটি না থাকায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের স্মারক নম্বর ৪১.০১০০০০.০৪৬.২৭.০০২৫.২২.৪৭৭ তারিখ: ০৪.০৬.২০২৫ খ্রিস্টাব্দ মূলে জারিকৃত নির্দেশনার আলোকে স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ধারা ৯ এর উপধারা (২) অনুসারে চট্টগ্রাম অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হককে আহবায়ক, চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক উর্বশী দেওয়ানকে সদস্য-সচিব ও চট্টগ্রাম ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুল আনোয়ার, সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জসিম উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম শহর সমাজেসেবা কার্যালয়-৩ এর সমাজসেবা অফিসার আশরাফ উদ্দিনকে সদস্য করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক কমিটি গঠন করা হয়।

তত্ত্বাবধায়ক কমিটির কর্মপরিধি হচ্ছে, (ক). ১৯৬১ সালের স্বোচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশেন ওনিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, এতদসংক্রান্ত বিধি১৯৬২ এবংঅনুমোদিত গঠনতন্ত্র মোতাবেক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন; (খ) তত্ত্বাবধায়ক কমিটি কার্যকরী কমিটির ন্যায় সমুদয় কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন; (গ) তত্ত্বাবধায়ক কমিটি এ আদেশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে অনতিবিলম্বে গঠনতন্ত্র অনুসারে নির্বাচন কমিশন গঠনসহ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সামগ্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন; (ঘ) তত্ত্বাবধায়ক কমিটি এ আদেশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৯০(নব্বই) দিনের মধ্যে গঠনতন্ত্র অনুসারে নবনির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্বভার হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন; (ঙ) এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এর আগে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক মোস্তফা মোস্তাকুর রহিম খানকে প্রশাসক নিযোগ করা হলে তার বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীর চৌধুরী রিট আবেদন করেন। প্রায় দুবছর পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ দীর্ঘ শুনানী শেষে জাহাঙ্গীর চৌধুরীর আপীল আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। এদিকে হাইকোর্টের সার্টিফাইড কপি হাতে পেয়ে গত ১২ মে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের ৬জন জীবন-সদস্য এ হাসপাতালে প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার জন্যে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরে আবেদন করেছেন। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম সমাজসেবা কার্যালয় তত্ত্বাবধায়ক কমিটি নিয়োগ দেয়া হয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তর চট্টগ্রামের কিছু চৌকস এবং সৎ অফিসার ছিলেন বিধায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধনকৃত প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের লাগামহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্ত সম্পন্ন হয় এবং প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্ত দুযুগ ধরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরী সমাজসেবার প্রশাসক নিয়োগের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে এবং ৬মাসের স্থগিতাদেশ আনে। যার পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের কিছু নিবেদিত জীবন-সদস্য পক্ষভুক্ত হয়ে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশকে চ্যালেঞ্জ করে আপিল করেন। দীর্ঘ শুনানী শেষে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতি ফারাহ মাহাবুব ও দেবাশীষ রায় চৌধুরী আপীল আবেদন খারিজ করে দেন। এমতাবস্থায় ২০২৫-২৮ মেয়াদের কোনো বৈধ কমিটি এখন নেই। চট্টগ্রামের ডায়াবেটিক রোগীদের চিকিৎসার ভরসাস্থল এবং ৫৫০জন কর্মকর্তা-কর্মচারির কর্মস্থল এই হাসপাতালে দ্রুততম সময়ে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে স্বচ্ছ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে হাসপাতালে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা কামনা করা হয়।

চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের বেশ কজন আজীবন সদস্য চাটগাঁর বাণীকে বলেন, “হাসপাতালটিকে মহাদুর্নীতির কবল থেকে রক্ষা করতে হলে তত্ত্বাবধায়ক কমিটিকে আরও যেসব দায়িত্ব পালন করতে হবে তা হলো-১.হাসপাতালের যাবতীয় হিসাব অডিট করা। ২.সকলের অংশগ্রহণে পরিচ্ছন্ন একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। ৩.সৎ ও যোগ্য লোক দিয়ে আজীবন সদস্যদের তালিকা যাছাই করে হালনাগাদ করা। ৪.যারা অন্যায় কাজের সাথে জড়িত তাদের সকলকে আইনের আওতায় আনা। হাসপাতালে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির জন্যে জাহাঙ্গীর চৌধুরীর আজীবন সদস্যপদ বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক- যাতে অন্যকেউ এ ধরনের অপকর্ম করতে সাহস না পায়।
উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালে স্থাপিত চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতি কর্তৃক পরিচালিত এ হাসপাতালটি দুর্নীতিবাজ জাহাঙ্গীর চৌধুরীর রাহুগ্রাসে পড়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। আইনগত কোনো ভিত্তি নেই, বৈধতা নেই, ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমোদন নেই। তবুও এ জাহাঙ্গীর চৌধুরী নিজের সুবিধামতো অবৈধভাবে হাসপাতালের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে তিনি ২০০২ সাল থেকে সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির পদে বহাল থেকে একক সিদ্ধান্তে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। হাসপাতাল তহবিলের টাকায় তিনি হাজার হাজার আজীবন সদস্য করে নিজের ভোটব্যাংক সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে অন্যদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পথ অবরুদ্ধ করে রেখেছেন।সংবাদকর্মী,সন্ত্রাসীবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সকলকে “ম্যানেজ” করে তিনি প্রায় দুযুগ ধরে হাসপাতালকে দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত করেছেন। চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের তদন্তে প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ,চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের স্বঘোষিত মা-বাপ,চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির অননুমোদিত ও বহিস্কৃত সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরীর দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তর সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরীর কমিটিকে বহিস্কার করে।আইনগতভাবে তিনি ৯বছর ধরে হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সভাপতি নন। অথচ আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থাৎ সভাপতি হিসেবে তিনি তিনি রিট আবেদন করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রশাসক নিয়োগাদেশ স্থগিত করিয়েছেন। এটি আদালতের সাথে প্রতারণার সামিল।দুর্নীতির জন্যে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংবাদ শিরোনাম হয়ে আসছেন; হাসপাতাল সম্পর্কে প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমকে মিথ্যাতথ্য দিয়ে মিথ্যাকে সত্যে রূপান্তরের অপ্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন। রায়ের সার্টিফাইড কপি না আসায় আদালতের দোহাই দিয়ে এখনো অবৈধভাবে সভাপতি হিসেবে তিনি হাসপাতালে লোক নিয়োগ দিয়েছেন,চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের দিয়ে হাপাপাতাল পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেছেন। বিগত ২১ বছরে তিনি হাসপাতালে নজিরবিহীন লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছেন। সরকারি দুটি সংস্থার তদন্তে দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় তিনি আজীবন সদস্য হিসেবেও থাকার নৈতিক অধিকার নেই। অথচ এখনও তিনি পেশিশক্তির জোরে বেহায়ার মতো হাসপাতালকে নিজের করায়ত্বে রেখে অনিয়ম-দুর্নীতি অব্যাহত রেখেছেন।
লেখক, প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

