জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, গণতান্ত্রিক সংস্কার ও নির্বাচনের দাবিতে এবং বন্দরের নিউমুরিং টার্মিলাল বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বুধবার (১৪ মে) বিকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাসদ ( মার্কসবাদী) চট্টগ্রাম জেলা।
বাসদ ( মার্কসবাদী) চট্টগ্রাম জেলা কমিটির আহবায়ক শফি উদ্দিন কবির আবিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেলা কমিটির সদস্য আসমা আক্তার,জাহেদুন্নবী কনক,দীপা মজুমদার। সমাবেশ পরিচালনা করেন জেলা কমিটির সদস্য রিপা মজুমদার ।

সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত লাভজনক নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনার ভার বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত দেশের স্বার্থবিরোধী। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল তৈরি হয়েছে দেশীয় অর্থায়নে, দুই হাজার কোটি টাকায় অত্যাধুনিক গ্র্যান্টি ক্রেনসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। দেশের টাকায় সমস্ত কিছু করে এখন বিদেশীদের হাতে টার্মিনালটি তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত রহস্যজনক ও চক্রান্তমূলক। বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে,গত আওয়ামী লীগ সরকার টার্মিনালটি আরব-আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সে সিদ্ধান্ত বাতিল না করে আওয়ামী লীগ সরকারেরই পদান্ক অনুসরণ করছে। চট্টগ্রাম বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। দেশের আমদানি রপ্তানির সিংহভাগ এর উপর নির্ভরশীল। চট্টগ্রাম বন্দরের পাশে দেশের নৌঘাঁটি,বিমানঘাঁটি সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার অবস্থান। এরকম একটি স্থানে একটি বিদেশী কোম্পানিকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া ভবিষ্যতে দেশের সার্বভৌমত্বের জন্যও হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে এটাই ছিল জনগণের প্রত্যাশা। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় না গিয়ে অতীতের ফ্যাসিস্ট সরকারের মতোই স্বেচ্ছাচারী উপায়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে-যা গণঅভ্যুত্থানের চেতনা পরিপন্থী।”
নেতৃবৃন্দ জুলাইয়ের নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে বলেন,“ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পূর্নাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন,শহীদ পরিবারকে সহযোগিতা এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কাজ এখনও খুবই দুর্বল। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার কতটুকু হবে,তা নিয়েই জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে। আমরা শুরুতেই বলেছিলাম,বাছবিচারহীনভাবে যে প্রক্রিয়ায় মামলা দায়ের ও আসামী করা হচ্ছে,তাতে সত্যিকারের বিচার বাধাগ্রস্ত হবে। এগুলোতে লাভ হচ্ছে গ্রেপ্তার ও আটক বাণিজ্যে নিয়োজিত ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত লোকজনের। লাভ হচ্ছে আসল খুনি লুটেরাদের এবং শেষমেশ আওয়ামী লীগেরও।

নেতৃবৃন্দ গণতান্ত্রিক সংস্কার ও নির্বাচনের দাবিতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন,“ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানোর জন্য যত দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও লড়াই করতে হয়েছে, যে পরিমাণ রক্ত ঝরেছে- তাতে শুধু শেখ হাসিনার পতন নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে। এ কারণে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা উঠে এসেছে। তার ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১১ টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে এবং ঐক্যমত কমিশন গঠন করেছে। জুলাই ঘোষণা, প্রকাশিত ৬ টি সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে আমাদের দলের মতামত লিখিতভাবে ও আলোচনায় আমরা সরকার, ঐক্যমত কমিশন ও জনগণের সামনে তুলে ধরেছি। আমরা বলেছি,যেহেতু এটি গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব নয়; ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যমত ছাড়া প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্ভব নয়। আবার এ সরকারের পক্ষে সব সংস্কার করা সম্ভব নয়, সে জনভিত্তিও সরকারের নেই। গণঅভ্যুত্থানে শরীক শক্তিসমূহের সাথে ঐক্যমতের ভিত্তিতে অনেকগুলো সংস্কার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখনই করতে পারে। এজন্য দরকার ছিল সংস্কার ও নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা। কিন্তু সরকার তা সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট না করায় জনমনে নানা সংশয় তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করি,ঐক্যমতের ভিত্তিতে সম্ভবপর প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করে ডিসেম্বরে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব।
সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে সরকারকে নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহবান জানান।
সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল প্রেসক্লাব থেকে শুরু হয়ে আন্দরকিল্লাহ মোড়ে এসে শেষ হয়।

