রবিবার, ৩ মে ২০২৬

[the_ad id='15178']

জাহাঙ্গীরের রিট-পিটিশন খারিজ

ফের প্রশাসক নিয়োগ হচ্ছে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালে

লাইসেন্স ছাড়াই চলছে হাসপাতালের কার্যক্রম
নিজস্ব প্রতিবেদক

মোহাম্মদ ইউসুফ

- Advertisement -

অবৈধভাবে হাসপাতালের লাখ লাখ টাকা খরচ করে চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রশাসক নিয়োগের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রীট করেও শেষ রক্ষা হয়নি চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বহিস্কৃত সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরীর। তিনি  প্রশাসক নিয়োগের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে  সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে রিট আবেদন করেন। রিট পিটিশন নম্বর -১৬১০/২০২৩ ।  দীর্ঘ শুনানী শেষে গেল ১৬ ফেব্রুয়ারি মহামান্য হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও দোবাশীষ রায় চৌধুরী সুক্ষ্মভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে একটি ফলপ্রসূ রায় দেন। অর্থাৎ জাহাঙ্গীরের করা রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন আদালত। এতে করে দীর্ঘদিনের দুর্নীতিবাজ ও সরকারি অর্থ আত্মসাৎকারী জাহাঙ্গীরের অবৈধ শাসনের অবসান হলো।  চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে বিনাভোটে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির ২০২৫- ২৮ সালের যে পকেট কমিটি তিনি করেছিলেন তা-ও বাতিল করে দেন আদালত। ২০১৫ সাল থেকে যে কমিটির সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমোদন নেই, সেই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সাবেক সভাপতি আদালতে সভাপতি হিসেবে রীট-পিটিশন করার আইনগত কোনো অধিকারই নেই। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির নামে তিনি অবৈধভাবে একক নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ দুইযুগ ধরে হাসপাতাল পরিচালনা করে আসছেন। ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে আদালতে দুর্নীতির মামলা রয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রক ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল সাড়ে ২৭লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত জমা দেয়া হয়নি। চট্টগ্রাম দুর্নীতি দমন কমিশনও তার দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্ত করছে।

- Advertisement -shukee

দীর্ঘসময় ধরে হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারিরা জাহাঙ্গীর চৌধুরীর অনিয়ম, দুর্নীতি,অত্যাচার সহ্য করে আসলেও তা সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর শেষমেশ তারা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞার কারণে গত বছরের ৫ অক্টোবর জাহাঙ্গীর চৌধুরী নির্বাচনের আয়োজন করতে না পেরে অবৈধভাবে পকেট কমিটি গঠন করে সেটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সেদিন ১৪ দফা দাবী নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারিরা আন্দোলন শুরু করেন। “দুর্নীতিবাজ, অত্যাচারী ফ্যাসিস্ট জাহাঙ্গীর চৌধুরীর ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল থেকে পদত্যাগ চাই” লেখা ব্যানার নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারিরা জাহাঙ্গীর চৌধুরীর ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তাদের প্রতিরোধের মুখে ৫অক্টোবরের বিতর্কিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বানচাল হয়ে যায়। উত্তেজিত কর্মকর্তা-কর্মচারিদের চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তার দুর্নীতির সহযোগী হাসপাতাল পরিচালক নওশাদ আজগর চৌধুরী, প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমান উল্লাহ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল ও নিরীক্ষা কর্মকর্তা ইয়াছিন চৌধুরী; শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত হন তারা। সেনাবাহিনী ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে সেনা ও পুলিশ পাহারায় অবরুদ্ধ কর্মকর্তারা হাসপাতাল ত্যাগ করেন। আত্মরক্ষার্থে তার অন্য অনুসারীরাও পালিয়ে যান। বিক্ষুব্ধ কর্মচারিরা এসময় জাহাঙ্গীর চৌধুরীর প্রতিকৃতিতে থুথু ও জুতো নিক্ষেপ করেন এবং তাকে হাসপাতালে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়।

এদিকে যেসব কর্মচারিনেতা ৫ অক্টোবর ২০২৪ জাহাঙ্গীর চৌধুরীর ছবিতে থুথু ও জুতো নিক্ষেপ এবং হাসপাতালে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে এবং তার অনুগত কর্মকর্তাদের হাসপাতাল থেকে বিতাড়িত করেছিল সেসব নেতাকে ‘ম্যানেজ’ করে গত ২৮ অক্টোবর ২০২৪  তিনি (জাহাঙ্গীর চৌধুরী) বহিরাগত লোকজন নিয়ে হাসপাতালে অনুপ্রবেশ করেন। লেলিয়ে দেয়া কর্মচারিরা তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অপারাধে জিন্নাত আরা পপি নামে এক সিনিয়র নার্সকে ব্যাপক মারপিট করে গুরুতরভাবে আহত করে। ৫ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত হাসপাতাল ছিল জাহাঙ্গীরমুক্ত। কর্মকর্তা-কর্মচারিদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল হাসপাতাল। আর্থিক কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি। আয়-উপার্জন অতীতের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। কিন্তু ২৮ অক্টোবর থেকে হাসপাতাল ফের জাহাঙ্গীর চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি আগের অবস্থায় ফিরে যায়। জেলাপ্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার পরও হাসপাতালে প্রবেশ করেছেন তিনি। চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তর,ডিসি অফিস, সিভিল সার্জন অফিসসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধ পন্থায় হাসপাতালকে নিজের কব্জায় রেখেছেন। হাইকোর্টে রীট পিটিশন থাকায় সরকারি কর্মকর্তারা কার্যকর কোনো পদপেক্ষ গ্রহণ করতে পারেননি।

চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের বিতর্কিত সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তর ১৯৬১ সালের ৪৬নম্বর অধ্যাদেশ অনুযায়ী স্বেচাছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ) এর ধারা ৯ এর উপধারা (১) মোতাবেক বর্তমান কার্যনির্বাহী পরিষদ সাময়িক বরখাস্তপূর্বক স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ)অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ৯(২) উপধারা মোতাবেক মোস্তফা মোস্তাকুর রহিম খান, অতিরিক্ত পরিচালক, বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়,চট্টগ্রামকে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রশাসক নিয়োগের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীর চৌধুরী হাইকোর্টে ২০২৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রীটপিটিশন দায়ের করেছিলেন। গত ১৬ ফ্রেব্রয়ারি ২০২৫ তা আদালত খারিজ করে দিয়েছে। অবৈধভাবে তিনি যে পকেট কমিটি গঠন করেছিলেন তা-ও বাতিল হয়ে গেছে। এখন সমাজসেবা অধিদপ্তর ফের নতুন করে প্রশাসক নিয়োগ দেবে। আদালতের রায়ের কপি অফিসিয়ালি না পাওয়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রশাসক নিয়োগ এখন সময়ের ব্যাপার। প্রশাসকের কাজ হচ্ছে-ক.সর্বশেষ অনুমোদিত কমিটির কাছ থেকে অথবা সরাসরি দায়িত্বভার গ্রহণ খ. ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের আলোকে সমিতির অনুমোদিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কার্যনির্বাহী কমিটির সকল কর্তৃত্ব ও যাবতীয় দায়িত্ব পালন গ.অনুমোদিত গঠনতন্ত্রের আলোকে বিধিমোতাবেক সংস্থার কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্নকরণ ও ঘ. নির্বাচন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নকরণসহ বিধি মোতাবেক সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির নিকট দায়িত্বভার হস্তান্তরকরণ।

চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের বেশ কজন আজীবন সদস্য চাটগাঁর বাণীকে বলেন, “হাসপাতালটিকে মহাদুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে বাঁচাতে হলে প্রশাসককে যেসব দায়িত্ব পালন করতে হবে তা হলো- ১. হাসপাতালের যাবতীয় হিসাব অডিট করা। ২.সকলের অংশগ্রহণে পরিচ্ছন্ন একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। ৩.সৎ ও যোগ্য লোক দিয়ে আজীবন সদস্যদের তালিকা যাছাই করে হালনাগাদ করা। ৪.যারা অন্যায় কাজের সাথে জড়িত তাদের সকলকে আইনের আওতায় আনা।”

গরীব রোগীরা যাতে বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়,স্বল্পমূল্যে পায় চিকিৎসাসেবা- সেই মহৎ উদ্দেশে চট্টগ্রাম শহরে খুলশি’র জাকির হোসেন রোডে সরকারি জায়গায় স্থাপিত হয় চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু বাস্তবে উদ্দেশ্য ও নীতি-আদর্শের বিপরীতে চলছে হাসপাতালটি। বিগত দুদশক ধরে এটি বাণিজ্যিক হাসপাতাল হিসেবে চলছে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমনই যে, ডায়াবেটিক হাসপাতালটি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত; অবস্থা সঙ্গীন,ইন্সুলিন নিতে হচ্ছে। রোগীসেবার নামে বিভিন্ন তরফ থেকে কোটি কোটি টাকা আসলেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না ডায়াবেটিস-রোগীরা। এখানে আইসিইউ/সিসিইউ/এইচডিইউ বিভাগ আছে কিন্তু কোনো  বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। এ হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির হলেও চিকিৎসালয়টির মা-বাপ মূলত একজনই। সমিতি থাকলেও তা কাগজে কলমে,পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী কমিটির একচ্ছত্র ক্ষমতা ব্যক্তিবিশেষের হাতে কুক্ষিগত; বাকিরা সব তারই আজ্ঞাবাহী ইয়েসম্যান। প্রতিষ্ঠার পর কিছুদিন ঠিকঠাক চললেও কালক্রমে প্রতিষ্ঠানটির সবকিছু সেই একজনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় । হাসপাতালটির স্বঘোষিত মা-বাপ, হর্তাকর্তা-বিধাতা ও দুর্নীতির বরপুত্র হলেন- চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বহিস্কৃত সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরী। সরকারি-বেসরকারি দান-অনুদান ও যাকাত-ফিতরার কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ,স্বজনদের হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এখানে ওপেন-সিক্রেট। বলা যায়, দুর্নীতির মহাসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল।

জাহাঙ্গীর চৌধুরী ২০০১ সালে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর উদ্দিনকে বিনা কারণে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে হটিয়ে ওই পদে আসীন হন। সেই তখন থেকেই এখন পর্যন্ত প্রভাব খাটিয়ে গঠনতন্ত্রকে নিজের সুবিধামতো সংশোধনী এনে সাধারণ সম্পাদক ও  বর্তমানে সভাপতি পদে বহাল আছেন। ডায়াবেটিক হাসপাতালে প্রতিদিন ৯/১০ লাখ টাকা আয় হলেও হাসপাতালের নামে কোনো আয়-ব্যয়ের রেজিস্ট্রার বই নেই। আয়-ব্যয়ে নেই কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। গঠনতন্ত্রের ১২ (ঘ) ধারা মোতাবেক ব্যাংক হিসাব- যা সমিতির নামে কোষাধ্যক্ষ সমিতির যাবতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করার কথা। ১৭ (গ) ধারা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব- যা সমিতির নামে কোষাধ্যক্ষ নিজে এবং সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে যে-কোনো একজনসহ দুজনের যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হওয়ার নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করা হয় না। এখানে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ এর সব দায়িত্ব পালন করেন সভাপতি নিজেই। মূলত সভাপতি-ই হাসপাতালের সর্বেসর্বা। কোষাধ্যক্ষের কাছ থেকে ‘ব্ল্যাংক চেক’-এ স্বাক্ষর নেয়া হয়।

গত ২৮জুন ২০২১ জনতা ব্যাংক লিমিটেড ও ইউসিবিএল, খাতুনগঞ্জ শাখা কর্তৃক দায়েরকৃত অর্থঋণ মামলায় চট্টগ্রামের চকবাজার থানা পুলিশ জাহাঙ্গীর চৌধুরীকে গ্রেফতার করে। থানা থেকে নিজেকে ছাড়ানোর কথা বলে একইদিনে হাসপাতালের হিসাব থেকে ৩৯লাখ টাকা উত্তোলন করে নেয়- যা এখনও পরিশোধ করেননি।গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষের যৌথ স্বাক্ষরে চেক পাশ হওয়ার কথা থাকলেও এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে। যেখানে সাধারণ সম্পাদক ইহজগতে নেই, সভাপতি জেলে থাকাকালীন সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষের স্বাক্ষরে কীভাবে চেক পাশ হয়ে যায়- এমন প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই।

এদিকে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড , আন্দরকিল্লা শাখায় চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের নামে হিসাব খুলে জাহাঙ্গীর চৌধুরী নিজেই পরিচালনা করেন- যা সংগঠনের গঠনতন্ত্রীপরিপন্থী ও বেআইনী। এ হিসেবে নামে-বেনামে হাসপাতালের অনুকূলে যত টাকা আসে,সব টাকা তিনি উত্তোলন করে নেন। ২০১৫ সালে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের জন্যে হাসপাতাল হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করে তা আর পরিশোধ করেননি। ২০১৮ সাল থেকে সরকার চট্টগ্রাম জেনারেল ডায়বেটিক হাসপাতালের জন্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যে টাকা অনুদান হিসেবে পাঠায়, তা-ও জাহাঙ্গীর চৌধুরী আত্মসাৎ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার থেকে আবারও ৫০লাখ টাকার চেক এসেছে (স্মারক নম্বর- ৪৫.০০.০০০০.১৬২.৯৯.০০৭.২১.৭৫ চডাস/২০২২/১১৮ তারিখঃ ০২.০৩.২০২২ খ্রিস্টাব্দ)। বিভিন্ন পরামর্শকদের নামে ঋণ দেখিয়ে তিনি হিসাব মিলিয়ে রাখেন। অথচ যাদের নামে ঋণ দেখানো হয়, সেসব  চিকিৎসক নিজেরা-ই জানেন না- তাঁরা ঋণ নিয়েছেন। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি পড়ে জাহাঙ্গীর চৌধুরীর। তিনি এ বি ব্যাংক লিমিটেড এর খুলশী শাখায় কর্মকর্তা-কর্মচারিদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা বেআইনিভাবে উত্তোলন করে কমার্স ব্যাংক থেকে নেয়া তার ব্যক্তিগত ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেন- যা এখনো পরিশোধ করেননি। ২০১৯-২০ রোটারিবর্ষে রোটারি ক্লাব অব চিটাগং ইস্ট থেকে জাহাঙ্গীর চৌধুরী রোটারি ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিক্ট ৩২৮২ এর গভর্নর পদে নির্বাচন করার সময় হাসপাতাল ফান্ড থেকে অবৈধভাবে প্রায় ২কোটি.৫০লাখ টাকা ব্যয় করেন- যা এখনও ফেরত দেননি। অন্যদিকে তিনি বায়ো-ট্রেড নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে অবৈধ লেনদেনে লিপ্ত হয়ে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের টাকা লোপাট করেছেন। হাসপাতালের টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ইটিটি মেশিন কেনার নামে হাসপাতাল তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলন করা হলেও মেশিন কেনা হয়নি; চালু করা হয়নি ইটিটি বিভাগ।  জাহাঙ্গীর চৌধুরী এলইডি টিভি ও ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা-সফটওয়্যার বাণিজ্যও করছেন।শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম আইন কলেজের অধ্যক্ষ পদ পাকাপোক্ত করতে তিনি হাসপাতাল তহবিলের টাকায় আইন কলেজের শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্যে ট্রাস্ট সীট করে দেন। তিনি বহু বছর থেকে ব্যক্তিগত গাড়ির চালক আজিজ, বাসাবাড়ির কাজের ছেলে মিজান ও রকি’র বেতন হাসপাতাল তহবিল থেকে পরিশোধ করে আসছেন। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের বন্দরটিলা শাখা স্থানান্তরের অজুহাত দেখিয়ে  সহ-সভাপতি  এস এম শওকত  হোসেন ও প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমান উল্লাহ আমানের সহযোগিতায় ২০লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে সভাপতির বিরুদ্ধে। হাসপাতালটিতে কেনাকাটা থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত কোনো কাজে দরপত্র কিংবা আইনকানুন পালন করা হয় না। হাসপাতালের একটি ৬তলা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। হাসপাতাল পরিচালনা পর্ষদের সহ-সভাপতি এস এম শওকত হোসেনকে এ নির্মাণ প্রকল্পের প্রধান করে বহুতল ভবন তৈরির কাজ শুরু করা হয়। সিডিএ’র অনুমতি না নিয়ে  ৫তলার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে ৬তলা ঢালাইয়ের যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি সিডিএ’র সংশ্লিষ্ট বিভাগ অবহিত হয়ে গত ১৯নভেম্বর ২০২২ নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকলেও হাসিনা সরকারের পতনের আবার ভবননির্মাণের কাজ শুরু করেন।অভিযোগ করা হলে সিডিএ আবার নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। বিগত সময়ে (২০০২-২০২০) জাহাঙ্গীর চৌধুরী অবৈধভাবে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তার ৪৬জন আত্মীয়স্বজনকে হাসপাতালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেন। এছাড়া হাসপাতাল অ্যাম্বুলেন্স এর অপব্যবহারের অভিয়োগ তো আছেই। এ হাসপাতালে এস এইচ আর শিপিং কোম্পানি ও আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক কর্তৃক দানকৃত দুটি অ্যাম্বুলেন্স আছে। অ্যাম্বুলেন্স দুটি হাসপাতালের কর্তাব্যক্তিরা ব্যবহার করেন।

ব্যক্তিস্বার্থে হাসপাতালের গঠনতন্ত্র পরিবর্তনঃ

দীর্ঘ দেড়যুগ ধরে জাহাঙ্গীর চৌধুরী সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমতি না নিয়ে এবং গঠনতন্ত্রের অনুচ্ছেদ-১৫ এর ধারা (কোরাম পূরণের জন্যে এক-তৃতীয়াংশ অথবা কমপক্ষে ৫১জন সদস্যের উপস্থিতি থাকা বাধ্যতামূলক) ভঙ্গ করে এ ধারার নিয়ম কোনোদিনও না-মেনে শুধুমাত্র নিজস্বার্থে বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে আসছে।গঠনতন্ত্রের যেসব ধারা বেআইনি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়-

১. কর্মচারিদের মধ্য থেকে আজীবন সদস্য হিসেবে যারা ভোটার তাদের ভোটাধিকার বিলুপ্ত করা হয়। কারণ-বেশিরভাগ কর্মচারি জাহাঙ্গীর চৌধুরীর দুর্ব্যবহার, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্যে তাকে পছন্দ করতো না এবং নির্বাচনে ভোট দিতো না। কিন্তু উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো- প্রতিবার এজিএম-এ কোরাম পূরণের লক্ষ্যে একই কর্মচারিদের জোরপূর্বক উপস্থিত থাকতে বলা হয় এবং যেসব কর্মচারি উপস্থিত থাকতো না, বিভিন্ন কলাকৌশলের মাধ্যমে তার আজ্ঞাবাহী কর্মচারি শিবু প্রসাদ চৌধুরীকে (বর্তমানে পলাতক) দিয়ে রেজিস্টার খাতায় স্বাক্ষর নেয়।

২. নির্বাহী কমিটিতে জাহাঙ্গীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠগুলোকে দমিয়ে রাখা ও বিরুদ্ধ প্যানেলকে দুর্বল করার জন্যে আবার গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করা হয়। এর মূল লক্ষ্য- নির্বাহী পরিষদের সদস্যদের ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন কেউ চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালে আর চাকরি করতে পারবে না। অথচ বর্তমানে তার নিজের-ই বিপুলসংখ্যক আত্মীয়স্বজন হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে কর্মরত আছেন।

৩. ২০০২ থেকে ২০২১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জাহাঙ্গীর চৌধুরী সাধারণ সম্পাদকের পদে বহাল থেকে নিজের একক সিদ্ধান্তে সকল কাজ পরিচালনা করতেন। তৎকালীন সভাপতির মৃত্যুজনিত কারণে পদটি খালি হওয়ায় তিনি লোভের বশবর্তী হয়ে বেআইনি প্রক্রিয়ায় এ ‘শূন্য সভাপতি’ পদ দখল করে নেন। সভাপতির পদ দখল করে তিনি ক্ষান্ত হননি, সেই সাথে হাসপাতালের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যেসকল ক্ষমতা সাধারণ সম্পাদকের ছিল, তা পরিবর্তন করে সভাপতির কাছে নিয়ে আসে- যা এখনও পর্যন্ত সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত হয়নি। ২০১৫ সাল থেকে অনুমোদনহীন কমিটি দিয়ে এ হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে।

৪. ২৯মার্চ ২০২২ খ্রিস্টাব্দে প্রহসনের এজিএম-এ (এ এজিএম-এ কোনো আজীবন সদস্যকে বার্তা প্রেরণের প্রয়োজনবোধও করেনি) চতুর্থ পরিবর্তনের লক্ষ্যে অত্যন্ত হাস্যকর ও ন্যাক্কারজনকভাবে যুক্তি সাজালো যে, কোনোকালে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালে চাকরি করেছেন কিন্তু আজীবন সদস্য, এবং তিনি যদি চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন অথবা অবসরে যান তবে তিনি কখনো হাসপাতালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। অর্থাৎ তার ইচ্ছেমাফিক, জোরপূর্বক ও বেআইনিভাবে পরিবর্তনকৃত প্রথম ও চতুর্থ নিয়ম অনুসারে হাসপাতালে চাকরিচ্যুত কোনো ব্যক্তি ‘নির্বাহী নির্বাচনে’ ভোট দিতে পারবে না কিংবা অব্যাহতি নিলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তার এসব হাস্যকর নিয়মও সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমোদন পায়নি। দেশে কোনো সামাজিক ও সেবামূলক সংগঠনের মেয়াদ ৪বছর আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু জাহাঙ্গীর চৌধুরী নিজের স্বার্থে সেই কাজটি করেছেন। সংশোধিত গঠনতন্ত্রের অনুচ্ছেদ-১৩ এর ১(ক) –এ  কমিটির মেয়াদ ৪বছর করা হয়েছে- যা আগে ছিল তিনবছর।

জাহাঙ্গীর চৌধুরীর অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে যারা-ই উচ্চবাচ্য করেছেন তাদের চাকরি খোয়াতে হয়েছে। ২০০৮ থেকে এ পর্যন্ত যে ৭০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারিকে জোরপূর্বক পদত্যাগে ও বেআইনিভাবে চাকরি থেকে অবসরে যেতে বাধ্য করেছেন। যে কজনের নাম  পাওয়া গেছে তাঁরা হলেন-

১. ডা. মাসুদ আহমদ ২. হাসপাতাল পরিচালক ডা. নওশাদ আহমেদ খান ৩.স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নার্গিস রোজেলা ৪. ডায়াবেটিক বিশেষজ্ঞ ডা. আবসার ৫. ডা. ফাহাদ গণি ৬. বিশেষজ্ঞ ডা. মেহেদী ৭. বিশেষজ্ঞ ডা. মোমেন ৮.এনেস্থেসিয়া ডা. ইমরান ৯. ডায়াবেটিক বিশেষজ্ঞ ডা. শেখ শিরিন ১০. ডায়াবেটিক বিশেষজ্ঞ ডা. শাহেদ ১১. মো. নাজমুল (প্রশাসন) ১২. হাসপাতাল পরিচালক ডা. মজুমদার ১৩. প্রধান পুষ্টিবিদ ও উপপরিচালক হাসিনা আক্তার লিপি ১৪. নাসরিন ১৫. দন্ত বিশেষজ্ঞ ডা. উত্তম কুমার তালুকদার ১৬. পারভিন ১৭. ডা. টিটু বিশ্বাস ১৮. চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহজামান মনসুন খান ১৯. চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রুমি ২০. অর্থোপেডিক্স ডা. হিমাদ্রী ২১. মেডিকেল বিভাগীয় প্রধান ডা. মাহবুবা আক্তার ২২. সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. ইসতেয়াক আজিজ খান ২৩. মেডিকেল অফিসার ডা. শারমিন আফরোজ ২৪. মেডিকেল অফিসার ডা. গুলশান আরা বেগম ২৫. মেডিকেল অফিসার ডা. হাসান আল মামুন ২৬. প্রশাসনিক প্রধান মো. মজনুন চৌধুরী ২৭. প্রশাসনিক অফিসার মো. বোরহান উদ্দিন ২৮. পার্সোনাল অফিসার আবদুল্লাহ মিয়া ২৯. প্রজেক্ট অফিসার আনিসুর রহমান ৩০. প্রধান বায়োকেমিস্ট অফিসার মো. কামরুল হাসান ৩১. নিরাপত্তা অফিসার মো. শাহাবুদ্দিন ৩২. সিনিয়র সমাজকল্যাণ অফিসার আঞ্জুমান আরা বেগম ৩৩. সিনিয়র সমাজকল্যাণ অফিসার জলি বড়ুয়া ৩৪. পুষ্টি অফিসার আয়েশা বেগম ৩৫. ফার্মেসী বিভাগ সহকারী শামীম আরা বেগম ৩৬. ফার্মেসী বিভাগ সহকারী শাহনাজ পারভিন ৩৭. দন্ত বিভাগ সহকারী জয়া ভট্টাচার্য ৩৮. ইলেকট্রিশিয়ান মো. মেহেদী হাসান ৩৯. সেনিটারি ও প্লাম্বার মো. শহিদুল্লাহ ৪০. অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার মো. রিপন মিয়া ৪১. অফিস সহকারী মো. বেলাল হোসেন ৪২.মালি মো. মাকসুদ উল্লা  ও ৪৩. মালি মো. ইব্রাহীম মিয়া ৪৪. ফার্মাসিস্ট অ্যাসিসট্যান্ট উত্তম কুমার গুপ্ত ৪৫. ফার্মাসিস্ট অ্যাসিসট্যান্ট কল্যাণ চৌধুরী ৪৬. ফার্মেসী অ্যাটেনডেন্স মো. হাসান ৪৭. অ্যাটেনডেন্স মিনতি দাস ও ৪৮. আয়া তমা দাশ ।

ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রাপ্ত গ্র্যাচুইটি/প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা আত্মসাতের উদ্দেশে এদের বেআইনিভাবে জোরপূর্বক পদত্যাগ ও চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে বাধ্য করেন। এখন পর্যন্ত চাকরিচ্যুতদের কারো টাকা পরিশোধ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে হাতেগোণা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি ছাড়া চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের স্বাভাবিকভাবে অবসরে যাওয়া ও তাদের পিএফ ফান্ডের টাকা পাওয়ার কোনো রেকর্ড নেই। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারি অবসরে যাওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে মনগড়া অভিযোগ তৈরি করে এমন এক পরিস্থিতি করা হয় যে, ওই কর্মকর্তা-কর্মচারিকে হয় টারমিনেট নয় তো পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এ অমানবিক পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে যারা চাকরি হারিয়েছেন তারা কেউ পিএফ এর টাকা পাননি। জাহাঙ্গীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে পিএফ ফান্ডের কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হাসপাতালের জন্যে যেকোনো যন্ত্রপাতি কেনা-বেচার ক্ষেত্রে পত্রিকার মাধ্যমে দরপত্র আহবানের নিয়ম থাকলেও জাহাঙ্গীর চৌধুরী একক সিদ্ধান্তে ক্রয়-বিক্রয় করে আসছেন এবং কেনা-বেচার বিল-ভাউচার তিনি কখনও স্টক রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করেননি। পরে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে দেয় চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার বেলাল উদ্দিন। সংগঠনের অনুচ্ছেদ-১৭ খ অনুযায়ী “সদস্য অন্তর্ভুক্তি ফি, এককালীন অনুদানসহ বিভিন্ন দান-অনুদান, সরকারি-বেসরকারি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্য,সমিতির নির্দিষ্ট কোনো প্রজেক্ট থেকে অর্জিত অর্থ, সমিতির আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রম থেকে প্রাপ্ত অর্থ, সমিতির বিভিন্ন রোগীসেবা থেকে প্রাপ্ত অর্থ, সেবামূলক অন্যান্য বৈধ উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থের মাধ্যমে সমিতির তহবিল গঠন করা হবে। তহবিলসহ সকল সম্পত্তি সমিতির নামে অর্জিত, স্বীকৃত ও পরিচালিত হবে। সকলপ্রকার অর্থ-আয় সমিতির নির্ধারিত রশিদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা যাবে এবং প্রাপ্ত আয় সমিতির নামে নির্ধারিত ব্যাংক হিসেবে জমা হবে। জাহাঙ্গীর চৌধুরী এসব নিয়ম-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে সমিতি উপার্জিত যাবতীয় আয়ের কোটি কোটি টাকা সমিতির নামে নির্ধারিত ব্যাংকে না রেখে নিজ করায়ত্বে রেখে যাচ্ছেতাইভাবে হরিলুট করে আসছেন। রোগীস্বার্থ পদদলিত করে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করা হচ্ছে, জাহাঙ্গীর চৌধুরী ঢাকা বারডেম হাসপাতাল ও অন্যান্য দাতাসংস্থা থেকে প্রাপ্ত জীবন রক্ষাকারী ইনসুলিন নিজের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ ও বিভিন্ন ফার্মেসীতে বিক্রি করে দেন- এমন অভিযোগ সকলের মুখে মুখে। Novo Nordisk কোম্পানি প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ হাসপাতালের রোগীদের HbA1c টেস্ট করতে প্রতিমাসে ৭/৮লাখ টাকা অনুদান দিত। অনুদানের এ টাকা রোগীদের জন্যে ব্যয় না করে পুরোটাই আত্মসাৎ করার খবর পেয়ে এই কোম্পানি ২০২২ সালের জুন মাস থেকে টাকা দেয়া বন্ধ করে দেয়। ফার্মেসীতে ন্যায্যমূল্যের বদলে চড়াদামে ওষুধ বিক্রি হয় বলে রোগীদের অভিযোগ। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতাল নামে দাতব্য হাসপাতাল হলেও প্রাইভেট হাসপাতালের মতো গলাকাটা রেটে এখান থেকে রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিতে হয়। গরীব ও অসহায় রোগীদের এখানে চিকিৎসা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। অথচ এ হাসপাতালের সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে গরীব-দুঃখীদের সহযোগিতা করার কথা থাকলেও কোনোরকম সহযোগিতা না করে জাহাঙ্গীর চৌধুরী বছরে ৭৬-৮৪লাখ টাকা নিজস্বার্থে একক সিদ্ধান্তে পছন্দমতো লোকদের ডিসকাউন্ট সুবিধা দিয়ে থাকেন। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো- ২০১৮ সাল থেকে হাসপাতাল পরিচালনার জন্যে সিভিল সার্জন অফিস থেকে যে লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়  তা না করে অবৈধভাবে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

হাসপাতালের আজীবন সদস্য করার ক্ষেত্রে রয়েছে লুকোচুরি। সমাজসেবা অধিদপ্তরে ৩৫০০ জন আজীবন সদস্যের রেকর্ড থাকলেও এখানে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি আজীবন সদস্য রয়েছে। আজীবন সদস্য হওয়া বন্ধ ঘোষণা থাকলেও জাহাঙ্গীর চৌধুরী ভোটব্যাংক সমৃদ্ধ করতে নিজের মতো করে আজীবন সদস্য করে আসছেন। হাসপাতালের প্রতিষ্ঠালগ্নে আজীবন সদস্য ফি ছিল ৫শ টাকা এরপর পর্যায়ক্রমে ১হাজার, ২হাজার, আড়াই হাজার, ৫হাজার, ১০হাজার ও সর্বশেষ ১৫হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সহজ পদ্ধতিতে আজীবন সদস্য করা হলে আজীবন সদস্যের সংখ্যা দ্বিগুণ হতো বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এতে করে হাসপাতাল লাভবান হতো। আজীবন সদস্য ফি বাবদ যে টাকা হাসপাতাল তহবিলে আসার কথা, তা যাচ্ছে ব্যক্তিবিশেষের পকেটে।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মু. জসীম উদ্দিন ২০২৩ সালের ১১জুলাই মাসে তদন্ত করে ২৭লাখ ৫০ হাজার টাকার দুর্নীতির প্রমাণ পেয়ে সেই টাকা ১৫দিনের মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। টাকা জমা না দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও সরকারি কোষাগারে টাকা জমা না দিয়ে পুনঃতদন্তের আবেদন করেন জাহাঙ্গীর চৌধুরী। এ অবস্থায় আবার নতুন করে হাসপাতাল সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরীর দুর্নীতি তদন্তের দায়িত্ব পান স্বাস্থ্যমন্ত্রকের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ রোকন উদ্দিন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালে এ তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের পুনঃতদন্তেও সরকারি অনুদানের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের অনুকূলে সরকারি অনুদান প্রদান বন্ধ করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রক এ হাসপাতালকে প্রতিবছর ২কোটি টাকা অনুদান দিয়ে আসছে। হাসপাতাল পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনীত সরকারি তহবিল তছরূপসহ স্বজনপ্রীতি,দুর্নীতি এবং সরকারি অনুদানের টাকা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এ হাসপাতালের অনুকূলে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে বরাদ্দ থেকে ১৭,৫০,০০০ টাকা এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে ১০,০০০০০ টাকা জরুরিভিত্তিতে চালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব স্নেহাশীষ দাশ স্বাক্ষরিত ২০ এপ্রিল ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের এক পরিপত্রে। ব্যর্থ হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত জাহাঙ্গীর চৌধুরী সরকারি কোষাগারে সেই সাড়ে ২৭লাখ টাকা জমা দেননি। চট্টগ্রাম দুর্নীতি দমন কমিশনও জাহাঙ্গীর চৌধুরীর দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্ত করছে। প্রায় ১০০ কোটি টাকার অনিয়ম পেয়েছে দুদক।

‘শৃঙ্খলাই জীবন’-এ স্লোগানকে সামনে রেখে ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতি চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা থেকে নিবন্ধন নেয়। নিবন্ধনের তিনবছর আগে থেকে চট্টগ্রাম শহরের কাপাসগোলা সিটি কর্পোরেশন দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্রে ডায়াবেটিক হাসপাতালের বর্হিবিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। অতঃপর সেখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে ১৯৭৮ সাল থেকে আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে, ১৯৮১ সাল থেকে মেহেদিবাগে এবং ১৯৮৮ সাল থেকে এনায়েতবাজারে একটি পরিত্যক্ত ভবনে চিকিৎসা কার্যক্রম চলে। ২০০১ সালের মার্চ মাসে খুলশী থানাধীন জাকির হোসেন রোডে রেলওয়ের দেয়া প্রায় একএকর জায়গার ওপর নির্মিত নিজস্ব ভবনে হাসপাতালটি স্থানান্তরিত হয়। ২০০৮ সালের মার্চ মাসে চালু হয় অন্তর্বিভাগ কার্যক্রম। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাসপাতালটির নামকরণ হয় চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল। বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে এ হাসপাতালের ৪টি শাখা আছে। শাখাগুলো- এনায়েতবাজার শাখা, বন্দরটিলা শাখা, অক্সিজেন শাখা ও বহদ্দারহাট শাখা।

উল্লেখ্য, জাহাঙ্গীর চৌধুরীর অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে চাটগাঁর বাণী পত্রিকায় ও অনলাইন নিউজপোর্টালে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। জাহাঙ্গীর চৌধুরী চাটগাঁর বাণীর প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ ইউসুফ ও সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিমের বিরুদ্ধে সাইবার ক্রাইম আদালতে মামলা করলেও তা ধোপে টেকেনি, মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

 

 

 

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও