বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

জঙ্গল সলিমপুর আর কতদিন ভূমিদস্যুদের কব্জায় থাকবে

মোহাম্মদ ইউসুফ *

- Advertisement -

- Advertisement -shukee

রাষ্ট্রক্ষমতার চেয়ে অবৈধ ভূমিদখলদারের ক্ষমতা কী বেশি? সিভিল ও পুলিশপ্রশাসন যখন অবৈধ ভূমিদস্যুদের সামনে অসহায় হয়ে যায়,তখন স্বাভাবিকভাবে জনমনে প্রশ্ন জাগে-এদের ক্ষমতার উৎস তাহলে কোথায়? সমিতির নামে চলছে সরকারি জমি দখল। পাহাড় কেটে চলছে রমরমা প্লটবাণিজ্য।পাহাড়খেকোরা ৩শ টাকার ননজুড়িশিয়াল স্ট্যাম্পে ২০ হাজার টাকা থেকে দুলাখ টাকা পর্যন্ত দখলকৃত জমি বিক্রি করছে। এসব অপকর্ম চলছে সীতাকুণ্ড তথা চট্টগ্রামের আলোচিত জনপদ জঙ্গল সলিমপুরে। এখানে শেখ হাসিনা সরকার উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা হাতে নিলেও তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল জঙ্গলের অবৈধ বাসিন্দারা। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে গেলে হামলার শিকার হয় সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা; বুলডোজারের সামনে শুয়ে পড়ে বিপুলসংখ্যক স্থানীয় বাসিন্দা। ১১টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও ১০একর জমি দখলমুক্ত হওয়ার পর সরকারি সকল কর্মতৎপরতা থেমে গেছে। আবার অবৈধ জমি দখলদারবাহিনীর অট্টহাসি ও জয়জয়কার চলছে এখানে। সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যখ্যাত জঙ্গল সলিমপুরে ব্যাপক সম্ভাবনার যে আলো জ্বলে ওঠেছিল,কিছুদিন পর তা আবার নিভে যায়। স্পোর্টস ভিলেজ থেকে শুরু করে হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালসহ কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হলেও সরকারি সব মহাপরিকল্পনা চলে যায় হিমাগারে। উপজেলা,জেলা ও বিভাগীয় অফিসের কর্মকর্তারা জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে আশার কোনো বাণী শোনাতে পারছেন না। ফের কর্মকর্তারা জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে আশার কোনো বাণী শোনাতে পারছেন না।

জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বেশ কটি সরকারি সংস্থা এখানে প্রতিষ্ঠান করার জন্য জমি চেয়ে আবেদন করেছিল। যার মধ্যে আছে– স্পোর্টস ভিলেজ, হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, সাফারি পার্ক, ইকোপার্কসহ বিনোদনকেন্দ্র, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, উচ্চক্ষমতার বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রশিক্ষণকেন্দ্র, কাস্টমস ডাম্পিং হাউজ, ভূমিহীনদের পুনর্বাসন, সবুজ শিল্প এলাকা,আনসার ভিডিপি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে। সেইসঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে। তবে বর্তমানে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কোনো কারণে সরকারের এ উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা কার্যক্রম থেমে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মর্তাদের কাছে এর কারণ জানতে চেয়ে কোনো সদুত্তর মেলেনি।

চট্টগ্রাম শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। এখানে পাঁচটি মৌজায় খাস জমির পরিমাণ তিন হাজার ১০০ একর। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ পাহাড় কেটে ধ্বংস করা হয়েছে। সলিমপুরের পূর্ব ও উত্তরে রয়েছে চট্টগ্রাম সেনানিবাস ও বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণে চট্টগ্রাম শহর। গত তিন-চার বছরে এখানে পাহাড়ধসে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত জঙ্গল সলিমপুরে ৪০০ একর পাহাড় কাটা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। সলিমপুরে ২০১৭ ও ২০১৯ সালে উচ্ছেদে গেলে বাধার মুখে পড়ে জেলাপ্রশাসন। সেখানকার প্রভাবশালী দখলদাররা রাস্তায় নারীদের দিয়ে মানববন্ধন করিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সেখানে প্রবেশে বাধা দেয়। গত ১৪ মে ২০২৩ প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন মুখ্যসচিব আহমদ কায়কাউস সলিমপুর পরিদর্শনে গেলে নারীদের দিয়ে মানববন্ধন করানো হয়। গত ১৫ জুলাই ২০২৩ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সলিমপুরে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে গেলে গাড়িবহর থেকে স্থানীয় ইউপি সদস্যকে নামিয়ে মারধর করা হয়। এ হামলায় নেতৃত্ব দেন সলিমপুরের স্বঘোষিত সম্রাট হিসেবে পরিচিত মো. ইয়াসীন। এ ঘটনায় ১৬ জুলাই সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করা হয়। ১৮ জুলাই কোতোয়ালি থানার আদালত ভবন এলাকা থেকে ইয়াসীনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে যে মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন হলে এটি স্মার্ট সিটি কিংবা উপশহর হিসেবে গড়ে ওঠবে। এখানে সরকারি অনেক দপ্তর ও ভবন হবে। চট্টগ্রামে উন্মুক্ত কোনও পার্ক নেই। সলিমপুরে ইকোপার্ক ও নাইট সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এখানে কারাগার হবে। যেটি হবে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-২। এ কারাগার হলে চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দির চাপ কমবে। সেইসঙ্গে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তবে এর আগে পুরো জমি সরকারের আয়ত্তে নিতে হবে। এরপর সার্ভে করে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে হবে।

পাহাড়বেষ্টিত সলিমপুরে গত তিন দশকে শতাধিক একর পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় হাজার হাজার বাড়িঘর। বিভিন্ন সমিতি ও ব্যক্তির নামে এসব পাহাড় কাটা হয়েছে। প্রভাবশালী মহল এসব পাহাড় কেটে ৩০০ টাকার নন–জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লাখ লাখ টাকায় জমির মালিকানা বিক্রি করছে। সলিমপুর ও আলীনগরে একসময় বহিরাগত কেউ প্রবেশ করতে পারতো না। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হতো। ওই এলাকায় বসবাসকারীদের নিজস্ব আইডিকার্ড আছে- যা সলিমপুরে প্রবেশ ও বের হওয়ার পাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে এটি এখন কিছুটা শিথিল হয়েছে।

সলিমপুর এবং এর ভেতরে থাকা জঙ্গল লতিফপুরসহ আশপাশের সরকারি খাস জমি দখলে নিতে ১৫টি সমবায় সমিতির নামে হাউজিং সোসাইটি খোলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৩টি সমবায় সমিতি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে জঙ্গল সলিমপুরে। সমিতিগুলো হলো- আলী নগর ভূমিহীন সমবায় সমিতি, ছিন্নমূল বহুমুখী সমবায় সমিতি, একতা ভূমিহীন সমবায় সমিতি, নুর নবী শাহ হাউজিং সমবায় সমিতি, জঙ্গল সলিমপুর জনকল্যাণ কর্মজীবী সমবায় সমিতি, গোলপাহাড়া ভূমিহীন সমবায় সমিতি, আল মদিনা সমবায় সমিতি, মায়ের আঁচল সমবায় সমিতি, ভিত্তিহীন সমবায় সমিতি, চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল সংগ্রামী বস্তিবাসী সমন্বয় পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা হাউজিং সমবায় সমিতি, নবী নগর বহুমুখী সমবায় সমিতি এবং আলী নগর বহুমুখী সমবায় সমিতি। এসব সমিতির নামে চলছে সরকারি জমি দখল ও কেনা-বেচার মহোৎসব। পাহাড় কেটে করছে প্লটবাণিজ্য। ইতোমধ্যে ১৫টি সমিতির নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।।

সম্প্রতি (বিগত সরকারের শেষ সময়ে ) ভূতপূর্ব চট্টগ্রাম জেলাপ্রশাসক আবুল বশর মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো.তোফায়েল ইসলামের সাথে তাঁদের দপ্তরে সমস্যাকবলিত জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে কথা হয়। জঙ্গল সলিমপুরে সম্প্রতি সরকারি উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা নিয়ে হৈচৈ ও মাতামাতি হয়েছিল,এখন নীরব কেন- এমনএক প্রশ্নের জবাবে জেলাপ্রশাসক বলেন,কীসের হৈচৈ,এসব আপনাদের মিডিয়ার কাজ। আমরা চেষ্টা করেছি,দখলদারদের বাধায় আমরা সাসটেনেবল কিছু করতে এখনো পারিনি। সরকারের সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনের চেয়ে ভূমিদস্যুরা শক্তিধর কি না-জিজ্ঞেস করা করা হলে তিনি এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। একই ধরনের প্রশ্ন করা হলে বিভাগীয় কমিশনার তোফায়েল উদ্দিন চাটগাঁর বাণীকে বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা ও সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা তো কয়েকদফা অভিযান চালিয়েছি,কিন্তু কাজ হয়নি। বেশি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গেলে হতাহতের ঘটনা ঘটবে, দেশজুড়ে আলোচিত হবে। তারপরও আমরা হাল ছাড়িনি,আস্তে-ধীরে এগুচ্ছি।

লেখক- প্রধানসম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও