শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬

চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির  নির্বাচন স্থগিত করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর

মোহাম্মদ ইউসুফ *

- Advertisement -

- Advertisement -shukee

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রের সবক্ষেত্রে পরিবর্তনের  হাওয়া লাগলেও চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের অনিয়ম-দুর্নীতি যথারীতি আগের মতোই চলছে। ইতোমধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ বহিস্কৃত ডায়াবেটিক সমিতি অবৈধভাবে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ৫ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে নির্বাচনের ঘোষণা দিলে চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তর তা স্থগিত ঘোষণা করেছে।

চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ফরিদুল আলম স্বাক্ষরিত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের এক পরিপত্রে বলা হয়, “সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতি’র বর্তমানে কোনো অনুমোদিত কার্র‌্যকরী কমিটি নেই।। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অফিস আদেশ নম্বর ৪১.০১.০০০.০৪৬. ২৭.০২৫.২২.১০০ তারিখ ২৫.০১.২০২৩ মূলে সংস্থার তৎকালীন কমিটিকে সাময়িক বরখাস্তপূর্ক স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ)অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর বিধান মোতাবেক প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। কাজেই সংস্থার অণনুমোদিত কার্করী কমিটির সাধারণসভা আহবান ও নির্বাচন আয়োজনের কোনো বৈধতা নেই। তাছাড়া সংস্থার কার্ক্রম বিষয়ে মহামান্য সুপ্রিমকোর্ এর হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নম্বর ১৬১০/২০২৩ চলমান আছে। এমতাবস্থায় আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্ন্ত চট্টগ্রাম ডায়ঢাবেটি সমিতির নির্বাচনসংক্রান্ত কা কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ করা হয়।”

এদিকে  ২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর ইমারত আইন লঙ্ঘন করে হাসপাতালের ৬তলাভবন নির্মাণ  কাজ বন্ধ করার আদেশ দেয়া হলেও সিডিএ’র অনুমতি ছাড়া সম্প্রতি আবার নির্মাণকাজ শুরু করে দিয়েছে ডায়াবেটিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দুদফা তদন্ত করে ২৭লাখ ৫০ হাজার টাকার দুর্নীতির প্রমাণ পেয়ে সেই টাকা ১৫দিনের মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলেও তা জমা দেয়া হয়নি। দুর্তির দায়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রক যে ডায়াবেটিক হাসপাতালকে প্রতিবছর যে ২কোটি টাকা অনুদান দিয়ে আসছে তা বন্ধ করে দিয়েছে।

সরকারি কোনো বিধিনিষেধ না মেনে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে হাসপাতালের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন মেয়াদোত্তীর্ণ কার্যকরী কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরী। ২০১৫ সাল থেকে এ হাসপাতালের অনুমোদিত কার্যকরী কমিটি নেই। যে সমিতি হাসপাতাল চালায় সেই সমিতির আইনগত বৈধতা না থাকার পরও জাহাঙ্গীর চৌধুরী প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টিকে হাইকোর্র মাধ্যমে স্থগিত করে অবৈধভাবে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতাল পরিচালনা করে আসছে।

হাসপাতালে প্রভিডেন্ট ফান্ড নিয়েও আছে মহাদুর্নীতি। ১৯৯৮ সাল থেকে চালু হওয়া পিএফ ফান্ডে কর্মকর্তা-কর্মচারিরা প্রতিমাসে চার লাখ টাকার ওপরে জমা দিয়ে আসছেন। বর্তমানে এ ফান্ডে ৭/৮ কোটি টাকা থাকার কথা। এ ফান্ডে কতটাকা জমা আছে- তা কখনো প্রকাশ করা হয় না, কারো জানার সুযোগ নেই। প্রভিডেন্ট ফান্ডের কোনো পাশবই দেয়া হয়নি কাউকে। অবসরে গেলে কর্মচারিদের ২/৩লাখ টাকা দিয়ে বিদায় করা হয়। ২০০৮ থেকে ২০২২ পর্যন্ত যে ৪৩জন কর্মকর্তা-কর্মচারিকে জোরপূর্বক পদত্যাগে ও বেআইনীভাবে চাকরি থেকে অবসরে যেতে বাধ্য করেছেন। এসব চাকরিচ্যুতদের গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা  আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে জাহাঙ্গীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে।

শুধু স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের অনুদান নয়, হাসপাতালের উপার্জিত আয় থেকে শুরু করে সকল সরকারি-বেসরকারি দান-অনুদানের টাকা সমানে আত্মসাৎ করছেন জাহাঙ্গীর চৌধুরী। এর আগে হাসপাতালের বিভিন্ন খাতে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালে সমাজসেবা অধিদপ্তর প্রশাসক নিয়োগের আদেশ জারি করলেও আদালত কর্তৃক ৬মাসের স্থগিতাদেশের কারণে প্রশাসক নিয়োগ হয়নি। ৬ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বহিস্কৃত সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরীর আবেদনের মাধ্যমে প্রশাসক নিয়োগের স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়। হাসপাতাল তহবিলের টাকায় সকলকে ম্যানেজ করে জাহাঙ্গীর চৌধুরী বহাল তবিয়তে আছেন, চলছে দুর্নীতির লাগামহীন মহোৎসব। এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), চট্টগ্রামের পরিচালক এস এম এম আক্তার হামিদ ভূঁইয়া জাহাঙ্গীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন হিসাবের মাধ্যমে হাসপাতালের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধান চালাচ্ছেন বলে চাটগাঁর বাণীকে মুঠোফোনে জানিয়েছেন।

সমাজের সামর্থ্যবানদের দান-অনুদান ও দান-খয়রাতের টাকায় পরিচালিত সেবাধর্মী এ হাসপাতালে সুলভমূল্যে ডায়াবেটিক রোগীদের সেবাদানের কথা থাকলেও বাস্তবে হচ্ছে তার ওল্টোটাই। ডায়াবেটিক রোগীদের এখানে প্রাইভেট হাসপাতালের মতো উচ্চমূল্যে চিকিৎসাসেবা নিতে হয়। বাণিজ্যিক হাসপাতালের মতোই চলছে সমিতির এ হাসপাতাল। আইসিইউ, সিসিইউ,এইচডিইউ থাকলেও বিশেষজ্ঞ কোনো ডাক্তার নেই। হাসপাতালের দৈনিক আয় ১০লাখ টাকার ওপরে। উপার্জিত টাকার ৫০% খরচ করা হলেও হাসপাতালের চেহারা পাল্টে যেতো। প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রাখা যেতো, রোগনির্ণয়ের জন্যে উন্নতমানের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকতো। রোগীরা পেতো উচ্চমানের চিকিৎসাসেবা। হাসপাতালের ফার্মেসী থেকে রোগীরা ন্যায্যমূল্যে ডায়াবেটিসের ওষুধপত্র কিনতে পারছে না।

অন্যদিকে সিডিএ’র আদেশ লঙ্ঘন করে হাসপাতালভবন নির্াণকাজ পুনরায় শুরু করার ব্যাপারে জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার নুরুল করিম চাটগাঁর বাণীকে বলেন, “সিডিএ এর সাথে সম্পর্ত কোনো অনিয়ম থাকলে অবশ্যই আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।”

চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের মেয়াদোত্তণী কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরীর সাথে মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ মিথ্যা দাবী করে বলেন, “ডায়াবেটিক হাসপাতালের সাবেক পুষ্টিবিদ হাসিনা আক্তার লিপি  আমার বিরুদ্ধে মিডিয়াকে নানা মিথ্যা তথ্য দিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।”

লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও