রাজনীতিতে একটি পুরনো রোগ আছে,স্তুতি আর তোষামোদ। ক্ষমতায় কেউ থাকলেই একদল মানুষ তাকে ঘিরে এমনভাবে প্রশংসা শুরু করে, যেন তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে কোনো অলৌকিক ব্যক্তি। রাজনৈতিক মঞ্চে নেতা, টকশোতে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, পত্রিকায় কলামিস্ট,সবাই তখন স্তুতির প্রতিযোগিতায় নেমে যায়। এই মানুষগুলো আসলে ব্যক্তি বা আদর্শের জন্য নয়, নিজেদের স্বার্থের জন্যই এমনটা করে। কিছু পাওয়ার আশায়, সুবিধা নেয়ার আশায় তারা ক্ষমতাকে ঘিরে রাখে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো,এই তোষামোদ কি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ব্যক্তিকেও ছোট করে দেয় না?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা বহুবার এই দৃশ্য দেখেছি। শেখ হাসিনাকে ঘিরে যেমন একসময় অতিরঞ্জিত প্রশংসার ঢেউ তৈরি হয়েছিল, আজ একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তারেক রহমানকে ঘিরেও। কেউ তাকে বিশ্বসেরা নেতা বানানোর চেষ্টা করছেন, কেউ তাঁর পরিবারকে নিয়ে অতি আবেগী বর্ণনা দিচ্ছেন।
প্রথমেই আলোচনা করা যাক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে:
শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি যারা করেছে, তারা বিরোধীরা নয়,বরং অন্ধ স্তুতিবাদীরা। একদল মানুষ এমনভাবে তাঁকে ঘিরে রেখেছিল যেন তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে, সমালোচনার ঊর্ধ্বে, বাস্তবতার ঊর্ধ্বে একজন মানুষ। রাজনৈতিক সভা, টকশো, পত্রিকার কলাম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম,সবখানেই চলেছে একধরনের অতিরঞ্জিত বন্দনা।
এই তোষামোদকারীদের কাজ ছিল না সত্য বলা, বরং ক্ষমতাসীনদের খুশি রাখা। ফলে সরকারের ভুল, প্রশাসনের দুর্নীতি, দলীয় নেতাকর্মীদের অপকর্ম, জনগণের ক্ষোভ,এসব বাস্তব চিত্র ধীরে ধীরে আড়ালে পড়ে যায়। চারপাশে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয় যেখানে সমালোচনা মানেই ‘শত্রুতা’, আর প্রশ্ন তোলা মানেই ‘বিরোধিতা’।
একজন রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বাস্তবতা জানা। কিন্তু যখন চারপাশে শুধু তোষামোদকারী থাকে, তখন বাস্তবতা আর নেতার কাছে পৌঁছায় না। তখন জনগণের কষ্ট, ক্ষোভ, হতাশা সবকিছুই বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়। এতে ব্যক্তি যেমন ভুল সিদ্ধান্ত নেন, তেমনি দলও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
আজ যারা একসময় শেখ হাসিনাকে ঘিরে দিনরাত স্তুতি গাইতো, তাদের অনেককেই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কেউ অবস্থান বদলেছে, কেউ নতুন ক্ষমতার কাছাকাছি চলে গেছে, কেউ আবার নীরব হয়ে গেছে। কারণ এদের রাজনীতি আদর্শের নয়, সুবিধার। ক্ষমতা যেখানে, এদের আনুগত্যও সেখানেই।
এরা রাষ্ট্রের কল্যাণ করেনি, বরং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিই করেছে। কারণ সত্য গোপন করে, ভুলকে সঠিক বলে চালিয়ে দিয়ে, সমালোচনাকে দমন করে কোনো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা যায় না। এতে কেবল ক্ষমতার চারপাশে একটি কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি হয়, যা একসময় ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়ে।
গণতন্ত্রে সরকারের সবচেয়ে বড় বন্ধু অন্ধ প্রশংসাকারী নয়, বরং সৎ সমালোচক। যে ভুল ধরিয়ে দেয়, সতর্ক করে, বাস্তবতা তুলে ধরে,সেই প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী। ইতিহাসে দেখা গেছে, ব্যক্তি পূজা কখনোই টেকসই রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেনি। বরং তা প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেছে, নেতৃত্বকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং রাষ্ট্রকে বিভক্ত করেছে।
আজও যদি আমরা শিক্ষা না নিই, তাহলে একই ভুল বারবার ফিরে আসবে। ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রকে বড় করতে হবে। তোষামোদ নয়, প্রয়োজন সত্য বলার সাহস।
অন্ধ আনুগত্যের বিপজ্জনক পরিণতি আজ পুরো জাতি ভোগ করছে।
জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন যারা স্তুতি গাইতে গাইতে গলা দিয়ে রক্ত বের করে ফেলেছেন তারা এখন কোথায়? কেন তারা মাঠে নেই?
রাজনীতি করতে গেলেতো জেল জুলুমের শিকার হতে হবে,ত্যাগ করতে হবে।বঙ্গবন্ধু কি ১৪ বছর কারাগারে বন্দী ছিলেন না? শেখ হাসিনা কি জেল খাটেন নি? যারা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ন্যুনতম সুবিধা গ্রহণ করেননি,যারা পদ বঞ্চিত ছিলেন,যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারন করেছেন তারাই এখন মাঠে ময়দানে কিছুটা সক্রিয় আছেন,দলকে অর্গানাইজ করছেন। কখনো সুদিন আসলে দুধের মাছির সন্ধান মিলবে,বসন্তের কোকিলের ডাক শোনা যাবে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরের কমিটির নির্ধারিত সদস্য সংখ্যা হলো,
জেলা/মহানগর: ৭৫ জন
উপজেলা/থানা: ৭১ জন
ইউনিয়ন: ৬৯ জন
ওয়ার্ড: ৫১ জন
সে হিসাবে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির হিসাব করলে আনুমানিক দাঁড়ায়:
জেলা ৬৪ × ৭৫ = ৪,৮০০
উপজেলা ৪৯৫ × ৭১=৩৫,১৪৫
ইউনিয়ন ৪,৫০০×৬৯=৩১০৫০০
ওয়ার্ড ৪৫,০০০×৫১=২২,৯৫,০০০
মোট:২৬,৪৫,৪৪৫ জন (প্রায় ২৬.৫ লাখ)।
সুতরাং শুধু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর এসব পর্যায়ের কমিটিতেই আনুমানিক মোট সদস্য হয় প্রায় ২৬,৪৫,৪৪৫ জন (প্রায় ২৬.৫ লাখ)।
এখন যদি একই ধরনের সাংগঠনিক কাঠামো অনুসারে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক লীগ এবং বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ,এই ৫টি সংগঠন মিলিয়ে হিসাব করা হয়, তাহলে:
২৬.৫ লাখ × ৫ সংগঠন
≈ ১ কোটি ৩২ লাখের বেশি পদধারী/কমিটি সদস্য হতে পারে (তাত্ত্বিক হিসাব)।
এছাড়াও ১২ টি সিটি কর্পোরেশনে ৭৫×১২= ৯০০ সদস্য রয়েছে। এই ১ কোটি ৩২ লাখ পরিবারের সদস্যদের হিসাব করলে প্রায় ৫ কোটি আওয়ামী পরিবার আছে।এই লোকগুলো এখন কোথায়?
এরপর আছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর কর্মী, সমর্থক ও শুভাকাঙ্খী।
একবার ভাবুনতো আওয়ামী লীগ পরিবারের এই ৫ কোটি মানুষ অর্গানাইজড থাকলে কি হতে পারে?
এই মানুষগুলো মোটিভেশনাল ওয়ার্ক করলে, জনগণের পাশে দাড়ালে,জনগণের সামনে ম্যাটিকুলাস ডিজাইন এবং ডিপস্টেট এর ষড়যন্ত্রের চিত্র তুলে ধরলে কোটি কোটি মানুষ আওয়ামী লীগের পক্ষে মাঠে নামবে। তখন আওয়ামী লীগের সামনে কোনো দল দাড়াতে পারবেনা।কিন্তু দুর্ভাগ্য দলীয় ১ কোটি ৩২ লক্ষ সদস্যের কেউ এখন সক্রিয় নেই। সক্রিয় আছে তারাই, যারা এতোদিন পদবঞ্চিত ছিল। যারা বঙ্গবব্ধুকে ভালোবাসে,আওয়ামী লীগকে ভালোবাসে। যারা আদর্শিক অবস্থান থেকে নিজের নৈতিকতাকে বিসর্জন দিতে পারেনি।
আমি দেখেছি রাষ্ট্রনায়কের চারপাশে বরবরই একটা কৃত্রিম বাস্তবতার দেয়াল তৈরী হয়।ক্ষমতা বদলালে তোষামোদকারীরাও বদলায়।
একই কায়দা শুরু হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে। তারেক রহমান সম্পর্কে কে না জানে? তাঁর বাবা মা দুজনই রাষ্ট্র নায়ক ছিলেন। সংগত কারণেই তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ থেকেই সকলের কাছে পরিচিত মুখ, এছাড়াও তিনি লন্ডনে নির্বাসনে থাকাকালীন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি কিছু নেতা এতোটা তৈল মর্দন শুরু করেছেন যে,আমার বিশ্বাস এতে করে তারেক রহমানও বিব্রতবোধ করছেন। তাঁর চারপাশে স্তুতিবিদদের মেলা বসেছে।কেউ তাঁকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা বানাচ্ছেন, একজন মন্ত্রী স্কুলের শিশু শিক্ষার্থীদের প্রধানমন্ত্রীর কন্যা জায়মা রহমান এর নাম মুখস্ত করাচ্ছেন, আগামীদিনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন।আরেক শ্রেণীর লোক স্তুতি গাইতে গিয়ে বলা শুরু করলো জায়মা লেখাপড়া জানা সুন্দরী তরুণী ,প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে উচ্চ শিক্ষিতা, ব্যারিস্টার হয়েছে। খুব ভালো কথা, ব্যারিস্টার হয়েছেন সেটা আমরাও জানি। সে আমাদেরও স্নেহধন্য।কিন্তু আসল কথা হলো,প্রাথমিকভাবে পূর্ব লন্ডনের রাস্তায় বহু ব্যারিস্টার ছেলেমেয়ে ঘুরে বেড়ায় একটু শিক্ষানবিশ হয়ে কোনো একটা ফার্মে কাজ করার জন্য ,ব্যারিস্টার হয়ে সার্টিফিকেট হাতে নিলেই তো হলো না তাকে তো প্র্যাকটিস করতে হবে ,এটা খুব কঠিন কাজ, জায়মা আমাদের কন্যা সমতূল্য,একটা বাচ্চা মেয়ে,তার জন্য অবশ্যই আমাদের দোয়া থাকবে,কিন্তু ডিগ্রি নিয়ে বসে থাকলে তো হবে না ,কাজ করতে হবে, প্রমাণ করতে হবে যে, সে একজন ব্যারিস্টার ,তাকে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে, কেস লড়তে হবে। আদালতে প্র্যাক্টিস করতে হবে।
আবার একশ্রেণীর স্তুতিবিদেরা বলছে জোবায়দা রহমান ডিগনিফাইড,( হ্যাঁ অবশ্যই তিনি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, তাঁকে আমিও শ্রদ্ধা করি),তিনি লন্ডনে অনেক বড় বড় ডিগ্রী অর্জন করেছেন,কিন্তু জোবায়দা রহমান কখনো মিথ্যা বলতে শিখেন নি,অতিরঞ্জিত কোনো কথা নিজের সম্পর্কে কখনো বলেননি। তিনি বললেননি যে,লন্ডনে তিনি অনেক ডিগ্রী অর্জন করেছেন।আপনারা তাকে মিথ্যাবাদী বানিয়ে ফেলছেন ,কোন কোন জায়গায় তাকে বড় দেখানোর জন্য অনবরত মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছেন।এতে জোবায়দা রহমানও বিব্রতবোধ করছেন।
স্তুতি কেবল এখানেই শেষ নয়, তারেক রহমান বউকে পাশে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে যায় ,পায়ে হেঁটে অফিসে যায় ,নিজের ব্রিফকেস নিজেই বহন করে! আরও কত কী!তারা আসলে কাকে খুশী করতে চায়?
সম্প্রতি থেকে দেখলাম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচীকে ঘিরে একশ্রেণীর স্তুতিবাদীরা অবান্তর সব কথা বলছেন।কেউ কেউ তার ডিগ্রী নিয়েও কচকচানি শুরু করেছেন।এমনভাবে বলছেন, যেনো তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেছেন। অথচ তারেক রহমান তাঁর নির্বাচনী হলফনামায় স্বচ্ছভাবে সব লিখেছেন।তার এই স্বচ্ছতা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার।
তারেক রহমান এর ডিগ্রী যেটাই হোক না কেন বাস্তবতা হলো,তারেক রহমান আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এখন তাঁর ডিগ্রি নিয়ে অহেতুক কচকচানির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি দেশ কীভাবে পরিচালনা করছেন, অর্থনীতি কোথায় যাচ্ছে, মানুষের জীবনমান কতটা উন্নত হচ্ছে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কতটা সুরক্ষিত থাকছে।
সবক্ষেত্রে ডিগ্রিই মূল বিষয় নয়। ইতিহাসে বহু রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশি ছিল না, কিন্তু নেতৃত্বগুণ, সংগঠন দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে তারা ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। ব্রাজিলের লুলা দা সিলভা, ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরো, কম্বোডিয়ার হুন সেন, যুক্তরাষ্ট্রের আব্রাহাম লিংকন কিংবা হ্যারি ট্রুম্যান,তাদের জীবনই তার উদাহরণ। আমাদের উপমহাদেশেও আরজ আলী মাতবরের মতো মানুষ ছিলেন, যিনি প্রথাগত উচ্চশিক্ষিত না হয়েও চিন্তা ও দর্শনের জগতে গভীর প্রভাব রেখে গেছেন।তাঁকে নিয়ে গবেষণা করেও অনেকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করছেন।
বিশ্বে এমন অনেক রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন যাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু তারা রাজনীতি, আন্দোলন, ব্যবসা বা সামরিক নেতৃত্বের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি ষ্পষ্ট হবে।যেমন,
Lula da Silva (লুলা দা সিলভা) তিনি ব্রাজিল এর প্রেসিডেন্ট,প্রাথমিক পর্যায়ের কারিগরি/ভোকেশনাল শিক্ষা; বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি নেই। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা শ্রমিক নেতা; সীমিত আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েও জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক হয়েছেন।
Nicolás Maduro (নিকোলাস মাদুরো), তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট,তিনি বাসচালক ও শ্রমিক নেতা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন; পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্পন্ন করেননি।
Hun Sen (হুন সেন)
কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী,সীমিত আনুষ্ঠানিক শিক্ষা,দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা এই নেতা যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে উঠে আসেন।
Abraham Lincoln (আব্রাহাম লিংকন)
যুক্তরাষ্ট্র এর সাবেক প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তাঁর আনুষ্ঠানিক স্কুলশিক্ষা খুব কম; স্বশিক্ষিত।
Harry S. Truman (হ্যারি এস. ট্রুম্যান)
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট,তিনি কলেজে পড়লেও ডিগ্রি সম্পন্ন করেননি
Mao Zedong (মাও সেতুং) চীন এর সাবেক চেয়ারম্যান, তিনিও খুব শিক্ষিত ছিলেন না।
প্রথাগত শিক্ষার চেয়ে তিনি লাইব্রেরিতে প্রচুর সময় ব্যয় করতেন এবং চীনা দর্শন, ইতিহাস ও মার্কসবাদী তত্ত্বের ওপর ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর চিন্তা, দর্শন ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখনো প্রতিদিন নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁকে। কেবল তাঁর জন্মভূমি চীনেই নয়, এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে লাতিন আমেরিকার অনেক দেশেই মাও সেতুং আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ইতিহাসে আরও অনেক নেতা ছিলেন যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কম ছিল কিন্তু নেতৃত্বগুণ, সংগঠন ক্ষমতা ও রাজনৈতিক দক্ষতায় বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়েছেন।
যে যতই স্তুতি করুন না কেন,আসল বিষয় হলো তারেক রহমান বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
তিনি তো প্রধানমন্ত্রী হয়েই গেছেন এখন তার ডিগ্রি নিয়ে কচকচানির কোনো মানে হয়না।
এখন তারেক রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে,আর তাঁকে ঘিরে পুরনো কায়দায় শুরু হয়েছে অতিরঞ্জিত স্তুতি ও তোষামোদ। ব্যক্তি যত বড় পদে যান, একশ্রেণীর মানুষ তত বেশি তাকে ঘিরে আবেগ, প্রশংসা আর অতিনাটকীয় বর্ণনার জাল বুনতে শুরু করে। বর্তমানে সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরেও। কেউ তাঁর পরিবারকে ঘিরে আবেগময় অতিরঞ্জন করছেন, কেউ আবার তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপনকে রাজনৈতিক মহিমায় রূপ দিতে চাইছেন।
রাজনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়গুলোর একটি হলো নেতাকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। প্রধানমন্ত্রীর কাজ এখন দেশ চালানো ,১৮ কোটি মানুষকে ভালো রাখা, দেশকে এগিয়ে নেয়া, অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধ করা, দেশের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা।সেগুলোতে ফোকাস না করে ফোকাস করছেন ফালতু জিনিসে।যেগুলোর সাথে রাষ্ট্রের উন্নয়নের কোনো সম্পর্ক নেই।
এখন জনগণের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশ কীভাবে পরিচালনা করছেন। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলা, পররাষ্ট্রনীতি,এসব ক্ষেত্রেই জনগণ তাঁর নেতৃত্বের মূল্যায়ন করবে। তিনি কী ডিগ্রি অর্জন করেছেন, কে কোথায় কী প্রশংসা করলো, কে তাঁকে কত বড় বিশেষণে ভূষিত করলো,এসব দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে না।
তোষামোদকারীরা সাধারণত সত্য কথা বলে না; তারা ক্ষমতাসীনদের খুশি রাখতে চায়। ফলে জনগণের ক্ষোভ, প্রশাসনের দুর্বলতা, নীতির ব্যর্থতা,এসব অনেক সময় নেতার কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায় না। এতে রাষ্ট্র ও সরকারের ক্ষতিই হয় বেশি।
ইতিহাস বলে, অন্ধ প্রশংসা কখনো কোনো নেতৃত্বকে শক্তিশালী করেনি। বরং সৎ সমালোচনা, বাস্তবতা তুলে ধরা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতিই একটি সরকারকে টেকসই ও কার্যকর করে তোলে। একজন প্রধানমন্ত্রীকে বড় করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাঁর কাজের সফলতা তুলে ধরা, মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত প্রশংসা নয়।
তাই এখন প্রয়োজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ব্যক্তি পূজা নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থই চূড়ান্ত সত্য।
তোষামদকারী মানুষগুলো তেল দিতে দিতে ক্ষমতায় থাকা মানুষগুলোকে যে ছোট করে ফেলছেন এটাও কি আপনারা বুঝেন না !
আমার আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শ যেটাই হোক না কেন সরকারের অহেতুক সমালোচনা না করে বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করুন।যুক্ত রাষ্ট্রের সাথে ড.ইউনূস এর গোলামী চুক্তির ক্ষেত্রে সরকার নির্লিপ্ত কেন,এই চুক্তির ইতিবাচক নেতিবাচক দিক নিয়ে উপস্থাপন করুন।
একটা অপ্রিয় সত্য হচ্ছে,সরকার কখনো জনমতের বাইরে যেতে পারবেনা। তেল মারামারি বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে কথা বলুন ,এসব ফালতু তোষামোদ বাদ দেন। এসব বলে বলে আপনারা কিন্তু উনাদের ছোট করছেন। রাষ্ট্রের এবং দলের ক্ষতি করছেন।
এবার আসা যাক ড. ইউনূস প্রসঙ্গে:
ডক্টর ইউনূস যখন দেশ প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন ,তখন তো বড় বড় বিদ্বান ব্যক্তিরাও ড.ইউনুস এর পায়ে পড়ে গড়াগড়ি খেয়েছেন। দেশের কিছু বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, টকশো বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিকমুখী একটি শ্রেণী তাঁকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন দেশের সব সমস্যার একমাত্র সমাধান তিনি। তাঁর নোবেল পুরস্কারকে কেন্দ্র করে এমন আবেগী পরিবেশ তৈরি করা হয় যে, অনেকেই বাস্তব রাজনৈতিক প্রশ্ন বা নীতিগত সমালোচনা করতেও দ্বিধা বোধ করেছেন।
গণতান্ত্রিক সমাজে এটি একটি অস্বাস্থ্যকর প্রবণতা। কারণ কোনো ব্যক্তি, তিনি যত বড় মাপেরই হোন না কেন, সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতি নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত,এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার জনগণের আছে। কিন্তু তোষামোদকারীরা সাধারণত এই প্রশ্নের পরিবেশ নষ্ট করে দেয়। তারা ব্যক্তি কেন্দ্রিক আবেগ তৈরি করে, যুক্তিভিত্তিক আলোচনাকে দুর্বল করে এবং বাস্তব সমস্যাগুলো আড়াল করার চেষ্টা করে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই ধরনের অন্ধ সমর্থকরা ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ করে না। বরং তারা এমন একটি কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে সমালোচনা শত্রুতা হিসেবে দেখা হয় এবং ভিন্নমতকে অপছন্দ করা হয়। এতে নেতৃত্বও অনেক সময় প্রকৃত জনমত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো রাষ্ট্রনায়ক বা জাতীয় ব্যক্তিত্বকে সম্মান করা আর অন্ধভাবে তোষামোদ করা এক জিনিস নয়। সম্মান হবে তাঁর কাজ, অবদান ও নীতির ভিত্তিতে। কিন্তু ব্যক্তি পূজা বা অতিরঞ্জিত স্তুতি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র,তিনটিরই ক্ষতি করে।বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যুক্তিভিত্তিক আলোচনা, জবাবদিহিতা এবং সত্য বলার সাহস।
একবারও তারা বলার সাহস পায়নি যে এই লোকটা (ড.ইউনূস) দেশের জন্য ভালো নাকি খারাপ,সে নোবেল বিজয়ী এই স্তুতিই তাদের মুখে ছিল।সে নোবেল প্রাইস পেয়েছে ভালো কথা। নোবেল প্রাইস কারা পায় সেটাও এখন আর অজানা না। মার্কিনীদের দালালেরাই এই কাজে সিদ্ধ হস্ত।
ড.ইউনূস ক্ষমতায় এসে নিজের কিছু ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেছেন,৬ শত কোটি ঋণ মওকুপ করেছেন, আদম ব্যবসা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইসেন্স নিয়েছেন।তার শাসনামলে দেশের আইন শৃঙ্খলা একেবারেই রসাতলে গেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, নেতা সকলের উপর মব হয়েছে,যারজন্য মব সম্রাট নামেও তাকে উপাধী দেয়া হয়েছে।
এরপর করিডোর এবং বন্দর দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছেন।
সাধারণ মানুষের আন্দোলনে সে অবস্থান থেকে সরে এলেও ক্ষমতা ছাড়ার দুদিন আগে আমেরিকার সাথে গোলামী চুক্তি করে আমাদের সার্বভৌমত্বকে অনেকটা বিপন্ন করেছেন।যার জন্য বাংলাদেশের ব্যবসা বানিজ্য অনেকটা মুখ থুবরে পড়েছে।ড.ইউনূস ষ্পষ্টতই রাষ্ট্রদ্রোহীতা করেছে। একদিন এই দেশের মানুষ সেই সত্যটি ঠিকই উপলব্ধি করবে।
পরিশেষে বলবো,কোনো নেতাকে বড় করতে গিয়ে মিথ্যা, অতিরঞ্জন কিংবা অযথা আবেগের আশ্রয় নেয়া উচিত নয়। এতে নেতা বড় হন না, বরং জনমানুষের কাছে তাঁর ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একজন নেতার সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তাঁর কাজ, তাঁর সততা, তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা।
রাজনীতিতে ব্যক্তি পূজার চেয়ে বেশি প্রয়োজন জবাবদিহিতা ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা। সরকার ভালো কাজ করলে প্রশংসা হবে, ভুল করলে সমালোচনা হবে,এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যভিত্তিক ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে। দেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, সার্বভৌমত্ব, বন্দর, করিডোর, আন্তর্জাতিক চুক্তি,এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে জনগণকে সচেতনভাবে আলোচনায় অংশ নিতে হবে।
আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ‘তেল মারামারি নয়,’ বরং দায়িত্বশীল নাগরিক চেতনা। কারণ ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু রাষ্ট্র থাকে, জনগণ থাকে, ইতিহাস থাকে। আর ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তোষামোদকারীদের নয়, সত্য কথা বলার সাহসীদেরই মনে রাখে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

